ভারতের উত্তর প্রদেশের বান্দা জেলা এখন তীব্র দাবদাহের প্রতীক হয়ে উঠেছে। তাপমাত্রা ৪৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যাওয়ার পর সকাল ১০টার মধ্যেই কার্যত অচল হয়ে পড়ছে পুরো জেলা। রাস্তাঘাট ফাঁকা, দোকানে ক্রেতা নেই, মাঠে কাজ বন্ধ—অসহনীয় গরমে বদলে গেছে মানুষের জীবনযাত্রা।
স্থানীয় ব্যবসায়ী লাখন গুপ্তা প্রতিদিন ভোর ৬টায় দোকানে যান এবং সকাল ৯টার মধ্যেই বাড়ি ফিরে আসেন। তাঁর ভাষায়, এপ্রিল থেকে ব্যবসা প্রায় বন্ধ। সকাল গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে পুরো এলাকা নিস্তব্ধ হয়ে যায়। মানুষ প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে বের হচ্ছে না।
নতুন তাপমাত্রার রেকর্ড
গত ২৭ এপ্রিল বান্দায় তাপমাত্রা ওঠে ৪৭ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে, যা ছিল সেদিন ভারতের সর্বোচ্চ। এরপর মঙ্গলবার জেলায় রেকর্ড করা হয় ৪৮ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা নতুন রেকর্ড। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজস্থানের চুরু বা জয়সালমেরের মতো অতিগরম এলাকার তালিকায় এখন জায়গা করে নিয়েছে বান্দা।

স্থানীয়দের মতে, শুধু জলবায়ু পরিবর্তন নয়, দীর্ঘদিনের পরিবেশ ধ্বংসও এই সংকটকে ভয়াবহ করেছে। বন উজাড়, খনন কার্যক্রম এবং নদী থেকে অতিরিক্ত বালু উত্তোলনের কারণে এলাকার স্বাভাবিক পরিবেশগত ভারসাম্য ভেঙে পড়েছে।
রাতের অন্ধকারে কৃষিকাজ
চরম গরমের কারণে দিনের বেলায় মাঠে কাজ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। কৃষকরা এখন রাতের বেলায় এলইডি ফ্লাডলাইট জ্বালিয়ে চাষাবাদ করছেন। শ্রমিকদের অনেকেই সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টার মধ্যে কাজ করতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছেন, যদিও এতে তাঁদের আয়ের বড় অংশ কমে যাচ্ছে।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি প্রহ্লাদ ভাল্মিকি জানিয়েছেন, এলাকার মানুষ এখন তাপদাহ, পানির সংকট এবং ফসল নষ্ট হওয়ার অভিযোগ নিয়ে প্রতিদিন তাঁর কাছে আসছেন। তাঁর মতে, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে বান্দা বসবাসের অনুপযুক্ত হয়ে উঠতে পারে।
বিদ্যুৎ ব্যবস্থাও চাপে
অতিরিক্ত গরমে বান্দার বিদ্যুৎ ব্যবস্থাও বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। ৪৪টি সাবস্টেশনে ১ হাজার ৩৭৯টির বেশি ট্রান্সফরমার অতিরিক্ত তাপে বিকল হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। বিদ্যুৎকর্মীরা নিয়মিত ট্রান্সফরমারে পানি ঢেলে সেগুলো ঠান্ডা রাখার চেষ্টা করছেন।
বন ধ্বংস ও খননের প্রভাব
স্থানীয় কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় দেখা গেছে, গত তিন দশকে বান্দার ঘন বনভূমির প্রায় এক-ষষ্ঠাংশ হারিয়ে গেছে। গবেষকদের মতে, ব্যাপক খনন এবং কৃষিজমি সম্প্রসারণের কারণে এই ক্ষতি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাহাড়ি এলাকায় অতিরিক্ত বিস্ফোরণ ও খননের কারণে ভূগর্ভস্থ পানির স্বাভাবিক পুনরায় সঞ্চালন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। একই সঙ্গে পাথর ভাঙার কারখানার ধুলাবালি মাটি ও উদ্ভিদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

নদী থেকেও বালু উত্তোলন
বান্দার কেন নদী থেকেও ব্যাপক হারে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। স্থানীয় পরিবেশকর্মীদের দাবি, প্রতিদিন হাজার হাজার টন বালু নদী থেকে তোলা হচ্ছে, যার ফলে পানির স্তর দ্রুত নিচে নেমে যাচ্ছে।
পরিবেশবিদদের মতে, নদীর স্বাভাবিক বালু সরিয়ে ফেলায় পানি ধরে রাখার ক্ষমতা কমে গেছে। ফলে ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং খরার পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ধ্রুব সেন সিংয়ের ভাষায়, সবুজের অভাব, পানির সংকট এবং অতিরিক্ত উত্তপ্ত ভূমির কারণে বান্দা এখন একটি “হিট আইল্যান্ড”-এ পরিণত হয়েছে। রাতেও তাপমাত্রা কমছে না, ফলে মানুষ স্বস্তি পাচ্ছে না।
সন্ধ্যার পর ধীরে ধীরে বাজারে কিছু মানুষের আনাগোনা বাড়লেও দিনের অধিকাংশ সময় এখন স্তব্ধ হয়ে থাকে বান্দা। বাসিন্দাদের আশঙ্কা, দ্রুত পরিবেশগত পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















