যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাম্প্রতিক বৈঠক বড় কোনও অগ্রগতির আশা তৈরি করলেও শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবে দেখা যায়নি। দুই দেশের চলমান বাণিজ্য দ্বন্দ্ব নিরসনে কোনও সুস্পষ্ট সমাধানও সামনে আসেনি। বরং আলোচনার পর আরও স্পষ্ট হয়েছে, বিশ্ব অর্থনীতির দুই বৃহৎ শক্তির মধ্যে আস্থার সংকট এখনো গভীর এবং সেই উত্তেজনা সহজে কমার সম্ভাবনাও কম।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সম্পর্ক এমন এক অবস্থায় পৌঁছেছে যেখানে দীর্ঘমেয়াদি সমঝোতার চেয়ে সংঘাত নিয়ন্ত্রণ করাই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ট্রাম্প বৈঠকের পর ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী মন্তব্য করলেও বাস্তবে বাণিজ্য বিরোধ নিরসনের কোনও কার্যকর কাঠামো তৈরি হয়নি।
চীনের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ রয়েছে, দেশটি রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি ও নীতিগত সহায়তার মাধ্যমে নিজেদের শিল্পখাতকে বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে। এর ফলে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় চীনের প্রভাব বাড়ছে এবং অন্য দেশগুলোর প্রতিযোগিতা দুর্বল হয়ে পড়ছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও নিজেদের অর্থনৈতিক নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে আগ্রহী নয়।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বাস্তবতা হলো দুই দেশই নিজেদের অবস্থান থেকে সহজে সরে আসতে প্রস্তুত নয়। ফলে স্থায়ী ও নিয়মভিত্তিক সমাধানের বদলে এখন আলোচনায় আসছে সীমিত সময়ের সমঝোতা এবং নির্দিষ্ট খাতে আপসের কৌশল। উদাহরণ হিসেবে বলা হয়েছে, চীন বিরল খনিজ রপ্তানিতে কিছু ছাড় দিতে পারে, আর যুক্তরাষ্ট্র উন্নতমানের চিপ রপ্তানিতে সীমিত অনুমতি দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত উৎপাদন নির্ভরতা এখন বৈশ্বিক ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে বিরল খনিজ, প্রযুক্তি যন্ত্রাংশ ও আধুনিক চিপ উৎপাদনে চীনের শক্ত অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।

এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নতুন ধরনের তদারকি ব্যবস্থার প্রস্তাবও উঠে এসেছে। এর লক্ষ্য হবে বিশ্ববাজারে কোনও একটি দেশের অতিরিক্ত আধিপত্য চিহ্নিত করা এবং প্রয়োজন হলে অন্য দেশগুলোকে সেই নির্ভরতা কমানোর সুযোগ দেওয়া। এর মাধ্যমে বাণিজ্য সংঘাতকে আরও বড় সংকটে রূপ নেওয়া থেকে ঠেকানোর চেষ্টা করা হতে পারে।
গত কয়েক বছরে যুক্তরাষ্ট্র চীনা পণ্যের ওপর উচ্চ শুল্ক আরোপ করেছে। এর প্রভাবও ইতোমধ্যে স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছর যুক্তরাষ্ট্রে চীনের রপ্তানি প্রায় ৩০ শতাংশ কমেছে। অন্যদিকে বিশ্বের অন্যান্য দেশের রপ্তানি বেড়েছে প্রায় ৯ শতাংশ। তবে বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, এতে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না। বরং সরবরাহ চেইন অন্য দেশ হয়ে ঘুরে আসছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
চীনও ইতোমধ্যে সতর্ক করেছে, যদি অন্য দেশগুলো তাদের সরবরাহকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়, তাহলে পাল্টা প্রতিক্রিয়া আসতে পারে। ফলে দুই দেশের বাণিজ্য উত্তেজনা ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত আন্তর্জাতিক বিরোধে রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এই বিরোধকে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখা। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে “বোর্ড অব ট্রেড” গঠনের প্রস্তাবও এসেছে, যার মাধ্যমে চীনের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক আরও কাঠামোবদ্ধভাবে পরিচালনার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এতে কিছু পণ্যের ওপর শুল্ক কমানো এবং “সংবেদনশীল নয়” এমন পণ্যের বাণিজ্য সহজ করার কথা বলা হয়েছে।
তবে বাস্তবতা হলো, দুই দেশের মধ্যে আস্থার সংকট এতটাই গভীর যে স্থায়ী শান্তিপূর্ণ বাণিজ্য সম্পর্ক এখনো অনেক দূরের লক্ষ্য বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
চীন-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য উত্তেজনা
চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য দ্বন্দ্ব নতুন বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। শুল্ক যুদ্ধ ও সরবরাহ সংকট নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ।
সৌমায়া কেইনস ও চ্যাড পি. ব্রাউন 


















