প্রাকৃতিক গ্যাসের বিপুল সম্পদ কাতারকে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম ধনী দেশে পরিণত করেছিল। সেই গ্যাস রপ্তানির অর্থে রাজধানী দোহা বদলে গিয়েছিল আধুনিক নগরীতে। কিন্তু সাম্প্রতিক যুদ্ধ পরিস্থিতি ও হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর দেশটির অর্থনীতিতে নেমে এসেছে বড় ধাক্কা। দুই মাসের বেশি সময় ধরে কার্যত বন্ধ রয়েছে গ্যাস রপ্তানি, স্থবির হয়ে পড়েছে বন্দর কার্যক্রম, কমে গেছে পর্যটক ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের উপস্থিতি।
গ্যাসনির্ভর অর্থনীতিতে বড় আঘাত
কাতারের রাষ্ট্রীয় আয়ের বড় অংশ আসে প্রাকৃতিক গ্যাস ও গ্যাসভিত্তিক রপ্তানি থেকে। বহু বছর ধরে দেশটি হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে ইউরোপ ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পাঠিয়ে বিপুল অর্থ আয় করেছে। সেই অর্থ দিয়েই তৈরি হয়েছে দোহার আধুনিক অবকাঠামো, বিলাসবহুল নগর পরিকল্পনা এবং বিশ্বকাপ আয়োজনের মতো বিশাল প্রকল্প।
কিন্তু ফেব্রুয়ারিতে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। সমুদ্রপথে গ্যাস পরিবহন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কাতারের প্রধান শিল্পকেন্দ্র রাস লাফফান কার্যত অচল হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় ওই স্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে কাতারের গ্যাস উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ১৭ শতাংশ কমে গেছে।

অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা
বিশ্লেষকদের মতে, এই ক্ষতির প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে। যুদ্ধ বন্ধ হলেও আগের উৎপাদন সক্ষমতায় ফিরতে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল চলতি বছরে কাতারের অর্থনীতি সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছে। প্রতিদিন গ্যাস রপ্তানি বন্ধ থাকায় দেশটির শত শত কোটি ডলার ক্ষতি হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
একসময় বিশ্বের অন্যতম ধনী দেশ হিসেবে পরিচিত কাতার এখন অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মুখোমুখি। ব্যবসায়িক আস্থা কমে যাওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অনেক কর্মী দেশ ছাড়তে শুরু করেছেন। বিদেশি বিনিয়োগ কমে যাওয়ার আশঙ্কাও বাড়ছে।
পর্যটন খাতেও ধস
গ্যাসনির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে কাতার কয়েক বছর ধরে পর্যটন ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে নিজেদের গড়ে তোলার চেষ্টা করছিল। বিশ্বকাপ আয়োজনের পর দেশটিতে পর্যটকের সংখ্যা বাড়ছিল দ্রুত। কিন্তু যুদ্ধ পরিস্থিতির পর সেই প্রবণতায় বড় ধাক্কা লেগেছে।
দোহার ঐতিহ্যবাহী বাজার, বিলাসবহুল শপিংমল ও হোটেলগুলো এখন অনেকটাই ফাঁকা। আন্তর্জাতিক পর্যটকদের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। বিভিন্ন দেশের ভ্রমণ সতর্কতার কারণে বিদেশি দর্শনার্থীরাও কাতার এড়িয়ে চলছেন।
খাদ্য সরবরাহেও চাপ
কাতার তার প্রয়োজনীয় খাদ্যের প্রায় ৯০ শতাংশ আমদানি করে। সমুদ্রপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এখন ইউরোপ ও আমেরিকা থেকে পণ্য আকাশপথে অথবা সৌদি আরব হয়ে ট্রাকে আনা হচ্ছে। এতে ব্যয় বেড়েছে অনেক। তবে সরকার ভর্তুকি বাড়িয়ে বাজারমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছে।
রাজধানী দোহার বাসিন্দাদের অনেকেই বলছেন, তারা এখনও নিরাপদ বোধ করছেন। তবে রাস লাফফানে হামলার রাতের আগুন ও ধোঁয়ার দৃশ্য মানুষের মনে আতঙ্ক তৈরি করেছে।
চ্যালেঞ্জের মধ্যেও স্থিতিশীলতার চেষ্টা
অর্থনীতিবিদদের মতে, কাতারের বিশাল সার্বভৌম তহবিল ও বৈদেশিক সম্পদ দেশটিকে কিছু সময়ের জন্য চাপ সামলাতে সহায়তা করবে। সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দেশে থাকার জন্য উৎসাহ দিচ্ছে। কারণ বিদেশি কর্মী ও বিনিয়োগকারীরা চলে গেলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, হরমুজ প্রণালি কতদিন বন্ধ থাকে, তার ওপরই নির্ভর করবে কাতারের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক পরিস্থিতি। দীর্ঘমেয়াদে এই সংকট দেশটির গ্যাসনির্ভর এবং গ্যাস-পরবর্তী অর্থনৈতিক পরিকল্পনা—দুই ক্ষেত্রেই গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















