রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার দ্বিতীয় তিস্তা সেতুর সংযোগ সড়কের বড় অংশ সাম্প্রতিক বৃষ্টিতে ধসে পড়েছে। সড়কের বিভিন্ন স্থানে গভীর গর্ত ও ফাটল তৈরি হওয়ায় প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছেন হাজারো যাত্রী ও পণ্যবাহী যানবাহন। স্থানীয়দের আশঙ্কা, বর্ষা আরও তীব্র হলে দ্রুত সংস্কার না করলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা কিংবা যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঘটনা ঘটতে পারে।
বিশেষ করে সেতুর উত্তর পাশের মহিপুর এলাকায় পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কয়েকদিনের টানা বৃষ্টিতে সড়কের নিচের মাটি সরে গিয়ে পিচঢালা অংশ ধসে পড়েছে। এতে রংপুর ও লালমনিরহাটের মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কে গভীর খাদ তৈরি হয়েছে।
গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক সংযোগ
দ্বিতীয় তিস্তা সেতু এবং এর সংযোগ সড়ক রংপুর ও লালমনিরহাট জেলার মধ্যে যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়। একই সঙ্গে বুড়িমারী স্থলবন্দরে যাতায়াতকারী হাজারো যাত্রী ও পণ্যবাহী ট্রাক প্রতিদিন এই পথে চলাচল করে। সেতু চালুর পর ভারী যানবাহনের চাপও অনেক বেড়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে সরেজমিনে দেখা গেছে, সেতুর উত্তর পাশের সংযোগ সড়কের অন্তত আটটি স্থানে ধস ও ফাটল তৈরি হয়েছে। কোথাও কোথাও গভীর গর্তের সৃষ্টি হয়েছে, যা যানবাহন ও পথচারীদের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।

স্থানীয় বাসিন্দা নজরুল ইসলাম বলেন, কয়েকদিনের বৃষ্টির পর সেতুর উত্তর পাশে বড় বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। দ্রুত সংস্কার না হলে যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
নির্মাণমান নিয়ে প্রশ্ন
এলাকাবাসীর অভিযোগ, অতীতেও একই ধরনের সমস্যা একাধিকবার দেখা দিয়েছে। কিন্তু বারবার সংস্কারের পরও স্থায়ী সমাধান হয়নি। এতে নির্মাণকাজের মান ও তদারকি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা রুহুল ইসলাম বলেন, প্রতি বর্ষাতেই নদীভাঙন ও ধসের সমস্যা দেখা দেয়। সাম্প্রতিক বৃষ্টির আগেই সড়কটি দুর্বল অবস্থায় ছিল। এখন অনেক জায়গায় পিচ উঠে বড় বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। আরও কয়েকদিন ভারী বৃষ্টি হলে সড়কের বড় অংশ ধসে পড়তে পারে।
তিনি অভিযোগ করেন, অতীতের সংস্কার কাজগুলো ছিল তড়িঘড়ি করে করা। ফলে একই সমস্যা বারবার ফিরে আসছে।
আরেক বাসিন্দা নিয়াজ আহমেদ বলেন, রক্ষণাবেক্ষণের নামে বারবার সরকারি অর্থ ব্যয় হলেও টেকসই সমাধান হচ্ছে না। ১৫৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সেতু ও সংযোগ সড়কে একই সমস্যা বারবার দেখা দেওয়ায় কাজের গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
কোটি টাকার সংস্কারেও মিলছে না সমাধান
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে তিস্তা সেতুর সংযোগ সড়কের প্রায় ১১ কিলোমিটার অংশ সংস্কার ও প্রশস্তকরণে প্রায় ২৮ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়। রংপুরের বুড়িরহাট থেকে গঙ্গাচড়ার সিরাজুল মার্কেট পর্যন্ত এই কাজ তিনটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে বাস্তবায়ন করে।

এ ছাড়া একই সময়ে লালমনিরহাট অংশে সিরাজুল মার্কেট থেকে কাকিনা পর্যন্ত সড়ক উন্নয়ন কাজেও কয়েক কোটি টাকা ব্যয় হয়। কিন্তু এত ব্যয়ের পরও সড়কে ধস ও গর্তের সমস্যা বন্ধ হয়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
বন্যার আগেই উদ্বেগ
লক্ষ্মীতারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল হাদি বলেন, এটি রংপুর ও লালমনিরহাটের মধ্যে সবচেয়ে ব্যস্ত সড়কগুলোর একটি। বন্যা মৌসুম শুরুর আগেই নতুন করে ধস দেখা দেওয়ায় উদ্বেগ বেড়েছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে বড় অংশ ধসে পড়ে উত্তরাঞ্চলের যোগাযোগে মারাত্মক বিঘ্ন ঘটতে পারে।
গঙ্গাচড়া উপজেলা প্রকৌশলী শাহ মো. ওবায়দুর রহমান জানান, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করা হয়েছে এবং দ্রুত সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
পুরোনো সমস্যার পুনরাবৃত্তি
২০১৯ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর দ্বিতীয় তিস্তা সেতুর উদ্বোধন করা হয়। গঙ্গাচড়ার সঙ্গে লালমনিরহাটের পাটগ্রাম, হাতীবান্ধা, কালীগঞ্জ ও আদিতমারী উপজেলার যোগাযোগ সহজ করতেই এই সেতু নির্মাণ করা হয়েছিল। পাশাপাশি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বুড়িমারী স্থলবন্দরের সঙ্গেও সংযোগ জোরদার হয়।
তবে উদ্বোধনের পর থেকেই সেতুর সংযোগ সড়কে ধস, গর্ত ও কাঠামোগত ত্রুটির সমস্যা বারবার দেখা দিয়েছে। নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে কয়েক দফা ভারী যান চলাচলেও নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে হয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















