পৃথিবীর গভীর সমুদ্র এখনো মানুষের কাছে অনেকটাই অজানা। সেই অজানা জগতের রহস্য উন্মোচনে এবার বড় সাফল্যের খবর দিল আন্তর্জাতিক গবেষণা উদ্যোগ ‘ওশান সেনসাস’। গত এক বছরে বিশ্বের বিভিন্ন গভীর সমুদ্র অঞ্চল থেকে ১ হাজার ১২১টি নতুন সামুদ্রিক প্রাণীর সন্ধান পেয়েছেন গবেষকেরা। এই আবিষ্কার সমুদ্রের জীববৈচিত্র্য নিয়ে নতুন আগ্রহ তৈরি করেছে বিজ্ঞানীদের মধ্যে।
বিশ্বের ৮৫টি দেশের এক হাজারের বেশি গবেষক এই অভিযানে অংশ নেন। গভীর সমুদ্রের এমন সব অঞ্চলে অভিযান চালানো হয়, যেখানে আগে খুব কম গবেষণা হয়েছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, নতুন প্রাণীগুলোর সন্ধান প্রমাণ করছে যে সমুদ্রের নিচে এখনো অসংখ্য প্রাণী রয়েছে, যাদের সম্পর্কে মানুষের কোনো ধারণাই নেই।
গভীর সমুদ্রের অদ্ভুত প্রাণী
গবেষণায় উঠে এসেছে নানা বিস্ময়কর প্রাণীর তথ্য। জাপানের উপকূলের কাছে প্রায় ২ হাজার ৬০০ ফুট গভীরে একটি বিশেষ ধরনের কৃমির সন্ধান মিলেছে। এই প্রাণী কাচের মতো স্বচ্ছ স্পঞ্জের ভেতরে বসবাস করে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, দুটি প্রাণী একে অপরের ওপর নির্ভরশীল হয়ে টিকে থাকে।

অস্ট্রেলিয়ার সমুদ্র এলাকায় খুঁজে পাওয়া গেছে এক ধরনের ‘ঘোস্ট শার্ক’। এটি হাঙরের দূর সম্পর্কের আত্মীয় বলে ধারণা করা হচ্ছে। গবেষকদের মতে, এই প্রাণীগুলোর বংশধারা কয়েকশ কোটি বছর আগের সামুদ্রিক জীবনের সঙ্গে যুক্ত।
পূর্ব তিমুর অঞ্চলে আবিষ্কৃত হয়েছে উজ্জ্বল কমলা ডোরাকাটা এক ধরনের রিবন কৃমি। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, এই প্রাণীর শরীরে থাকা রাসায়নিক উপাদান ভবিষ্যতে আলঝেইমার বা মানসিক রোগের চিকিৎসায় কাজে লাগতে পারে।
আরও ভয়ংকর এক প্রাণীর সন্ধান মিলেছে দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরের গভীরে। ‘ডেথ বল’ নামে পরিচিত এই স্পঞ্জ ছোট সামুদ্রিক প্রাণী ধরে খেয়ে বেঁচে থাকে। এর শরীরে থাকা সূক্ষ্ম কাঁটার মতো অংশ শিকার ধরতে সাহায্য করে।
সমুদ্র অনুসন্ধানে সময়ের বিরুদ্ধে লড়াই
গবেষকেরা সতর্ক করে বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তন, দূষণ এবং গভীর সমুদ্রে খনিজ উত্তোলনের পরিকল্পনা সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠছে। অনেক প্রাণী হয়তো বিলুপ্ত হয়ে যাবে, তার আগেই বিজ্ঞানীরা তাদের শনাক্ত করার সুযোগ পাবেন না।

বিজ্ঞানীদের ভাষায়, কোনো প্রাণীর বৈজ্ঞানিক নথিভুক্তি না হলে সেটিকে আইনগতভাবে সুরক্ষা দেওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে। সাধারণত নতুন কোনো প্রাণীর সন্ধান পাওয়ার পর সেটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়।
এই প্রক্রিয়া দ্রুত করতে ‘ওশান সেনসাস’ নতুন একটি পদ্ধতি চালু করেছে। এর মাধ্যমে নতুন আবিষ্কৃত প্রাণীগুলোকে দ্রুত তথ্যভান্ডারে অন্তর্ভুক্ত করা হবে, যাতে গবেষক ও নীতিনির্ধারকেরা দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
সমুদ্র গবেষণার গুরুত্ব বাড়ছে
গবেষকেরা বলছেন, মহাকাশ অনুসন্ধানের তুলনায় অনেক কম ব্যয়ে গভীর সমুদ্র নিয়ে গবেষণা করা সম্ভব। অথচ এখান থেকে পরিবেশ, জীববিজ্ঞান এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সমুদ্রের গভীরে লুকিয়ে থাকা প্রাণীগুলো শুধু পৃথিবীর জীববৈচিত্র্যের নতুন অধ্যায়ই উন্মোচন করছে না, ভবিষ্যতের ওষুধ ও বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবনের পথও খুলে দিতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















