বিশ শতকের সাংবাদিকতা, ভ্রমণসাহিত্য আর ব্যক্তিগত পরিচয়ের লড়াই—এই তিনটি বিষয়কে একসঙ্গে ধরতে গেলে জ্যান মরিসের নাম উঠে আসে সবার আগে। একসময় যিনি জেমস মরিস নামে পরিচিত ছিলেন, পরে হয়ে ওঠেন জ্যান মরিস। নতুন এক জীবনীতে উঠে এসেছে তাঁর জীবন, সাফল্য, বিতর্ক আর ব্যক্তিগত টানাপোড়েনের নানা দিক।
লেখক ও ভ্রমণসাহিত্যিক সারা হুইলারের লেখা নতুন বইয়ে জ্যান মরিসকে তুলে ধরা হয়েছে এমন একজন মানুষ হিসেবে, যিনি শুধু ইতিহাসের সাক্ষী ছিলেন না, বরং নিজেই ইতিহাসের অংশ হয়ে উঠেছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পতন, এভারেস্ট বিজয়—সবকিছুর মাঝেই ছিল তাঁর উপস্থিতি।
এভারেস্ট জয় বদলে দেয় জীবন

১৯৫৩ সালে এভারেস্ট অভিযানের সংবাদ কাভার করতে গিয়ে জেমস মরিস বিশ্বজুড়ে পরিচিত হয়ে ওঠেন। ব্রিটিশ সংবাদপত্রের প্রতিনিধি হিসেবে তিনি সেই অভিযানে ছিলেন, যেখানে প্রথমবারের মতো মানুষ এভারেস্টের চূড়ায় পৌঁছায়।
অভিযানের খবর গোপন সংকেতের মাধ্যমে পাঠানো হতো। সাফল্যের সংকেত ছিল “তুষার পরিস্থিতি খারাপ”। সেই বার্তাই পাঠিয়েছিলেন মরিস। আর সেই মুহূর্ত থেকেই তাঁর সাংবাদিকজীবনের বড় উত্থান শুরু হয়।
তবে তাঁর ব্যক্তিগত জীবন তখন অন্য এক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। খুব ছোট বয়স থেকেই তিনি অনুভব করতেন, নিজের শরীরের সঙ্গে তাঁর পরিচয়ের মিল নেই। ত্রিশের কোঠায় পৌঁছে তিনি ধীরে ধীরে নিজের রূপান্তরের পথে হাঁটেন।
পরিচয়ের লড়াই ও বিতর্ক
১৯৭২ সালে মরক্কোর কাসাব্লাঙ্কায় অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে জেমস মরিস হয়ে ওঠেন জ্যান মরিস। পরে নিজের অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি লেখেন আত্মজৈবনিক বই। কিন্তু সেই সময় তাঁর এই পরিবর্তন সমাজের অনেকের কাছে সহজভাবে গ্রহণযোগ্য হয়নি।

নারীবাদী ও সাহিত্যসমালোচকদের একাংশ তাঁকে কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেছিলেন। কেউ বলেছিলেন, তিনি নারীত্বকে কেবল বাহ্যিকভাবে দেখেছেন। আবার কেউ মন্তব্য করেছিলেন, তাঁর মধ্যে নারীর বাস্তব অভিজ্ঞতার গভীরতা ছিল না।
তবু জ্যান মরিস নিজের পথ থেকে সরে আসেননি। তিনি বিশ্বাস করতেন, এই পরিবর্তনের মাধ্যমেই তিনি নিজের প্রকৃত পরিচয় খুঁজে পেয়েছেন।
পরিবারের ভেতরের চাপা গল্প
জ্যান মরিসের জীবনের সবচেয়ে জটিল অংশ ছিল তাঁর পারিবারিক সম্পর্ক। স্ত্রী এলিজাবেথ দীর্ঘ সময় ধরে তাঁর পাশে ছিলেন। তাঁদের পাঁচ সন্তানও ছিল। কিন্তু পরিবারের অনেক দায়িত্ব মূলত এলিজাবেথকেই সামলাতে হয়েছে।
জীবনীতে উঠে এসেছে, জ্যান মরিস ছিলেন অত্যন্ত আত্মকেন্দ্রিক। এমনকি ব্যক্তিগত শোকের মুহূর্তেও তিনি অনেক সময় দূরে থেকেছেন। এসব বিষয় তাঁর মানবিক দিক নিয়ে নতুন প্রশ্নও তুলেছে।
![]()
সাম্রাজ্যের ইতিহাস থেকে ব্যক্তিগত ইতিহাস
জ্যান মরিসের লেখালেখির বড় অংশজুড়ে ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের উত্থান-পতনের গল্প। যুদ্ধের সময় তিনি গোয়েন্দা কর্মকর্তা হিসেবেও কাজ করেছেন। পরে সেই অভিজ্ঞতা এবং সাম্রাজ্যের পরিবর্তন নিয়ে তিনি একাধিক বই লেখেন।
তিনি চেয়েছিলেন মানুষ তাঁকে “সাম্রাজ্যের লেখক” হিসেবে মনে রাখুক। কিন্তু সময়ের সঙ্গে তাঁর পরিচয়ের গল্পই সবচেয়ে বেশি আলোচনায় চলে আসে।
আজকের প্রজন্মের অনেক পাঠক হয়তো তাঁর বই পড়েন না, কিন্তু পরিচয়, স্বাধীনতা ও আত্মঅনুসন্ধানের আলোচনায় জ্যান মরিস এখনও গুরুত্বপূর্ণ একটি নাম।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















