গাজাকে ঘিরে চলমান যুদ্ধের সবচেয়ে ভয়াবহ দিকগুলোর একটি হচ্ছে সেই অন্ধকার, যা বন্দিশিবিরের দেয়ালের আড়ালে লুকিয়ে আছে। যুদ্ধক্ষেত্রে বোমা, ক্ষুধা আর ধ্বংসের দৃশ্য বিশ্ব দেখেছে। কিন্তু কারাগারের ভেতরে বন্দি ফিলিস্তিনিদের ওপর যে যৌন নির্যাতন, অপমান এবং মানসিক ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হচ্ছে, তা এখনও আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রান্তিক আলোচনার বিষয় হয়ে আছে। অথচ এসব অভিযোগ এখন আর বিচ্ছিন্ন বয়ান নয়; জাতিসংঘ, মানবাধিকার সংস্থা এবং মুক্তিপ্রাপ্ত বন্দিদের সাক্ষ্য মিলিয়ে একটি সুসংগঠিত বাস্তবতার চিত্র তৈরি হয়েছে।
এই বাস্তবতা শুধু মানবাধিকার লঙ্ঘনের গল্প নয়। এটি ক্ষমতা, দখলদারিত্ব এবং দমননীতিকে রাষ্ট্রীয় কৌশল হিসেবে ব্যবহার করার প্রশ্ন। যখন কোনো রাষ্ট্র বন্দিদের ওপর যৌন সহিংসতাকে জিজ্ঞাসাবাদ, ভয় দেখানো বা মানসিক ভাঙনের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে, তখন সেটি আর কেবল নিরাপত্তা অভিযান থাকে না; সেটি হয়ে ওঠে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের এক নির্মম ভাষা।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত একাধিক সাক্ষ্যে উঠে এসেছে, ইসরাইলি কারাগারে আটক ফিলিস্তিনি পুরুষ, নারী এমনকি শিশুদের ওপরও যৌন নির্যাতন চালানো হয়েছে। নির্যাতনের শিকার অনেকেই মুক্তির পর মুখ খুলতে ভয় পান। কারণ তাদের সতর্ক করা হয়, কথা বললে পরিণতি ভয়াবহ হবে। আবার সামাজিক বাস্তবতাও নীরবতার দেয়াল তৈরি করে। রক্ষণশীল সমাজে যৌন সহিংসতার শিকার হওয়া মানে শুধু ব্যক্তিগত ট্রমা নয়; পরিবারের সামাজিক অবস্থান, বিয়ে কিংবা সম্মানের প্রশ্নও জড়িয়ে যায়।

এই নীরবতা দখলদার শক্তির জন্য সুবিধাজনক। কারণ ভয়ের সংস্কৃতি যত গভীর হয়, তত সহজে নির্যাতন আড়ালে রাখা যায়।
কিন্তু আরও উদ্বেগজনক হলো আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া। পশ্চিমা বিশ্ব, যারা প্রায়ই মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইনের ভাষায় অন্য দেশকে উপদেশ দেয়, তারা এই অভিযোগগুলোর ক্ষেত্রে বিস্ময়করভাবে নীরব। গাজা যুদ্ধ শুরুর পর থেকে হাজার হাজার ফিলিস্তিনিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের অনেককে বিচার ছাড়াই আটক রাখা হয়েছে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন বলছে, এসব আটককেন্দ্রে নির্যাতন এখন প্রায় প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে।
জাতিসংঘের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যৌন ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা এখানে বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটি ভীতি, অপমান এবং সামাজিক ধ্বংসের একটি পরিকল্পিত উপায়। একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলো অভিযোগ করেছে, ইসরাইল কারাগারগুলোকে এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে যাতে বাইরের পর্যবেক্ষক, আইনজীবী কিংবা রেড ক্রসের মতো সংস্থাও সহজে প্রবেশ করতে না পারে। ফলে বন্দিদের অভিজ্ঞতা অনেকাংশেই অন্ধকারে ঢাকা পড়ে থাকে।
এই অবস্থার সঙ্গে আইনি কাঠামোকেও যুক্ত করা হয়েছে। জরুরি আইন, বিশেষ সামরিক বিধান এবং তথাকথিত ‘অবৈধ যোদ্ধা’ তত্ত্ব ব্যবহার করে বিচারিক তদারকি সীমিত করা হয়েছে। অর্থাৎ নির্যাতন শুধু নিরাপত্তা বাহিনীর আচরণ নয়; বরং সেটিকে কার্যত একটি বৈধ কাঠামোর ভেতরে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। এখানেই বিষয়টি আরও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। কারণ যখন রাষ্ট্রীয় আইনই জবাবদিহি কমিয়ে দেয়, তখন অপরাধের সংস্কৃতি আরও প্রাতিষ্ঠানিক হয়ে পড়ে।
![]()
এদিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত ইতোমধ্যে ইসরাইলি নেতৃত্বের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে। কিন্তু বাস্তবে তার রাজনৈতিক প্রভাব প্রায় অদৃশ্য। পশ্চিমা শক্তিগুলোর বড় অংশ এখনও কূটনৈতিক ও সামরিক সমর্থন অব্যাহত রেখেছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক আইনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন উঠছে। যদি একই ধরনের অভিযোগ অন্য কোনো রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে উঠত, তাহলে কি প্রতিক্রিয়া এতটাই নরম থাকত?
আরব বিশ্বের ভূমিকাও খুব স্বস্তিদায়ক নয়। বহু আরব রাষ্ট্র প্রকাশ্যে ক্ষোভ দেখালেও বাস্তবে তারা রাজনৈতিক সমীকরণ, কূটনৈতিক স্বার্থ এবং নিরাপত্তা জোটের হিসাব থেকে খুব বেশি দূরে যায়নি। ফলে ফিলিস্তিনিদের দুর্ভোগ নিয়ে উচ্চকণ্ঠ বিবৃতির চেয়ে কার্যকর চাপ অনেক কম দেখা গেছে।
সবচেয়ে বড় বিপদ হলো, এই নীরবতা ধীরে ধীরে একটি নতুন স্বাভাবিকতা তৈরি করছে। যেখানে যুদ্ধের সময় যৌন সহিংসতা, নির্যাতন বা বিচারবহির্ভূত দমনকে আর ব্যতিক্রম হিসেবে দেখা হচ্ছে না। বরং সেগুলোকে নিরাপত্তা নীতির অংশ হিসেবে মেনে নেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। ইতিহাস দেখিয়েছে, যখন আন্তর্জাতিক সমাজ কোনো নির্যাতনকে দীর্ঘ সময় উপেক্ষা করে, তখন সেটি আরও বিস্তৃত এবং আরও নিষ্ঠুর রূপ নেয়।
ফিলিস্তিনি বন্দিদের অভিজ্ঞতা তাই কেবল একটি আঞ্চলিক সংঘাতের গল্প নয়। এটি আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের সীমাবদ্ধতা, রাজনৈতিক দ্বিচারিতা এবং মানবাধিকারের নির্বাচনী প্রয়োগের প্রতিচ্ছবি। বিশ্বের শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো যদি সত্যিই মানবাধিকারের নৈতিক অবস্থান ধরে রাখতে চায়, তাহলে তাদের নীরবতা ভাঙতেই হবে। অন্যথায় আন্তর্জাতিক আইন কেবল দুর্বল রাষ্ট্রের জন্য প্রযোজ্য একটি রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত হবে।

জাহিদ হুসেইন 


















