জাপানে বসন্ত এলেই এখন এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখা যায়। শহরের রাস্তায় হাজার হাজার মানুষ মাস্ক পরে ঘুরছেন, অনেকের হাতে অ্যালার্জির ওষুধ। বাতাসে উড়ে বেড়ানো গাছের পরাগ এখন দেশটির বড় স্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতির শিকড় লুকিয়ে আছে প্রায় ৭০ বছর আগের একটি সরকারি সিদ্ধান্তে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাপানের পাহাড়ি বনভূমির বড় অংশ ধ্বংস হয়ে যায়। তখন ভূমিধস ও মাটিক্ষয় ঠেকাতে দ্রুত বন গড়ার উদ্যোগ নেয় সরকার। সেই সময় দ্রুত বেড়ে ওঠা দুটি গাছ—সুগি ও হিনোকি—বিপুল পরিমাণে রোপণ করা হয়। কিন্তু কয়েক দশক পর সেই সিদ্ধান্তই এখন জাপানের মানুষের জন্য বড় সমস্যায় পরিণত হয়েছে।
পরাগে ভরে যাচ্ছে বাতাস

সুগি ও হিনোকি গাছ থেকে প্রচুর হালকা পরাগ ছড়ায়, যা সহজেই শহরে পৌঁছে যায়। বর্তমানে জাপানের প্রায় ৪৩ শতাংশ মানুষ মাঝারি থেকে তীব্র অ্যালার্জির সমস্যায় ভুগছেন। এতে শুধু হাঁচি-কাশি নয়, ঘুমের সমস্যা, মনোযোগ কমে যাওয়া এবং হাঁপানির মতো জটিলতাও বাড়ছে।
অর্থনীতিতেও এর বড় প্রভাব পড়ছে। কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়া ও মানুষের কেনাকাটা কমে যাওয়ার কারণে প্রতিদিন বিপুল অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়ছে দেশটি।
একরঙা বন থেকে জীববৈচিত্র্যের সংকট
এই বনগুলোতে একই ধরনের গাছ সারি সারি দাঁড়িয়ে থাকায় সেখানে পাখি, পোকামাকড় ও অন্যান্য প্রাণীর উপস্থিতিও কমে গেছে। বনগুলো অনেকটা নিস্তব্ধ ও প্রাণহীন হয়ে পড়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৈচিত্র্যময় প্রাকৃতিক বন ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় জাপানের পরিবেশও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এই পরিস্থিতি বদলাতে এখন বিভিন্ন শহর ও স্থানীয় প্রশাসন নতুন উদ্যোগ নিচ্ছে। কোথাও পুরোনো সুগি ও হিনোকি গাছ কেটে নতুন দেশীয় গাছ লাগানো হচ্ছে, কোথাও আবার বনকে প্রাকৃতিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। এতে ধীরে ধীরে পাখি, ব্যাঙ ও নানা বিরল প্রাণী আবার ফিরে আসছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

সরকারের বড় পরিকল্পনা
২০২৩ সালে জাপান সরকার অ্যালার্জিকে জাতীয় সামাজিক সমস্যা হিসেবে ঘোষণা করে। আগামী ৩০ বছরের মধ্যে পরাগের পরিমাণ অর্ধেকে নামিয়ে আনার পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে সুগি গাছের বনভূমি কমানোর উদ্যোগ চলছে।
তবে কাজটি সহজ নয়। জাপানের মোট ভূমির বিশাল অংশজুড়ে এসব বন রয়েছে। তাই শুধু গাছ কেটে ফেললেই হবে না, পরিবেশ রক্ষা ও জলবায়ু ভারসাম্য বজায় রাখতে নতুন বনও গড়ে তুলতে হবে।
নতুন প্রযুক্তি ও চিকিৎসার চেষ্টা
অ্যালার্জি মোকাবিলায় প্রযুক্তিও ব্যবহার করা হচ্ছে। কোথায় কত পরাগ ছড়াচ্ছে তা জানাতে বিশেষ পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা চালু হয়েছে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ও নতুন ওষুধ নিয়েও গবেষণা চলছে। এমনকি অ্যালার্জি কমাতে বিশেষ ধরনের চাল নিয়েও পরীক্ষা চালাচ্ছেন বিজ্ঞানীরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জাপানের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও মানুষের স্বাস্থ্য—এই তিনটি বিষয়ের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা। কারণ কয়েক দশক আগের একটি বনসৃজন নীতি আজ পুরো দেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সংকটে রূপ নিয়েছে।



সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















