চীনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির বিস্তার এখন চোখে পড়ার মতো। শহরের রাস্তায় বাড়ছে চালকবিহীন গাড়ি, খাবার পৌঁছে দিচ্ছে ড্রোন, আর ডেলিভারির কাজে নেমেছে স্বয়ংক্রিয় ভ্যান। প্রযুক্তির এই দ্রুত অগ্রগতি দেশটিকে নতুন এক শিল্পযুগের দিকে নিয়ে গেলেও একই সঙ্গে বাড়ছে চাকরি হারানোর শঙ্কা। বিশেষ করে চালক, ডেলিভারি কর্মী ও পরিবহন খাতের লাখো শ্রমিকের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
চীনের কিংদাও শহর এখন এই পরিবর্তনের বড় উদাহরণ। এক বছর আগেও সেখানে হাতে গোনা কয়েকটি স্বয়ংক্রিয় গাড়ি ছিল। এখন রাস্তায় শত শত চালকবিহীন ডেলিভারি ভ্যান চলছে। বিভিন্ন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান আরও হাজার হাজার গাড়ি নামানোর পরিকল্পনা করছে। একই সঙ্গে ট্যাক্সি ও খাবার সরবরাহেও বাড়ছে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার ব্যবহার।
প্রযুক্তির অগ্রগতি, কিন্তু দ্বিধায় সরকার

চীনা সরকার একদিকে বিশ্বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় নেতৃত্ব দিতে চায়, অন্যদিকে বড় পরিসরে বেকারত্বের ঝুঁকিও এড়াতে চায়। কারণ প্রযুক্তির উন্নতির ফলে যদি লাখ লাখ মানুষের কাজ হারিয়ে যায়, তাহলে সামাজিক অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। তাই সরকার এখন এমন এক ভারসাম্য খুঁজছে, যেখানে প্রযুক্তি এগোবে, কিন্তু মানুষের জীবিকাও পুরোপুরি ক্ষতিগ্রস্ত হবে না।
সম্প্রতি দেশটির একটি খসড়া নীতিমালায় বলা হয়েছে, মানুষের চাকরি সরিয়ে দেওয়াকে মূল লক্ষ্য করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করা উচিত নয়। একই সঙ্গে আগামী কয়েক বছরের অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় বড় ধরনের বেকারত্বের ঝুঁকি ঠেকানোর কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
রাস্তায় বাড়ছে বিশৃঙ্খলাও
যদিও প্রযুক্তির অগ্রগতি দ্রুত হচ্ছে, বাস্তবে সবকিছু এখনো মসৃণ নয়। বিভিন্ন শহরে চালকবিহীন গাড়ির কারণে যানজট ও প্রযুক্তিগত সমস্যার অভিযোগ বাড়ছে। কিংদাওয়ে স্বয়ংক্রিয় ডেলিভারি ভ্যানের কারণে অনেক সময় সড়কে বিশৃঙ্খলা তৈরি হচ্ছে। আবার উহান শহরে চালকবিহীন ট্যাক্সির একটি বড় প্রকল্পে গাড়িগুলো হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তীব্র যানজট তৈরি হয়েছিল। এরপর নতুন লাইসেন্স দেওয়া সাময়িকভাবে স্থগিত করে সরকার।
কোন চাকরি বেশি ঝুঁকিতে

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সব ধরনের চাকরি সমান ঝুঁকিতে নয়। অনেক ক্ষেত্রে স্বল্প আয়ের কঠিন কাজগুলোতেই আগে যন্ত্র ব্যবহার বাড়ছে। যেমন বাজার থেকে রেস্টুরেন্টে পণ্য বহনের মতো কাজগুলো সাধারণত বয়স্ক শ্রমিকেরা করেন। কম মজুরি ও ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় নতুন প্রজন্ম এই পেশায় আসতে আগ্রহী নয়। ফলে সেখানে স্বয়ংক্রিয় যান সহজেই জায়গা করে নিচ্ছে।
কিন্তু যাত্রী পরিবহন বা ঘরে খাবার পৌঁছে দেওয়ার মতো কাজ ভিন্ন। এই খাতে তরুণ শ্রমিকের সংখ্যা অনেক বেশি। তাদের অনেকেই গ্রাম থেকে শহরে এসে জীবিকার জন্য এই কাজ করেন। ফলে এই খাতে প্রযুক্তির প্রভাব সামাজিক চাপও তৈরি করতে পারে।
প্রতিবাদ ঠেকাতে নতুন প্রশিক্ষণ
প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোও এখন বুঝতে পারছে, শুধু যন্ত্র বাড়ালেই হবে না, মানুষের জন্য নতুন সুযোগও তৈরি করতে হবে। কিছু প্রতিষ্ঠান ড্রোন পরিচালনা, পর্যবেক্ষণ ও প্রযুক্তি সহায়তার কাজে পুরনো ডেলিভারি কর্মীদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। যদিও এখনো এই সংখ্যা খুবই সীমিত, তবুও এটিকে ভবিষ্যতের সম্ভাব্য পথ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বিশ্বের নজর এখন চীনের দিকে
বিশ্বজুড়ে যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের চাকরি কেড়ে নেওয়ার আশঙ্কা বাড়াচ্ছে, তখন চীনের অভিজ্ঞতা বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। দেশটি দেখাতে চাইছে, প্রযুক্তির অগ্রগতি ও কর্মসংস্থানের মধ্যে একধরনের সমন্বয় সম্ভব। কিন্তু শেষ পর্যন্ত রোবট ও মানুষের এই প্রতিযোগিতায় কোন পক্ষ এগিয়ে থাকবে, সেই প্রশ্ন এখনো খোলা রয়ে গেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















