বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিদ্রোহ কিংবা যুদ্ধের আশঙ্কা আগে বিশ্লেষক ও গোয়েন্দা সংস্থার অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করত। কিন্তু এখন সেই কাজেও দ্রুত জায়গা করে নিচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। নতুন প্রজন্মের এআই মডেলগুলো এখন সম্ভাব্য সংঘাত, সরকার পতন কিংবা গণঅসন্তোষের আগাম ইঙ্গিত খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করতে একটি নতুন এআই ব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়। সেই মডেল ইরানে ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ সরকার পরিবর্তন বা শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়ার সম্ভাবনা ২০ শতাংশ বলে দেখিয়েছে। অনেক বিশেষজ্ঞ যেখানে এমন পূর্বাভাস দিতে দ্বিধায় থাকেন, সেখানে এআই তুলনামূলক সাহসী অনুমান দিচ্ছে।
সংঘাত বিশ্লেষণে নতুন প্রযুক্তি
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত দুই দশকে সংঘাত পূর্বাভাসের জন্য অনেক কম্পিউটারভিত্তিক মডেল তৈরি হলেও সেগুলোর সাফল্য সীমিত ছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে মেশিন লার্নিং ও বৃহৎ ভাষাভিত্তিক মডেলের অগ্রগতির ফলে নতুন করে আশাবাদ তৈরি হয়েছে।

এই মডেলগুলো অতীতের যুদ্ধ, দাঙ্গা, রাজনৈতিক সহিংসতা ও অর্থনৈতিক সংকটের তথ্য বিশ্লেষণ করে ভবিষ্যতের ঝুঁকি নির্ধারণের চেষ্টা করে। এতে অপরাধের হার, জনস্বাস্থ্য, শ্রমিক ধর্মঘট, আবহাওয়া, অর্থনৈতিক অবস্থা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার তথ্য ব্যবহার করা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকেও মানুষের ক্ষোভ ও অসন্তোষের প্রবণতা বোঝার চেষ্টা চলছে।
এছাড়া স্যাটেলাইট, ড্রোন ও নজরদারি ক্যামেরার ছবিও বিশ্লেষণে যুক্ত হচ্ছে। রাস্তার চলাচল, মানুষের জড়ো হওয়া বা বিক্ষোভকারীদের গতিবিধি থেকেও সম্ভাব্য সংঘাতের ইঙ্গিত খোঁজা হচ্ছে।
আগের সহিংসতাই বড় সংকেত
বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যৎ সংঘাতের সবচেয়ে বড় ইঙ্গিত অনেক সময় আগের সংঘাতই। বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান এখন বিশ্বজুড়ে দাঙ্গা, সশস্ত্র হামলা, রাজনৈতিক সহিংসতা ও সরকারি দমনপীড়নের তথ্য সংগ্রহ করছে। এসব তথ্য ব্যবহার করে কয়েক মাস আগেই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করার চেষ্টা চলছে।
একটি মডেল ব্রাজিলের একটি অঞ্চলে সম্ভাব্য সহিংস ঘটনার সংখ্যা আগেই প্রায় সঠিকভাবে অনুমান করতে সক্ষম হয়েছিল। একই ধরনের প্রযুক্তি এখন জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ব্যবহার করছে।
জলবায়ু ও সম্পদের প্রভাব

গবেষকেরা বলছেন, তাপপ্রবাহ, খরা কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগও সামাজিক অস্থিরতা বাড়াতে পারে। তেলের খনি বা হীরার মতো মূল্যবান সম্পদের উপস্থিতিও সংঘাতের ঝুঁকি বাড়ায়। কারণ বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো এসব সম্পদ থেকে অর্থ সংগ্রহের সুযোগ পায়।
এখন কিছু আন্তর্জাতিক সংস্থা যুদ্ধ ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে কত মানুষ বাস্তুচ্যুত হতে পারে, সেটিও এআই দিয়ে আগাম হিসাব করার চেষ্টা করছে। সোমালিয়াকে ঘিরে সাম্প্রতিক এক পূর্বাভাসে নির্দিষ্ট সময়ে কত মানুষ ঘরছাড়া হতে পারে, তার বিস্তারিত অনুমান দেওয়া হয়েছে।
সন্দেহ ও উদ্বেগও বাড়ছে

তবে সব বিশেষজ্ঞ এআইয়ের নির্ভুলতা নিয়ে পুরোপুরি আশ্বস্ত নন। অনেকের মতে, নতুন সংঘাত কখন শুরু হবে তা নির্ভুলভাবে বোঝা এখনও কঠিন। কারণ মানুষের ক্ষোভ, বৈষম্যের অনুভূতি কিংবা রাজনৈতিক আবেগের মতো বিষয় সবসময় তথ্য দিয়ে মাপা যায় না।
আরেকটি বড় উদ্বেগ হলো ভুয়া তথ্য। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর প্রচারণা বাড়ায় এআইয়ের বিশ্লেষণ ভুল পথে যেতে পারে। এজন্য কিছু প্রতিষ্ঠান গোপন তথ্যদাতা বা আন্ডারকভার পর্যবেক্ষণের তথ্যও ব্যবহার করার চেষ্টা করছে।
বিশেষজ্ঞরা আরও সতর্ক করছেন, কোনো অঞ্চলে বিদ্রোহের সম্ভাবনা প্রকাশ্যে এলে সরকারগুলো আগেভাগেই কঠোর দমননীতি নিতে পারে। এতে সাধারণ মানুষ বা ঝুঁকিতে থাকা গোষ্ঠীগুলো আরও বিপদে পড়তে পারে।
বিশ্ব রাজনীতি ও নিরাপত্তা বিশ্লেষণে এআইয়ের ব্যবহার দ্রুত বাড়লেও এর নির্ভুলতা, নৈতিকতা ও রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে বিতর্কও সমানতালে বাড়ছে। ভবিষ্যতে যুদ্ধ ঠেকাতে এই প্রযুক্তি কতটা কার্যকর হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















