ইরান যুদ্ধ শুরুর প্রায় ১০ সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও বিশ্ব তেলের বাজারে এখনো সেই ভয়াবহ ধাক্কা দেখা যায়নি, যা নিয়ে আগে আশঙ্কা করা হচ্ছিল। হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ ব্যারেল তেলের সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। এটি বিশ্বের মোট উৎপাদনের প্রায় ১৪ শতাংশ। তারপরও আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম এখনো নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই আছে।
বিশ্লেষকদের অনেকেই ধারণা করেছিলেন, যুদ্ধ দীর্ঘ হলে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫০ থেকে ২০০ ডলারে পৌঁছাতে পারে। কিন্তু এখন পর্যন্ত সেই পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। বরং বাজারে এক ধরনের অদ্ভুত স্থিতিশীলতা দেখা যাচ্ছে।
কেন স্থিতিশীল রয়েছে বাজার
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাজার এখনো আশাবাদী যে কূটনৈতিক সমাধান হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখনই যুদ্ধবিরতি বা সমঝোতার ইঙ্গিত দিচ্ছেন, তখনই বাজারে চাপ কিছুটা কমছে। এর ফলে ব্যবসায়ীরা দীর্ঘমেয়াদি সংকট ধরে নিয়ে দাম বাড়াচ্ছেন না।

এর পাশাপাশি উপসাগরীয় অঞ্চলের বাইরের দেশগুলো তেলের রপ্তানি বাড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে দেশটির দৈনিক নিট পেট্রোলিয়াম রপ্তানি প্রায় ৯০ লাখ ব্যারেলে পৌঁছেছে, যা রেকর্ডের কাছাকাছি। কানাডা, ভেনেজুয়েলা, নরওয়ে ও ব্রাজিলও অতিরিক্ত তেল বাজারে সরবরাহ করছে।
চীনের আমদানি কমে যাওয়ার প্রভাব
বিশ্বের বড় তেল আমদানিকারক দেশগুলোর মধ্যে চীন সবচেয়ে বেশি আমদানি কমিয়েছে। শুধু চীনই আগের বছরের তুলনায় দৈনিক প্রায় ৬৬ লাখ ব্যারেল কম তেল কিনেছে। অনেক চীনা পরিশোধনাগার উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে এবং কিছু আমদানি চুক্তি অন্য ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করেছে।
এতে আন্তর্জাতিক বাজারে সরাসরি চাহিদা কমে গেছে। ফলে সরবরাহ সংকট থাকলেও দাম অতিরিক্ত বাড়েনি। তবে এটি পুরোপুরি ইতিবাচক নয়। কারণ জ্বালানি ঘাটতির কারণে ইউরোপ ও এশিয়ার অনেক পরিশোধনাগার উৎপাদন কমিয়েছে। ডিজেল, পেট্রোল ও জেট জ্বালানির দামও ৬০ থেকে ১২০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।
ভোক্তাদের চাপ ও শিল্পে প্রভাব

জ্বালানির উচ্চমূল্যের কারণে সাধারণ মানুষ খরচ কমাতে শুরু করেছে। অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠানও উৎপাদন সীমিত করছে। বিশেষ করে প্লাস্টিক তৈরির কাঁচামাল ন্যাপথার সংকটে বহু কারখানা পূর্ণ সক্ষমতায় চলছে না।
বিশ্লেষকদের ধারণা, অনেক দেশ এখনো তাদের মজুত তেল ব্যবহার করছে। বিশেষ করে চীনের হাতে বিপুল পরিমাণ সংরক্ষিত তেল রয়েছে। এতে দেশটি কিছু সময়ের জন্য কম আমদানির পথ ধরে রাখতে পারবে। তবে দীর্ঘমেয়াদে এই কৌশল ধরে রাখা কঠিন হবে।
নতুন ঝুঁকিতে যুক্তরাষ্ট্র
বিশ্ববাজারের জন্য নতুন উদ্বেগ হয়ে উঠছে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি। দেশটির জ্বালানি মজুত দ্রুত কমছে। পেট্রোলের দাম আবার গ্যালনপ্রতি ৫ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছালে রাজনৈতিক চাপ বাড়তে পারে। এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র সরকার জ্বালানি রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার বিষয়ও বিবেচনা করছে বলে আলোচনা চলছে।
যদি এমন সিদ্ধান্ত আসে, তাহলে বিশ্ব তেল বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। কারণ বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রই বাজারকে সবচেয়ে বেশি সহায়তা দিচ্ছে।
সামনের দিনগুলো কতটা ঝুঁকিপূর্ণ
বিশেষজ্ঞদের মতে, এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের পদক্ষেপ বিশ্বকে কিছুটা সময় এনে দিয়েছে। কিন্তু হরমুজ প্রণালি দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলে শেষ পর্যন্ত বড় সংকট এড়ানো কঠিন হবে। তখন বিশ্ব অর্থনীতি, জ্বালানি বাজার ও সাধারণ মানুষের ওপর এর প্রভাব আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















