বিশ্ব অর্থনীতির ভারসাম্যহীনতা, বাণিজ্য উত্তেজনা এবং কৌশলগত খনিজ সরবরাহ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে বিশ্বের শীর্ষ শিল্পোন্নত দেশগুলোর জোট জি৭-এর অর্থমন্ত্রীদের বৈঠকে। প্যারিসে শুরু হওয়া দুই দিনের এই বৈঠকে একদিকে যেমন অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলার পথ খোঁজা হচ্ছে, অন্যদিকে সদস্য দেশগুলোর মধ্যকার মতপার্থক্যও সামনে চলে এসেছে।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের শীর্ষ বৈঠক বড় কোনো অর্থনৈতিক অগ্রগতি আনতে না পারায় জি৭ দেশগুলোর উদ্বেগ আরও বেড়েছে। তাই এবারের বৈঠকে বৈশ্বিক বাণিজ্য ও আর্থিক বাজারে বাড়তে থাকা অস্থিরতা বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
বিশ্ব অর্থনীতির ভারসাম্য নিয়ে উদ্বেগ
ফ্রান্সের অর্থমন্ত্রী রোলাঁ লেস্ক্যুরের মতে, গত এক দশকে বিশ্ব অর্থনীতির যে ধারা তৈরি হয়েছে তা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়। তিনি বলেন, চীনে ভোগ কম, যুক্তরাষ্ট্রে অতিরিক্ত ভোগ এবং ইউরোপে বিনিয়োগের ঘাটতি—এই তিনটি বড় সমস্যা বিশ্ব অর্থনীতিতে ভারসাম্যহীনতা তৈরি করছে।
এই অবস্থার কারণে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে চাপ বাড়ছে এবং আর্থিক বাজারে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কেও নজর
জি৭ অর্থমন্ত্রীদের আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সম্পর্ক অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে তাইওয়ান ইস্যু, বাণিজ্য বিরোধ এবং কৌশলগত প্রতিযোগিতা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা এখনও পুরোপুরি কমেনি।
এছাড়া হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা এবং রাশিয়ার সমুদ্রপথে তেল রপ্তানি নিয়ে মার্কিন নীতির প্রভাবও বৈঠকে আলোচনায় এসেছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বিশ্ব জ্বালানি বাজারে নতুন চাপ তৈরি করতে পারে বলে অনেক দেশ উদ্বিগ্ন।
জাপান বিশেষভাবে বৈশ্বিক বন্ড বাজারের অস্থিরতা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। একই সঙ্গে ব্রিটেন মূল্যস্ফীতি ও সরবরাহ শৃঙ্খলের চাপ কমাতে সমন্বিত উদ্যোগের ওপর জোর দিয়েছে।

চীনের ওপর নির্ভরতা কমানোর পরিকল্পনা
বৈঠকের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে বিরল খনিজ ও কৌশলগত কাঁচামালের সরবরাহ। বৈদ্যুতিক গাড়ি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় এসব খনিজের বাজারে বর্তমানে চীনের বড় প্রভাব রয়েছে।
জি৭ দেশগুলো এখন বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যৌথ বিনিয়োগ বাড়ানো এবং বাজারে সমন্বিত নজরদারির মাধ্যমে চীনের ওপর নির্ভরতা কমানোর পথ খুঁজছে।
ফ্রান্স জানিয়েছে, ভবিষ্যতে যেন কোনো একটি দেশ একক আধিপত্য তৈরি করতে না পারে, সেই লক্ষ্যেই নতুন কৌশল নেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে যৌথ প্রকল্প, বাজার স্থিতিশীল রাখতে বিশেষ ব্যবস্থা এবং অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ উৎসাহিত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই উদ্যোগ এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে এবং জি৭ দেশগুলোর মধ্যেও এখনো পূর্ণ কৌশলগত ঐক্য তৈরি হয়নি।

জি৭ জোটের ঐক্য নিয়ে প্রশ্ন
বিশ্ব অর্থনীতি ও ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে সদস্য দেশগুলোর ভিন্ন অবস্থান জি৭-এর ঐক্যকে কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলছে। জুনে অনুষ্ঠিতব্য নেতাদের সম্মেলনের আগে এই বৈঠককে গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তুতি হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, বৈঠকে সব বিষয়ে একমত হওয়া কঠিন হলেও অন্তত বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ভারসাম্যহীনতার দায় সবার ওপরই কিছুটা রয়েছে—এই বিষয়টি স্বীকার করতে পারলে সেটিও বড় অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















