বিজ্ঞান কল্পকাহিনিতে বহুদিন ধরেই দেখা গেছে মানুষের মস্তিষ্ক সরাসরি যন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত হয়ে কাজ করছে। এখন সেই ধারণাই ধীরে ধীরে বাস্তবে রূপ নিতে শুরু করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্রেন-কম্পিউটার ইন্টারফেস বা বিসিআই প্রযুক্তি ভবিষ্যতে পক্ষাঘাতগ্রস্ত, দৃষ্টিহীন কিংবা শ্রবণশক্তি হারানো মানুষের জীবনে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
এই প্রযুক্তির মাধ্যমে মানুষের মস্তিষ্ক থেকে সিগন্যাল সংগ্রহ করে তা কম্পিউটার বা অন্য যন্ত্রের নির্দেশনায় রূপান্তর করা হয়। ফলে হাত-পা নাড়াতে না পারা ব্যক্তিও শুধুমাত্র চিন্তার মাধ্যমে কম্পিউটার চালানো, রোবোটিক হাত নিয়ন্ত্রণ কিংবা লেখা তৈরি করার মতো কাজ করতে পারেন। বর্তমানে প্রযুক্তিটি এখনও পরীক্ষামূলক পর্যায়ে থাকলেও দ্রুত উন্নতি হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও উন্নত হার্ডওয়্যারের কারণে।
প্রযুক্তি দুনিয়ার বড় বিনিয়োগ

বিশ্বের ধনী প্রযুক্তি উদ্যোক্তারাও এখন এই খাতে বড় বিনিয়োগ করছেন। ইলন মাস্কের প্রতিষ্ঠান নিউরালিংক ইতোমধ্যে একাধিক রোগীর মস্তিষ্কে চিপ প্রতিস্থাপন করেছে। এসব রোগী চিন্তার মাধ্যমে কম্পিউটার ব্যবহার এবং অনলাইন গেম খেলতে সক্ষম হয়েছেন। প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য আগামী কয়েক বছরে হাজার হাজার মানুষের মধ্যে এই প্রযুক্তি ছড়িয়ে দেওয়া।
অন্যদিকে ওপেনএআই প্রধান স্যাম অল্টম্যানের সহায়তায় গড়ে ওঠা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান মস্তিষ্কে অস্ত্রোপচার ছাড়াই প্রযুক্তি ব্যবহারের পথ খুঁজছে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ভবিষ্যতে হেডফোন বা চশমার মতো দৈনন্দিন যন্ত্রেও বিসিআই প্রযুক্তি যুক্ত হতে পারে।
দৃষ্টিশক্তি ও বাকশক্তি ফেরানোর চেষ্টা
বিসিআই প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে চিকিৎসা খাতে। গবেষকরা এমন প্রযুক্তি তৈরি করছেন যা অন্ধ ব্যক্তিকে আংশিক দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিতে পারে। বিশেষ ধরনের ক্ষুদ্র চিপ চোখের পেছনে বসিয়ে বাইরের আলোর তথ্য মস্তিষ্কে পাঠানো হচ্ছে। এতে রোগীরা আকার চিনতে ও লেখা পড়তে পারছেন।
এছাড়া বাকশক্তি হারানো ব্যক্তিদের মনের ভাব সরাসরি লেখায় রূপান্তরের প্রযুক্তিও উন্নয়ন করা হচ্ছে। গবেষকরা বলছেন, একজন মানুষ কথা বলার কথা ভাবলেই মস্তিষ্কের সিগন্যাল বিশ্লেষণ করে তা স্ক্রিনে শব্দ হিসেবে দেখানো সম্ভব হচ্ছে।

চীন-যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিযোগিতা
যুক্তরাষ্ট্র এই প্রযুক্তিতে এগিয়ে থাকলেও চীন দ্রুত অগ্রগতি করছে। চীনের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে পরীক্ষামূলকভাবে রোগীদের শরীরে বিসিআই প্রতিস্থাপন করেছে। দেশটির সরকারও এই খাতে বড় বিনিয়োগ ও নীতিগত সহায়তা দিচ্ছে। ফলে আগামী বছরগুলোতে বিসিআই প্রযুক্তিকে ঘিরে নতুন বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা তৈরি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
নৈতিকতা ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
তবে প্রযুক্তিটি নিয়ে উদ্বেগও কম নয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানুষের চিন্তা যদি ভবিষ্যতে তথ্য হিসেবে সংগ্রহ করা হয়, তাহলে তা গোপনীয়তা ও নিরাপত্তার জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। হ্যাকিং, নজরদারি বা ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহারের আশঙ্কাও রয়েছে। এ কারণে কয়েকটি অঞ্চলে ইতোমধ্যে মস্তিষ্কের তথ্য সুরক্ষায় নতুন আইন করা হয়েছে।
আরেকটি বড় প্রশ্ন হলো সাধারণ মানুষ কতটা এই প্রযুক্তি গ্রহণ করবে। কারণ কার্যকর বিসিআই ব্যবহারের জন্য অনেক ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচার প্রয়োজন হতে পারে। যদিও চিকিৎসা খাতে এর সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদী বিজ্ঞানীরা।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















