০৭:৪৯ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৫ অগাস্ট ২০২৬
মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিকে ইতিবাচকভাবে দেখছে বাংলাদেশ, অংশগ্রহণে আপত্তি নেই ইমরান খানের চিকিৎসা নিশ্চিত করতে পাকিস্তানের প্রতি সাবেক ক্রিকেট অধিনায়কদের আহ্বান লুকানো পেটের চর্বি হৃদ্‌যন্ত্রকে দ্রুত বুড়িয়ে দিতে পারে, বলছে নতুন গবেষণা মানুষের শিশুর মতোই গান শেখে তরুণ ফিঞ্চ পাখি গাজায় ইসরায়েলি হামলায় শিশুসহ নিহত ৩ নারীর শরীর নিয়ে মন্তব্য করার অধিকার কারও নেই, বললেন নাইমাল খাওয়ার তালেবান শাসনে আফগানিস্তান: বিবাহবিচ্ছেদ থেকে স্মার্টফোন, সর্বত্র নিয়ন্ত্রণের ছায়া ওয়েলসের সর্বোচ্চ পর্বতে লাইন নিয়ে তুমুল বিতর্ক, ‘এটা তো বিনোদনকেন্দ্র নয়’ আফগানিস্তানের বাণিজ্যপথ বদলে যাচ্ছে, বড় ঝুঁকিতে পাকিস্তানের শিল্প-বাণিজ্য যুক্তরাষ্ট্রের নতুন অভিবাসন নিয়ম: বিদেশি শিক্ষার্থীদের ১৫ সেপ্টেম্বরের আগেই ফিরতে বলছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো

সোনার মোহে বদলে গেছে ইতিহাস, আজও কেন থামেনি মানুষের আকর্ষণ

হাজার বছর ধরে মানুষের লোভ, ক্ষমতা আর অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল সোনা। সভ্যতার শুরু থেকে আধুনিক বিশ্বের বিনিয়োগ বাজার পর্যন্ত এই ধাতু শুধু অলংকার নয়, বরং ক্ষমতা, নিরাপত্তা এবং সম্পদের প্রতীক হয়ে উঠেছে। নতুন এক আলোচনায় উঠে এসেছে সোনাকে ঘিরে মানুষের সেই দীর্ঘ, অদ্ভুত ও নাটকীয় ইতিহাস।

আর্থিক জগতের পরিচিত নাম লয়েড ব্ল্যাঙ্কফেইন এক সময় নিজের জন্য এক কেজি সোনা কিনেছিলেন। সেটিকে তিনি বিনিয়োগের চেয়ে বেশি দেখতেন এক ধরনের আকর্ষণীয় বস্তু হিসেবে। মানুষের হাতে সেই সোনা গেলে তারা মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকত, যেন সেটির ভেতরে অন্যরকম এক শক্তি রয়েছে। এই অভিজ্ঞতাই দেখায়, সোনার প্রতি মানুষের টান কতটা গভীর।

হাজার বছরের পুরোনো আকর্ষণ

বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন সোনার নিদর্শনের বয়স প্রায় ৬ হাজার ৭০০ বছর। নবপাথর যুগের সেই নিদর্শনের মধ্যে ছিল মুকুট, অলংকার এমনকি অদ্ভুত কিছু ব্যক্তিগত সামগ্রীও। তখন থেকেই সোনা ধনসম্পদ ও সামাজিক মর্যাদার প্রতীক হয়ে ওঠে।

Varna Chalcolithic Necropolis - oldest gold treasure in the world

গ্রিক পুরাণেও সোনার উপস্থিতি ছিল ব্যাপক। সোনার পশম, সোনার আপেল কিংবা রাজা মিডাসের স্পর্শে সবকিছু সোনায় পরিণত হওয়ার গল্প মানুষের কল্পনায় সোনাকে রহস্যময় এক শক্তিতে পরিণত করে।

অর্থনীতির কেন্দ্রেও ছিল সোনা

খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম শতকে লিডিয়ান সাম্রাজ্য প্রথম সোনা ও রুপা দিয়ে মুদ্রা তৈরি শুরু করে। পরে আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট পারস্য জয়ের পর গুরুত্বপূর্ণ সোনার খনি ও সরবরাহ অঞ্চল নিজের নিয়ন্ত্রণে আনেন। ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকাজুড়ে তিনি বহু টাকশাল গড়ে তোলেন, যেখানে উচ্চমাত্রার বিশুদ্ধ সোনার মুদ্রা তৈরি হতো।

এরপর দুই হাজার বছরের বেশি সময় ধরে সোনা বিশ্বের অর্থব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। বহু দেশ তাদের মুদ্রার মূল্য সোনার সঙ্গে বেঁধে রাখত। তবে আধুনিক অর্থনীতিতে সেই ব্যবস্থা নিয়ে বিতর্কও কম নয়।

সোনার মানদণ্ড নিয়ে বিতর্ক

Gold's Eternal Allure: Understanding Humanity's 5,000-Year Obsession with  Precious Meta - Al Romaizan

বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করেন, সোনাভিত্তিক অর্থব্যবস্থা অতীতে মন্দা ও আর্থিক সংকটকে আরও গভীর করেছিল। বিশেষ করে মহামন্দার সময় এর নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে বিস্তর আলোচনা রয়েছে।

অন্যদিকে অনেকেই মনে করেন, সোনা ছাড়া কাগুজে মুদ্রার মূল্য নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে মুদ্রাস্ফীতি, সম্পদের বৈষম্য এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বেড়েছে। তবে অধিকাংশ আধুনিক অর্থনীতিবিদ এখন আর পুরোপুরি সোনাভিত্তিক ব্যবস্থায় ফেরার পক্ষে নন।

যুদ্ধ, লুট আর সোনার দৌড়

সোনাকে ঘিরে ইতিহাসে বহু রক্তক্ষয়ী অধ্যায়ও রয়েছে। স্পেনের রাজা দ্বিতীয় ফার্দিনান্দ অভিযাত্রীদের নির্দেশ দিয়েছিলেন যেকোনো মূল্যে সোনা সংগ্রহ করতে। উনিশ শতকের সোনার খনি আবিষ্কার ক্যালিফোর্নিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার অর্থনীতি বদলে দেয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নরওয়ের কেন্দ্রীয় ব্যাংক নাৎসিদের হাত থেকে নিজেদের সোনা রক্ষা করতে দুঃসাহসিক অভিযান চালায়। সেই ঘটনাও আজ ইতিহাসের অন্যতম নাটকীয় আর্থিক অভিযানের উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়।

বিশ্ববাজারে বেড়েছে স্বর্ণের দাম, দুই সপ্তাহে সর্বোচ্চ

আজও কেন বাড়ছে সোনার গুরুত্ব

বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা, যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা ও মুদ্রাস্ফীতির কারণে সোনার চাহিদা আবার বেড়েছে। অনেক দেশ এখন বিকল্প অর্থনৈতিক নিরাপত্তা খুঁজছে। বিশেষ করে ডলারের ওপর নির্ভরতা কমাতে চীন, সৌদি আরব ও থাইল্যান্ডের মতো দেশগুলোও সোনা মজুত বাড়াচ্ছে।

বিনিয়োগকারীদের কাছেও সোনা এখন নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে বিবেচিত। বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার সময় মানুষ এখনও সোনার ওপর ভরসা রাখছে। গত কয়েক বছরে সোনার দামও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

অর্থনীতির ভিত্তি হিসেবে সোনার যুগ হয়তো শেষ হয়েছে, কিন্তু মানুষের কল্পনা, রাজনীতি ও বিনিয়োগের জগতে এর গুরুত্ব এখনো অটুট।

 

জনপ্রিয় সংবাদ

মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিকে ইতিবাচকভাবে দেখছে বাংলাদেশ, অংশগ্রহণে আপত্তি নেই

সোনার মোহে বদলে গেছে ইতিহাস, আজও কেন থামেনি মানুষের আকর্ষণ

১১:৪১:৪৯ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৮ মে ২০২৬

হাজার বছর ধরে মানুষের লোভ, ক্ষমতা আর অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল সোনা। সভ্যতার শুরু থেকে আধুনিক বিশ্বের বিনিয়োগ বাজার পর্যন্ত এই ধাতু শুধু অলংকার নয়, বরং ক্ষমতা, নিরাপত্তা এবং সম্পদের প্রতীক হয়ে উঠেছে। নতুন এক আলোচনায় উঠে এসেছে সোনাকে ঘিরে মানুষের সেই দীর্ঘ, অদ্ভুত ও নাটকীয় ইতিহাস।

আর্থিক জগতের পরিচিত নাম লয়েড ব্ল্যাঙ্কফেইন এক সময় নিজের জন্য এক কেজি সোনা কিনেছিলেন। সেটিকে তিনি বিনিয়োগের চেয়ে বেশি দেখতেন এক ধরনের আকর্ষণীয় বস্তু হিসেবে। মানুষের হাতে সেই সোনা গেলে তারা মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকত, যেন সেটির ভেতরে অন্যরকম এক শক্তি রয়েছে। এই অভিজ্ঞতাই দেখায়, সোনার প্রতি মানুষের টান কতটা গভীর।

হাজার বছরের পুরোনো আকর্ষণ

বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন সোনার নিদর্শনের বয়স প্রায় ৬ হাজার ৭০০ বছর। নবপাথর যুগের সেই নিদর্শনের মধ্যে ছিল মুকুট, অলংকার এমনকি অদ্ভুত কিছু ব্যক্তিগত সামগ্রীও। তখন থেকেই সোনা ধনসম্পদ ও সামাজিক মর্যাদার প্রতীক হয়ে ওঠে।

Varna Chalcolithic Necropolis - oldest gold treasure in the world

গ্রিক পুরাণেও সোনার উপস্থিতি ছিল ব্যাপক। সোনার পশম, সোনার আপেল কিংবা রাজা মিডাসের স্পর্শে সবকিছু সোনায় পরিণত হওয়ার গল্প মানুষের কল্পনায় সোনাকে রহস্যময় এক শক্তিতে পরিণত করে।

অর্থনীতির কেন্দ্রেও ছিল সোনা

খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম শতকে লিডিয়ান সাম্রাজ্য প্রথম সোনা ও রুপা দিয়ে মুদ্রা তৈরি শুরু করে। পরে আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট পারস্য জয়ের পর গুরুত্বপূর্ণ সোনার খনি ও সরবরাহ অঞ্চল নিজের নিয়ন্ত্রণে আনেন। ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকাজুড়ে তিনি বহু টাকশাল গড়ে তোলেন, যেখানে উচ্চমাত্রার বিশুদ্ধ সোনার মুদ্রা তৈরি হতো।

এরপর দুই হাজার বছরের বেশি সময় ধরে সোনা বিশ্বের অর্থব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। বহু দেশ তাদের মুদ্রার মূল্য সোনার সঙ্গে বেঁধে রাখত। তবে আধুনিক অর্থনীতিতে সেই ব্যবস্থা নিয়ে বিতর্কও কম নয়।

সোনার মানদণ্ড নিয়ে বিতর্ক

Gold's Eternal Allure: Understanding Humanity's 5,000-Year Obsession with  Precious Meta - Al Romaizan

বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করেন, সোনাভিত্তিক অর্থব্যবস্থা অতীতে মন্দা ও আর্থিক সংকটকে আরও গভীর করেছিল। বিশেষ করে মহামন্দার সময় এর নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে বিস্তর আলোচনা রয়েছে।

অন্যদিকে অনেকেই মনে করেন, সোনা ছাড়া কাগুজে মুদ্রার মূল্য নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে মুদ্রাস্ফীতি, সম্পদের বৈষম্য এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বেড়েছে। তবে অধিকাংশ আধুনিক অর্থনীতিবিদ এখন আর পুরোপুরি সোনাভিত্তিক ব্যবস্থায় ফেরার পক্ষে নন।

যুদ্ধ, লুট আর সোনার দৌড়

সোনাকে ঘিরে ইতিহাসে বহু রক্তক্ষয়ী অধ্যায়ও রয়েছে। স্পেনের রাজা দ্বিতীয় ফার্দিনান্দ অভিযাত্রীদের নির্দেশ দিয়েছিলেন যেকোনো মূল্যে সোনা সংগ্রহ করতে। উনিশ শতকের সোনার খনি আবিষ্কার ক্যালিফোর্নিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার অর্থনীতি বদলে দেয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নরওয়ের কেন্দ্রীয় ব্যাংক নাৎসিদের হাত থেকে নিজেদের সোনা রক্ষা করতে দুঃসাহসিক অভিযান চালায়। সেই ঘটনাও আজ ইতিহাসের অন্যতম নাটকীয় আর্থিক অভিযানের উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়।

বিশ্ববাজারে বেড়েছে স্বর্ণের দাম, দুই সপ্তাহে সর্বোচ্চ

আজও কেন বাড়ছে সোনার গুরুত্ব

বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা, যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা ও মুদ্রাস্ফীতির কারণে সোনার চাহিদা আবার বেড়েছে। অনেক দেশ এখন বিকল্প অর্থনৈতিক নিরাপত্তা খুঁজছে। বিশেষ করে ডলারের ওপর নির্ভরতা কমাতে চীন, সৌদি আরব ও থাইল্যান্ডের মতো দেশগুলোও সোনা মজুত বাড়াচ্ছে।

বিনিয়োগকারীদের কাছেও সোনা এখন নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে বিবেচিত। বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার সময় মানুষ এখনও সোনার ওপর ভরসা রাখছে। গত কয়েক বছরে সোনার দামও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

অর্থনীতির ভিত্তি হিসেবে সোনার যুগ হয়তো শেষ হয়েছে, কিন্তু মানুষের কল্পনা, রাজনীতি ও বিনিয়োগের জগতে এর গুরুত্ব এখনো অটুট।