বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ, রাজনৈতিক বিভাজন আর সাংস্কৃতিক সংঘাতের প্রভাব এবার স্পষ্ট হয়ে উঠেছে ইতালির ঐতিহ্যবাহী ভেনিস বিয়েনালে শিল্পমেলায়। সাধারণত শিল্প, উদযাপন আর আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক বিনিময়ের জন্য পরিচিত এই আয়োজন এবার পরিণত হয়েছে বিতর্ক, প্রতিবাদ ও রাজনৈতিক উত্তেজনার কেন্দ্রে।
এবারের ৬১তম ভেনিস বিয়েনালের মূল প্রতিপাদ্য ছিল “ইন মাইনর কীস”। কিন্তু বাস্তবে পুরো আয়োজনজুড়ে ছিল অস্বস্তি, বিভক্তি আর বিশ্ব রাজনীতির তীব্র প্রতিফলন। রাশিয়ার অংশগ্রহণ ঘিরে শুরু থেকেই সমালোচনা তৈরি হয়। ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে আগের দুই আসরে অনুপস্থিত থাকার পর এবার রাশিয়াকে আবার অংশ নিতে দেওয়া হলে ইউরোপজুড়ে প্রতিক্রিয়া শুরু হয়। এর জেরে ইউরোপীয় কমিশন অর্থায়ন বন্ধ করে দেয় এবং কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা উদ্বোধনী অনুষ্ঠান বয়কট করেন।
শিল্পমেলায় রাজনীতির ছায়া
এবারের আয়োজনে সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে রাশিয়া ও ইসরায়েলের অংশগ্রহণ। যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে থাকা দেশগুলোর প্রদর্শনী নিয়ে বিতর্কের মধ্যে পুরস্কার নির্ধারণী বিচারক প্যানেল পদত্যাগ করে। ফলে এবার দর্শনার্থীদের ভোটে সেরা শিল্পী ও সেরা প্যাভিলিয়ন বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যা অনেকের কাছে শিল্পমেলার বদলে জনপ্রিয় ভোট প্রতিযোগিতার মতো মনে হয়েছে।
রাশিয়ার প্যাভিলিয়ন উদ্বোধনের সময় খোলা থাকলেও পরে তা মূল প্রদর্শনী থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। অন্যদিকে ইসরায়েলের স্থায়ী প্যাভিলিয়ন বন্ধ রাখা হয় নির্মাণকাজের অজুহাতে। সেখানে নিরাপত্তা জোরদার করা হয় এবং পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
শিল্পীদের সঙ্গে সরকারের দ্বন্দ্ব
শুধু যুদ্ধরত দেশ নয়, আরও কয়েকটি দেশেও শিল্পীদের কাজ নিয়ে রাজনৈতিক বিরোধ তৈরি হয়েছে। অস্ট্রেলিয়া প্রথমে তাদের নির্বাচিত শিল্পীকে বাদ দেয়, কারণ তার আগের এক কাজে বিতর্কিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের উপস্থিতি ছিল। পরে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে সমালোচনা বাড়লে তাকে আবার ফিরিয়ে আনা হয়।
দক্ষিণ আফ্রিকায়ও একই ধরনের ঘটনা ঘটে। সেখানে এক শিল্পীকে তার কাজে একজন ফিলিস্তিনি কবির অংশ বাদ দিতে বলা হয়। তিনি রাজি না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত পুরো প্যাভিলিয়নই বাতিল করা হয়। পরে একটি গির্জায় তার প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা হয়, যেখানে নিহত নারীদের স্মরণে তৈরি ভিডিও ইনস্টলেশন দর্শকদের মধ্যে গভীর আবেগ তৈরি করে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্যাভিলিয়নেও বিতর্ক
যুক্তরাষ্ট্রের প্রদর্শনীও আলোচনা তৈরি করেছে। সেখানে শিল্পকর্ম নির্বাচনের ক্ষেত্রে বৈচিত্র্য বা অন্তর্ভুক্তির বিষয় এড়িয়ে “আমেরিকান মূল্যবোধ” তুলে ধরার শর্ত দেওয়া হয়। ফলে শিল্প নির্বাচন প্রক্রিয়ায় আগের সরকারি সাংস্কৃতিক সংস্থার বদলে নতুন একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান কাজ করে।
নির্বাচিত শিল্পীর কাজ নিয়ে দর্শকদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। বিশাল ভাস্কর্যগুলো অনেকের কাছে যুদ্ধ, ধ্বংস আর মানবিক সংকটের প্রতীক মনে হলেও শিল্পী ও কিউরেটর সরাসরি কোনো ব্যাখ্যা দেননি। ফলে অনেক দর্শক বিভ্রান্ত থেকেছেন।
নাটকীয় শিল্পকর্মে দর্শকদের ভিড়

রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেও কিছু প্রদর্শনী দর্শকদের আকর্ষণের কেন্দ্রে ছিল। অস্ট্রিয়ার প্যাভিলিয়নে নগ্ন পরিবেশনা ঘিরে বিপুল ভিড় দেখা যায়। জাপানের প্রদর্শনীতে জন্মহার কমে যাওয়ার সংকটকে তুলে ধরা হয় শিশুপুতুলের মাধ্যমে, যেখানে দর্শকদেরও অংশ নিতে হয়।
তবে সবচেয়ে প্রশংসিত কাজগুলোর একটি এসেছে ইউক্রেন থেকে। যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চল থেকে আনা একটি বিশাল ভাস্কর্য ট্রাকের ওপর স্থাপন করে প্রদর্শন করা হয়েছে। এটি ইউক্রেনকে দেওয়া আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতির প্রতীক হিসেবে দেখানো হয়েছে। যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞের মাঝেও এই শিল্পকর্ম দর্শকদের গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে।
বিশ্ব রাজনীতির প্রতিচ্ছবি
১৮৯৫ সালে শুরু হওয়া ভেনিস বিয়েনালে সবসময়ই সময়ের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতাকে প্রতিফলিত করেছে। তবে এবার শিল্পের চেয়ে বেশি করে সামনে এসেছে যুদ্ধ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও সাংস্কৃতিক বিভাজনের প্রশ্ন। অনেকের মতে, বর্তমান বিশ্বের অস্থিরতার সবচেয়ে স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি এবার দেখা যাচ্ছে এই শিল্পমেলায়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















