ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের কয়েক মাস পরও মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা কমার কোনো লক্ষণ নেই। বরং পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে যেখানে নতুন সংঘাতের আশঙ্কা ক্রমেই বাড়ছে। কূটনৈতিক আলোচনা বারবার হলেও দুই পক্ষের অবস্থান এতটাই বিপরীত যে সমাধানের পথ আরও কঠিন হয়ে উঠছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো—এই উত্তেজনা কতদিন চলতে পারে এবং কখন কোনো ভুল সিদ্ধান্ত বড় ধরনের সংঘাতে রূপ নিতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের একাংশ মনে করছে, ইরানের ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করলে তেহরান শেষ পর্যন্ত ছাড় দিতে বাধ্য হবে। তবে বিশ্লেষকদের বড় একটি অংশ বলছে, অতীত অভিজ্ঞতা দেখায় যে শুধু চাপ দিয়ে ইরানকে নতি স্বীকার করানো সম্ভব হয়নি।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে টানাপোড়েন
বর্তমান সংকটের কেন্দ্রে রয়েছে হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের জ্বালানি বাণিজ্যের বড় অংশ এই পথ দিয়ে চলাচল করে। যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং কড়া অবরোধের কারণে এই রুট কার্যত অচল হয়ে পড়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে চাপ বাড়ছে। জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কায় বিভিন্ন দেশের অর্থনীতিতেও প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।

ইরানের অবস্থান স্পষ্ট—তাদের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি, পারমাণবিক সক্ষমতা এবং হরমুজের নিয়ন্ত্রণকে তারা রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও টিকে থাকার মূল ভিত্তি হিসেবে দেখে। ফলে এসব বিষয়ে ছাড় দেওয়াকে তেহরান আত্মসমর্পণের সমান মনে করছে।
আলোচনা হলেও সমাধান নেই
পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় একাধিক দফা পরোক্ষ আলোচনা হলেও এখন পর্যন্ত কোনো অগ্রগতি হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র চাইছে ইরান দীর্ঘ সময়ের জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ রাখুক এবং মজুত সরিয়ে ফেলুক। অন্যদিকে ইরান চাইছে হামলা বন্ধ, নিরাপত্তার নিশ্চয়তা, যুদ্ধক্ষতির ক্ষতিপূরণ এবং হরমুজে তাদের কর্তৃত্বের স্বীকৃতি। এই দাবি ও পাল্টা দাবির ব্যবধান এতটাই বড় যে সমঝোতার সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে পড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, দুই পক্ষই মনে করছে সময় তাদের পক্ষেই কাজ করছে। আর এই মানসিকতাই সমঝোতার পথ আরও কঠিন করে তুলছে। যুক্তরাষ্ট্র মনে করছে অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপ বাড়ালে ইরান দুর্বল হবে। অন্যদিকে ইরান বিশ্বাস করে, দীর্ঘ চাপ সহ্য করার সক্ষমতা তাদের আছে এবং সেটাই তাদের বড় শক্তি।
ইরানের অর্থনীতিতে বাড়ছে চাপ

তবে কঠোর অবস্থানের আড়ালে ইরানের ভেতরে অর্থনৈতিক চাপও বাড়ছে। মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব এবং শিল্পখাতে ক্ষতির কারণে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে। দীর্ঘমেয়াদি অচলাবস্থা ইরানের জন্যও বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
তেহরান এখন অন্তত একটি প্রাথমিক সমঝোতার পথ খুঁজছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি সীমিতভাবে খুলে দেওয়া এবং অবরোধ কিছুটা শিথিল করার আলোচনা হতে পারে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান এখনো কঠোর।
নতুন সংঘাতের আশঙ্কা
মধ্যপ্রাচ্য বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সামরিক সমাধান কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম। বরং আরও হামলা হলে উত্তেজনা বাড়বে এবং পুরো অঞ্চল অস্থিতিশীল হয়ে পড়তে পারে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে নতুন সংঘাত শুরু হলে তার প্রভাব বৈশ্বিক অর্থনীতি পর্যন্ত পৌঁছাবে।
তাদের মতে, শেষ পর্যন্ত আলোচনার পথই একমাত্র কার্যকর সমাধান হতে পারে। তবে দুই পক্ষের অনমনীয় অবস্থানের কারণে সেই পথও এখনো অনেক দূরের বলে মনে হচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















