যুদ্ধক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার নতুন কিছু নয়, তবে এখন এই প্রযুক্তি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে এটি শুধু শত্রুর অবস্থান শনাক্ত করছে না, বরং কোন অস্ত্র দিয়ে কখন আঘাত হানতে হবে সেটিও নির্ধারণ করে দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রকল্প ‘ম্যাভেন’ এখন আধুনিক যুদ্ধনীতির সবচেয়ে আলোচিত প্রযুক্তিগুলোর একটি হয়ে উঠেছে।
এই প্রযুক্তি ইতোমধ্যে মধ্যপ্রাচ্য, ইউক্রেন ও আফগানিস্তানের মতো সংঘাতপূর্ণ এলাকায় ব্যবহৃত হয়েছে। বিশাল পরিমাণ তথ্য বিশ্লেষণ করে এটি মুহূর্তের মধ্যে সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করতে পারে। সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতের যুদ্ধ অনেকটাই নির্ভর করবে এমন স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার ওপর।
কী এই ‘ম্যাভেন’

ম্যাভেন মূলত একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সামরিক প্ল্যাটফর্ম। এটি স্যাটেলাইট ছবি, ড্রোন ভিডিও, রেডিও সংকেত ও বিভিন্ন গোয়েন্দা তথ্য একত্র করে সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ করে। এরপর কোন বিমান বা অস্ত্র সবচেয়ে দ্রুত ও কার্যকরভাবে হামলা চালাতে পারবে, সেটিও বিশ্লেষণ করে জানায়।
শুরুতে এই প্রযুক্তি ছিল পরীক্ষামূলক। ২০১৭ সালে সোমালিয়ায় সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে ব্যবহারের সময় সফটওয়্যারটি মেঘকে বাস আর গাছকে মানুষ হিসেবে শনাক্ত করেছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর সক্ষমতা দ্রুত বাড়ে।
এক পর্যায়ে একটি পরীক্ষায় দেখা যায়, একজন বিশ্লেষক যেখানে ড্রোনের ভিডিওতে একজন রাখালকে শনাক্ত করতে ৪০ সেকেন্ড সময় নিয়েছিলেন, সেখানে ম্যাভেন একই ব্যক্তিকে এক সেকেন্ডেরও কম সময়ে খুঁজে ফেলে।
ইউক্রেন যুদ্ধ ছিল বড় মোড়
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময় ম্যাভেনের ব্যবহার নতুন মাত্রা পায়। যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনকে বিপুল পরিমাণ লক্ষ্যসংক্রান্ত তথ্য সরবরাহে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে। একদিনেই ২৬০টির বেশি সম্ভাব্য লক্ষ্য শনাক্ত করার ঘটনাও সামনে আসে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তখন পরিস্থিতি এমন ছিল যে অনেক সময় মনে হতো যুক্তরাষ্ট্র যেন সরাসরি অস্ত্রের নির্দেশনাই দিয়ে দিচ্ছে। যুদ্ধক্ষেত্রে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং তাৎক্ষণিক হামলার ক্ষেত্রে ম্যাভেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

দ্রুততার সঙ্গে বাড়ছে উদ্বেগও
এই প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো গতি। বড় ভাষাভিত্তিক এআই ব্যবস্থার মাধ্যমে লক্ষ্য নির্ধারণের প্রক্রিয়া কয়েক গুণ দ্রুত হয়েছে। ফলে প্রতিদিন হাজার হাজার লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে।
তবে এখানেই তৈরি হচ্ছে উদ্বেগ। কারণ যুদ্ধের মতো স্পর্শকাতর ক্ষেত্রে ভুল শনাক্তকরণ বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। ইউক্রেনে ব্যবহারের অনেক পরেও প্রতি বর্গকিলোমিটারে একাধিক ভুল শনাক্তকরণের ঘটনা ঘটেছে বলে জানা গেছে।
বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, যুক্তরাষ্ট্র, চীন বা রাশিয়ার মতো শক্তিধর দেশের মধ্যে সংঘাত হলে সবাই দ্রুত হামলা চালানোর চাপ অনুভব করবে। তখন মানুষের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ কমে যেতে পারে।
অস্ত্রের ভেতরেও ঢুকে গেছে এআই

ম্যাভেন এখন শুধু দূরের সার্ভারে সীমাবদ্ধ নয়। এর অ্যালগরিদম সরাসরি অস্ত্রের ভেতরেও যুক্ত করা হচ্ছে। আত্মঘাতী ড্রোন কিংবা বিস্ফোরকবাহী স্বয়ংচালিত নৌযান এমনভাবে তৈরি করা হচ্ছে, যাতে তারা নিজেরাই লক্ষ্য খুঁজে আঘাত হানতে পারে।
এ কারণে সামরিক প্রযুক্তিতে তথ্য সংগ্রহ এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিভিন্ন ক্যামেরা, জাহাজ, ড্রোন ও নজরদারি ব্যবস্থার মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ তথ্য সংগ্রহ করে এআইকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।
ভবিষ্যতের যুদ্ধ কোন পথে
ম্যাভেনের গল্প এখন শুধু একটি সফটওয়্যার প্রকল্পের গল্প নয়। এটি দেখিয়ে দিচ্ছে, ভবিষ্যতের যুদ্ধ কতটা প্রযুক্তিনির্ভর হতে যাচ্ছে। যেখানে মানুষের পাশাপাশি মেশিনও সিদ্ধান্ত নেবে, বিশ্লেষণ করবে এবং আক্রমণের পথ ঠিক করবে।
তবে প্রশ্ন রয়ে গেছে—এত ক্ষমতাশালী প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ শেষ পর্যন্ত মানুষের হাতেই থাকবে, নাকি যুদ্ধক্ষেত্রে এআই একসময় মানুষের চেয়েও বড় ভূমিকা নিতে শুরু করবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















