ফ্রান্সের বহুল আলোচিত নারী গিজেল পেলিকো আবারও আন্তর্জাতিক আলোচনায়। এবার আদালতের লড়াই নয়, বরং নিজের লেখা আত্মকথা নিয়ে। ‘আ হিম টু লাইফ’ নামের বইয়ে তিনি শুধু নির্যাতনের ভয়াবহ অভিজ্ঞতাই তুলে ধরেননি, বরং নিজের অজান্তে দীর্ঘদিন ধরে কীভাবে সত্যকে এড়িয়ে গিয়েছিলেন, সেই কঠিন প্রশ্নও সামনে এনেছেন।
গত কয়েক বছরে গিজেল পেলিকোর নাম বিশ্বজুড়ে পরিচিত হয়ে ওঠে এক ভয়ংকর মামলার কারণে। অভিযোগ ছিল, তার স্বামী ডমিনিক পেলিকো এক দশকের বেশি সময় ধরে তাকে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে অচেতন করে রাখতেন এবং অন্য পুরুষদের ডেকে এনে ধর্ষণের সুযোগ করে দিতেন। আদালতে গিজেলের খোলামেলা সাক্ষ্য ও প্রকাশ্য শুনানির দাবি আন্তর্জাতিকভাবে আলোচনার জন্ম দেয়।
আত্মকথায় শুধু অভিযোগ নয়, নিজের প্রতিও প্রশ্ন

নতুন বইটিতে গিজেল পেলিকো কেবল অপরাধের বিবরণ দেননি। বরং তিনি লিখেছেন, কীভাবে এত বছর ধরে নিজের চারপাশের অস্বাভাবিক ঘটনাগুলো তিনি বুঝতে পারেননি। কখনও শারীরিক অসুস্থতা, কখনও স্মৃতিভ্রংশ, আবার কখনও আচরণগত পরিবর্তন—সবকিছুর মধ্যেও তিনি স্বামীকে সন্দেহ করতে পারেননি।
বইয়ের বিভিন্ন অংশে তিনি নিজের ভুল, দ্বিধা ও মানসিক অস্বস্তির কথাও তুলে ধরেছেন। তার ভাষায়, সবচেয়ে বড় লজ্জা ছিল সত্য বুঝতে না পারা এবং নিজেকে বোকা মনে হওয়া।
আদালতের বাইরের আরেক লড়াই
আত্মকথায় গিজেল তুলে ধরেছেন আদালতের বাইরের মানসিক সংগ্রামের কথাও। সন্তানদের সঙ্গে দূরত্ব, সমাজের বিচার, মনোবিজ্ঞানীদের বিশ্লেষণ—সবকিছুই তাকে নতুন করে নিজের পরিচয় নিয়ে ভাবতে বাধ্য করেছে।
তিনি লিখেছেন, অনেকেই তার জীবনকে নারী বনাম পুরুষের লড়াই হিসেবে দেখতে চাইলেও তিনি বিষয়টিকে আরও গভীরভাবে দেখতে চেয়েছেন। তার মতে, মানুষের মন কখনও কখনও এমন সত্য থেকেও নিজেকে দূরে রাখে, যা মেনে নেওয়া প্রায় অসম্ভব।
শৈশবের ক্ষতও ফিরে এসেছে বইয়ে

বইটিতে নিজের শৈশবের স্মৃতিও টেনে এনেছেন গিজেল পেলিকো। ছোটবেলায় মায়ের মৃত্যু তাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল বলে উল্লেখ করেছেন তিনি। সেই ট্রমা কীভাবে পরবর্তী জীবনে তার ভয়, অনিশ্চয়তা ও সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলেছে, সেটিও উঠে এসেছে বইয়ের বিভিন্ন অধ্যায়ে।
বিশেষ করে ঘুম নিয়ে তার দীর্ঘদিনের আতঙ্ক এবং নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি পরবর্তীতে জীবনের বড় ট্র্যাজেডির সঙ্গে যেন অদ্ভুতভাবে মিলে গেছে বলে মনে করেন তিনি।
ফ্রান্সে আত্মকথা ঘিরে নতুন আলোচনা
ফ্রান্সে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যৌন সহিংসতা নিয়ে লেখা আত্মকথাগুলো সামাজিক ও আইনি পরিবর্তনে বড় ভূমিকা রেখেছে। গিজেল পেলিকোর বইও সেই ধারার নতুন সংযোজন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
অনেক সমালোচকের মতে, এই বই শুধু একজন নির্যাতিত নারীর গল্প নয়। এটি মানুষের স্মৃতি, অস্বীকার, আত্মরক্ষা ও মানসিক বাস্তবতার জটিল দিকগুলোও সামনে এনেছে। ফলে বইটি সাধারণ আত্মকথার সীমা ছাড়িয়ে এক ধরনের সামাজিক দলিল হয়ে উঠেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















