বিশ্বরাজনীতির মানচিত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছে। একসময় যেখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতার রেখাগুলো ছিল স্পষ্ট, সেখানে এখন দেখা যাচ্ছে জটিল সমীকরণ, অস্থায়ী সমঝোতা এবং কৌশলগত পুনর্বিন্যাস। বেইজিংয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ভ্লাদিমির পুতিনের ধারাবাহিক সফর সেই পরিবর্তনেরই নতুন ইঙ্গিত বহন করছে। বিশেষ করে যখন চীন, রাশিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্র—এই তিন শক্তির সম্পর্ক একসঙ্গে বিবেচনায় আসে, তখন প্রশ্ন উঠছে: বিশ্ব কি নতুন ধরনের ত্রিপক্ষীয় সমন্বয়ের দিকে এগোচ্ছে?
এই প্রশ্নের উত্তর এখনও নিশ্চিত নয়। তবে এটুকু স্পষ্ট, আগের মতো সরল দ্বিমেরু বা জোটভিত্তিক বিভাজনের যুগ হয়তো শেষের দিকে। এখন প্রতিটি শক্তি একইসঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বী, অংশীদার এবং দরকষাকষির খেলোয়াড়।
শি জিনপিং ও পুতিনের বৈঠকে “জঙ্গল আইন”-ভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থার বিরুদ্ধে কৌশলগত সমন্বয় জোরদারের যে ভাষা ব্যবহার হয়েছে, তা নিছক কূটনৈতিক সৌজন্য নয়। এটি এমন এক বিশ্বদৃষ্টির প্রতিফলন, যেখানে পশ্চিমা আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ জানাতে বেইজিং ও মস্কো নিজেদের আরও ঘনিষ্ঠ করছে। কিন্তু একই সময়ে চীন আবার ওয়াশিংটনের সঙ্গেও “কৌশলগত স্থিতিশীলতা” নিয়ে সম্পর্ক উন্নয়নের কথা বলছে। এই দ্বৈত কূটনীতি আসলে চীনের বাস্তববাদী অবস্থানকে তুলে ধরে।

চীনের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সংঘাত নিয়ন্ত্রণ করা, কিন্তু প্রভাব বিস্তার থামিয়ে না দেওয়া। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি উত্তেজনা কমিয়ে অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত চাপ হালকা করা যেমন দরকার, তেমনি রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রেখে একটি বিকল্প ভূরাজনৈতিক মেরু তৈরি করাও বেইজিংয়ের কৌশলগত প্রয়োজন।
এখানেই রাশিয়ার অবস্থান কিছুটা ভিন্ন। ইউক্রেন যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়া, ইউরোপীয় বাজারে প্রবেশ সংকুচিত হওয়া এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চাপ—সব মিলিয়ে মস্কো এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি চীনের ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে জ্বালানি খাতে এই নির্ভরতা স্পষ্ট। ‘পাওয়ার অব সাইবেরিয়া ২’ পাইপলাইন প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে রাশিয়া ইউরোপ হারানোর ক্ষতি আংশিকভাবে পুষিয়ে নিতে পারবে। চীনও সস্তা ও স্থিতিশীল জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারবে।
তবে সম্পর্কটি পুরোপুরি সমতার নয়। রাশিয়ার কাছে চীন এখন শুধু বড় বাজার নয়, অর্থনৈতিক নিরাপত্তার উৎসও। অন্যদিকে চীন চাইছে দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো, সরবরাহব্যবস্থা ও প্রযুক্তিগত অংশীদারত্বের মাধ্যমে পুরো জ্বালানি শৃঙ্খলে প্রভাব বিস্তার করতে। ফলে এই অংশীদারত্বের ভেতরেও ক্ষমতার ভারসাম্য ধীরে ধীরে বেইজিংয়ের দিকে ঝুঁকছে।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান সবচেয়ে অনিশ্চিত। ট্রাম্প প্রশাসন আপাতত চীনের সঙ্গে উত্তেজনা কমানোর ইঙ্গিত দিলেও, সেটি কতটা স্থায়ী হবে তা স্পষ্ট নয়। মধ্যপ্রাচ্যের সংকট, ইউক্রেন যুদ্ধ, মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন এবং ওয়াশিংটনের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজন—সবই ভবিষ্যতের নীতিকে প্রভাবিত করতে পারে।
বাস্তবে ওয়াশিংটনের কৌশল এখন দ্বিধাবিভক্ত। একদিকে চীনের সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষ এড়িয়ে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার চাপ আছে। অন্যদিকে রাশিয়া ও চীনের ঘনিষ্ঠতা ঠেকানোর প্রয়োজনও রয়েছে। এই দুই লক্ষ্য সবসময় একসঙ্গে অর্জন করা সম্ভব নয়।
তাই “ত্রিপক্ষীয় সমন্বয়” ধারণাটি যতটা আকর্ষণীয় শোনায়, বাস্তবে তা ততটাই জটিল। কারণ চীন, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের ভিতরে একই সঙ্গে রয়েছে সহযোগিতা, সন্দেহ, প্রতিযোগিতা এবং কৌশলগত হিসাব।
তবু একটি বিষয় পরিষ্কার: আন্তর্জাতিক রাজনীতি এখন আর আগের মতো স্থায়ী শত্রুতা বা স্থায়ী মিত্রতার কাঠামোয় আটকে নেই। বরং এটি পরিণত হয়েছে পরিবর্তনশীল স্বার্থের এক চলমান ভারসাম্য খেলায়। বেইজিংয়ের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক ব্যস্ততা সেই পরিবর্তনেরই প্রতিফলন।
মূল প্রশ্ন এখন হলো, এই নতুন সমীকরণ কি বিশ্বকে আরও স্থিতিশীল করবে, নাকি কেবল প্রতিদ্বন্দ্বিতার ধরন বদলাবে? উত্তর এখনও অনিশ্চিত। কিন্তু এটুকু নিশ্চিত, আগামী কয়েক বছর বিশ্বরাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে এই তিন শক্তির সম্পর্কই।
ফ্যান চেন 


















