০৬:১১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬
মহেশখালীতে ১ হাজার পরিবারকে খাদ্য সহায়তা দিল আইএসডিই বাংলাদেশ জকিগঞ্জে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন, অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আহ্বান তেলের বাজারের অদৃশ্য বিপদসীমা জিডিপির কাগুজে স্বস্তি, অর্থনীতির বাস্তব সংকট বাংলাদেশে সামনে খাদ্য সংকট কতটা প্রকট হতে পারে চীনের কূটনৈতিক ভাষা: নীতির চেয়েও শক্তিশালী অস্ত্র কয়লা, পাম অয়েল ও ফেরোঅ্যালয় রপ্তানিতে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ: ইন্দোনেশিয়া কি নতুন একচেটিয়া শক্তির পথে? খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অগ্নিকাণ্ড — আইসিইউর রোগীর মৃত্যু, তিন নার্স লাফ দিলেন তৃতীয় তলা থেকে ঢাকায় প্রতিবেশীর হাতে খুন হলো দ্বিতীয় শ্রেণির মেধাবী ছাত্রী রামিসা — আসামি গ্রেপ্তার টিকার ঘাটতিতে বাড়তে পারে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সের ঝুঁকি: নতুন নীতিপত্রে সতর্কবার্তা

কারখানায়, ঘরে বিদ্যুৎ বিভ্রাট, গরমে কাতর পোশাক শ্রমিকরা

  • Sarakhon Report
  • ০৪:০০:১৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬
  • 6

জ্বালানি সাশ্রয় করতে বাংলাদেশের অনেক কারখানায় ফ্যান ও কুলার বন্ধ রাখা হচ্ছে৷ অসহনীয় গরমে হাঁসফাঁস করছেন পোশাক শ্রমিকরা ৷ তারা গরমে অতিষ্ঠ হয়ে পড়ায় কমছে উৎপাদনশীলতা৷ এর প্রভাবে কয়েকশ কোটি ডলার ক্ষতি হতে পারে৷

বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক সরবরাহকারী দেশ বাংলাদেশে এখন বছরের উষ্ণতম সময় চলছে৷ রাজধানী ঢাকাকে ঘিরে গড়ে ওঠা পোশাক শিল্পাঞ্চলে এপ্রিলের শেষ দিক থেকে পালাক্রমে চলছে বৃষ্টি ও তীব্র দাবদাহ৷ গত কয়েকদিনে তাপমাত্রা ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস (৯৮.৬ ডিগ্রি ফারেনহাইট) পর্যন্ত ওঠে৷ তীব্র তাপের সঙ্গে ছিল উচ্চমাত্রার আর্দ্রতা৷

জাহাঙ্গীর আলম নামের পোশাক শিল্প বিষয়ক এক পরামর্শক জানান, গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকলে ব্যয় নির্বাহ করা সম্ভব নয় বলে অনেক ছোট ছোট পোশাক কারখানা জেনারেটর চালায় না৷ বিদ্যুৎ সাশ্রয় করতে কারখানাগুলোতে প্রায়ই ফ্যান এবং অন্যান্য শীতলীকরণ যন্ত্রপাতির ব্যবহার কমিয়ে দেয়া হয়৷

শ্রমিক অধিকার সংগঠন বাংলাদেশ সেন্টার ফর ওয়ার্কার সলিডারিটি-র নির্বাহী পরিচালক কল্পনা আক্তার বলেন, ‘‘এমন অসহনীয় তাপপ্রবাহের কারণে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন অনেক শ্রমিক৷ অতিরিক্ত ঘামে কাতর হওয়া, মাথা ঘোরা, বমি বমি ভাব, পেশিতে টান পড়া এবং অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিচ্ছে তাদের মধ্যে৷”

বাংলাদেশকে মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৯৫ শতাংশই আমদানি করতে হয়৷ মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংকটের কারণে জ্বালানি সরবরাহে ব্যাপক ঘাটতি দেখা দিয়েছে৷ একই কারণে জ্বালানির দামও অনেক বেড়েছে৷

ঢাকার কাছের গাজীপুর শহরের মতিন স্পিনিং মিলের ব্যবস্থাপক এ.কে.এম. কামরুজ্জামান বলেন, ‘‘জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় শিল্প-কারখানাগুলো ফ্যান, বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা এবং শীতলীকরণ যন্ত্রপাতির মতো বিষয়গুলো চালু রাখা তো দূরের কথা, উৎপাদন অব্যাহত রাখতেই তো হিমশিম খাচ্ছে তারা৷”

গত ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অফ লেবার স্টাডিজ একটি জরিপের প্রতিবেদন প্রকাশ করে৷ জরিপটির জন্য ২১৫ জন পোশাক শ্রমিকের সঙ্গে কথা বলা হয়েছিল৷ সেই ২১৫ জনের মধ্যে ৭৮ শতাংশই গ্রীষ্মকালে গরমে অতিষ্ঠ হওয়ার কথা জানিয়েছিলেন৷ অন্যদিকে জরিপে অংশ নেয়া প্রায় অর্ধেক পোশাক শ্রমিক বলেছিলেন, তাপমাত্রা অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ায় তারা শারীরিকভাবে দুর্বল ও অসুস্থ বোধ করেছেন৷

২০২৫ সালে দ্য ল্যানসেট কাউন্টডাউন-এর প্রকাশ করা তথ্যপত্রে উঠে আসে আরেক উদ্বেগজনক তথ্য৷ দ্য ল্যানসেট মেডিকেল জার্নালে বার্ষিক প্রতিবেদনের স্বাস্থ্য ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক বার্ষিক প্রতিবেদনে স্থান পাওয়া সেই অংশে বলা হয়, ২০২৪ সালে বাংলাদেশে তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে আনুমানিক প্রায় ২৯ বিলিয়ন শ্রমঘণ্টা নষ্ট হয়েছে৷ ১৯৯০ থেকে ১৯৯৯ সালে নষ্ট হওয়া গড় শ্রমঘণ্টার তুলনায় তা প্রায় ৯২ শতাংশ বেশি৷

সেই প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করা হয়, এর ফলে আনুমানিক ২৪ বিলিয়ন ডলারের মতো আয় কম হয়েছে যা বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি)-র প্রায় ৫ শতাংশের সমান৷

কর্নেল ইউনিভার্সিটির আইএলআর গ্লোবাল লেবার ইনস্টিটিউটের ২০২৩ সালের একটি গবেষণার কথাও এখানে উল্লেখ করা যায়৷ সেই গবেষণায় দেখা গেছে, কারখানার ভেতরে তাপমাত্রা কম রাখতে না পারা এবং কারখানার আশেপাশে বন্যার প্রকোপের কারণে ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ, কম্বোডিয়া, পাকিস্তান ও ভিয়েতনামের পোশাক শিল্পকে ৬৫ বিলিয়ন ডলারের মতো আয়ের ক্ষতি স্বীকার করতে হতে পারে এবং সব মিলিয়ে প্রায় ১০ লক্ষ কর্মসংস্থান হারাতে হতে পারে৷

তীব্র তাপ থেকে শ্রমিকদের রক্ষা করার মন্থর প্রয়াস

শ্রমিক নেতা এবং পোশাক খাতের বিশেষজ্ঞরা জানান, তীব্র তাপপ্রবাহের সময় শ্রমিকদের সুরক্ষার ব্যবস্থাগুলো এখনো অসংগঠিত ও অপর্যাপ্ত৷ এছাড়া  কারখানার ভেতরে তাপজনিত ঝুঁকি মোকাবিলার উপযোগী কাঠামো এখনো গড়ে ওঠেনি বলেও মনে করেন তারা৷

স্ট্যান্ডডটআর্থ, অক্সপাম এবং বাংলাদেশ সেন্টার ফর ওয়ার্কার সলিডারিটি (বিসিডাব্লিউএস)-এর যৌথভাবে করা সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়ে, বিশ্বের পাঁচটি শীর্ষস্থানীয় ব্র্যান্ড জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার গুরুত্ব স্বীকার করলেও  শ্রমিকদের ‘হিট স্ট্রেস, অর্থাৎ তাপজনিত ধকলের মতো সমস্যাগুলো মোকাবিলায় সহায়তা করতে খুব সামান্য অর্থ বরাদ্দ দিয়ে থাকে৷

গাজীপুরের পোশাক শ্রমিক, মনির শিকদার থমসন রয়টার্স ফাউন্ডেশনকে জানান, ‘‘কিছু কিছু কারখানায় অসুস্থ হয়ে পড়লে শ্রমিকদের ওরাল রিহাইড্রেশন সল্ট  (খাবার স্যালাইন) বা অন্য কোনো প্চিকিৎসাসেবার ব্যবস্থাও রাখা হয় না৷”

তিনি আরো বলেন, ‘‘(আমাদের) বাসার পরিস্থিতি আরো শোচনীয়৷ সেখানে সারাদিনে মাত্র কয়েক ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাই৷”

ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন ২০২৪ সালে যে ‘জলবায়ু কর্মপরিকল্পনা’  প্রকাশ করেছিল, সেখানে শ্রমিকসহ অন্য সাধারণ মানুষদের তীব্র গরমের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রক্ষা করার লক্ষ্যে নানামুখী পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছিল৷ পদক্ষেপগুলোর মধ্যে তাপপ্রবাহের বিষয়ে আগাম সতর্কবার্তা প্রচার, তাপজনিত অসুস্থতা মোকাবিলার লক্ষ্যে নগরীর স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা এবং বিভিন্ন ভবন ও বস্তি এলাকায় তাপ-নিরোধক ছাদ স্থাপনের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল৷

কিন্তু সেসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নে তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি বলে জানালেন আইসিএলইআই-এর বাংলাদেশ কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ মো. জুবায়ের রশিদ৷ পরিকল্পনাগুলো প্রণয়নে আইসিএলইআই সিটি কর্পোরেশনগুলোকে সহায়তা করেছিল৷

২০২৪ সালে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনও তাপ মোকাবেলার কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল, যার মধ্যে ছিল বৃক্ষরোপণ এবং নিম্ন আয়ের বাসিন্দাদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির মতো পদক্ষেপ৷

কিন্তু ২০২৪ সালে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর তাপ মোকাবেলা কর্মপরিকল্পনার কাজ থমকে যায়, বলে জানান ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের সাবেক হিট অফিসার বুশরা আফরিন৷

ব্র্যান্ডগুলোর অগ্রাধিকারে শ্রমিকদের ডিকার্বনাইজেশন

সরকার ২০২৬ থেকে ২০৩১ পর্যন্ত সময়ের জন্য একটি জাতীয় স্বাস্থ্য অভিযোজন পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে৷ অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন আগামী পাঁচ বছরে ৩ লাখ গাছ লাগানোর উদ্যোগ নিয়েছে৷

ব্র্যাক জেমস পি গ্র্যান্ট স্কুল অব পাবলিক হেলথের সহযোগী অধ্যাপক ফারজানা মিশা জানান, তার দল বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে ঢাকা জুড়ে তাপপ্রবাহের মানচিত্র তৈরি এবং একটি তাপ স্বাস্থ্য কর্মপরিকল্পনার খসড়া প্রণয়নের কাজ করছে৷ এই পরিকল্পনায় সবুজ অঞ্চল তৈরি, শীতল আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ এবং স্থানীয়ভাবে আগাম সতর্কীকরণের মতো এলাকাভিত্তিক পদক্ষেপও থাকবে বলে জানান তিনি৷

ফারজানা মিশা বলেন, বাংলাদেশে কারখানায় বায়ুচলাচল, পানীয় জল এবং প্রাথমিক চিকিৎসার দেয়ার নিয়ম থাকলেও তাপমাত্রা নির্দিষ্ট সীমা অতিক্রম করলে বাধ্যতামূলক বিরতি এবং কর্মক্ষেত্রে ক্লান্তি ও তাপজনিত চাপকে স্বীকৃতি দেওয়ার পরিস্তিতি বা তাপজনিত চাপ থেকে সুরক্ষার ব্যবস্থা এখনো অনুপস্থিত৷

জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ক্রমশ বেড়ে চলা তাপপ্রবাহ সরবরাহ শৃঙ্খলের জন্যও সমস্যা৷ কিন্তু পোশাক খাতের আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের নিয়ম মেনে চলার কথা থাকলেও এ বিষয়টি প্রায় সব সময়ই উপেক্ষিত হয়৷

ডিডাব্লিউ ডটকম

জনপ্রিয় সংবাদ

মহেশখালীতে ১ হাজার পরিবারকে খাদ্য সহায়তা দিল আইএসডিই বাংলাদেশ

কারখানায়, ঘরে বিদ্যুৎ বিভ্রাট, গরমে কাতর পোশাক শ্রমিকরা

০৪:০০:১৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬

জ্বালানি সাশ্রয় করতে বাংলাদেশের অনেক কারখানায় ফ্যান ও কুলার বন্ধ রাখা হচ্ছে৷ অসহনীয় গরমে হাঁসফাঁস করছেন পোশাক শ্রমিকরা ৷ তারা গরমে অতিষ্ঠ হয়ে পড়ায় কমছে উৎপাদনশীলতা৷ এর প্রভাবে কয়েকশ কোটি ডলার ক্ষতি হতে পারে৷

বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক সরবরাহকারী দেশ বাংলাদেশে এখন বছরের উষ্ণতম সময় চলছে৷ রাজধানী ঢাকাকে ঘিরে গড়ে ওঠা পোশাক শিল্পাঞ্চলে এপ্রিলের শেষ দিক থেকে পালাক্রমে চলছে বৃষ্টি ও তীব্র দাবদাহ৷ গত কয়েকদিনে তাপমাত্রা ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস (৯৮.৬ ডিগ্রি ফারেনহাইট) পর্যন্ত ওঠে৷ তীব্র তাপের সঙ্গে ছিল উচ্চমাত্রার আর্দ্রতা৷

জাহাঙ্গীর আলম নামের পোশাক শিল্প বিষয়ক এক পরামর্শক জানান, গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকলে ব্যয় নির্বাহ করা সম্ভব নয় বলে অনেক ছোট ছোট পোশাক কারখানা জেনারেটর চালায় না৷ বিদ্যুৎ সাশ্রয় করতে কারখানাগুলোতে প্রায়ই ফ্যান এবং অন্যান্য শীতলীকরণ যন্ত্রপাতির ব্যবহার কমিয়ে দেয়া হয়৷

শ্রমিক অধিকার সংগঠন বাংলাদেশ সেন্টার ফর ওয়ার্কার সলিডারিটি-র নির্বাহী পরিচালক কল্পনা আক্তার বলেন, ‘‘এমন অসহনীয় তাপপ্রবাহের কারণে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন অনেক শ্রমিক৷ অতিরিক্ত ঘামে কাতর হওয়া, মাথা ঘোরা, বমি বমি ভাব, পেশিতে টান পড়া এবং অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিচ্ছে তাদের মধ্যে৷”

বাংলাদেশকে মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৯৫ শতাংশই আমদানি করতে হয়৷ মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংকটের কারণে জ্বালানি সরবরাহে ব্যাপক ঘাটতি দেখা দিয়েছে৷ একই কারণে জ্বালানির দামও অনেক বেড়েছে৷

ঢাকার কাছের গাজীপুর শহরের মতিন স্পিনিং মিলের ব্যবস্থাপক এ.কে.এম. কামরুজ্জামান বলেন, ‘‘জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় শিল্প-কারখানাগুলো ফ্যান, বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা এবং শীতলীকরণ যন্ত্রপাতির মতো বিষয়গুলো চালু রাখা তো দূরের কথা, উৎপাদন অব্যাহত রাখতেই তো হিমশিম খাচ্ছে তারা৷”

গত ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অফ লেবার স্টাডিজ একটি জরিপের প্রতিবেদন প্রকাশ করে৷ জরিপটির জন্য ২১৫ জন পোশাক শ্রমিকের সঙ্গে কথা বলা হয়েছিল৷ সেই ২১৫ জনের মধ্যে ৭৮ শতাংশই গ্রীষ্মকালে গরমে অতিষ্ঠ হওয়ার কথা জানিয়েছিলেন৷ অন্যদিকে জরিপে অংশ নেয়া প্রায় অর্ধেক পোশাক শ্রমিক বলেছিলেন, তাপমাত্রা অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ায় তারা শারীরিকভাবে দুর্বল ও অসুস্থ বোধ করেছেন৷

২০২৫ সালে দ্য ল্যানসেট কাউন্টডাউন-এর প্রকাশ করা তথ্যপত্রে উঠে আসে আরেক উদ্বেগজনক তথ্য৷ দ্য ল্যানসেট মেডিকেল জার্নালে বার্ষিক প্রতিবেদনের স্বাস্থ্য ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক বার্ষিক প্রতিবেদনে স্থান পাওয়া সেই অংশে বলা হয়, ২০২৪ সালে বাংলাদেশে তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে আনুমানিক প্রায় ২৯ বিলিয়ন শ্রমঘণ্টা নষ্ট হয়েছে৷ ১৯৯০ থেকে ১৯৯৯ সালে নষ্ট হওয়া গড় শ্রমঘণ্টার তুলনায় তা প্রায় ৯২ শতাংশ বেশি৷

সেই প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করা হয়, এর ফলে আনুমানিক ২৪ বিলিয়ন ডলারের মতো আয় কম হয়েছে যা বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি)-র প্রায় ৫ শতাংশের সমান৷

কর্নেল ইউনিভার্সিটির আইএলআর গ্লোবাল লেবার ইনস্টিটিউটের ২০২৩ সালের একটি গবেষণার কথাও এখানে উল্লেখ করা যায়৷ সেই গবেষণায় দেখা গেছে, কারখানার ভেতরে তাপমাত্রা কম রাখতে না পারা এবং কারখানার আশেপাশে বন্যার প্রকোপের কারণে ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ, কম্বোডিয়া, পাকিস্তান ও ভিয়েতনামের পোশাক শিল্পকে ৬৫ বিলিয়ন ডলারের মতো আয়ের ক্ষতি স্বীকার করতে হতে পারে এবং সব মিলিয়ে প্রায় ১০ লক্ষ কর্মসংস্থান হারাতে হতে পারে৷

তীব্র তাপ থেকে শ্রমিকদের রক্ষা করার মন্থর প্রয়াস

শ্রমিক নেতা এবং পোশাক খাতের বিশেষজ্ঞরা জানান, তীব্র তাপপ্রবাহের সময় শ্রমিকদের সুরক্ষার ব্যবস্থাগুলো এখনো অসংগঠিত ও অপর্যাপ্ত৷ এছাড়া  কারখানার ভেতরে তাপজনিত ঝুঁকি মোকাবিলার উপযোগী কাঠামো এখনো গড়ে ওঠেনি বলেও মনে করেন তারা৷

স্ট্যান্ডডটআর্থ, অক্সপাম এবং বাংলাদেশ সেন্টার ফর ওয়ার্কার সলিডারিটি (বিসিডাব্লিউএস)-এর যৌথভাবে করা সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়ে, বিশ্বের পাঁচটি শীর্ষস্থানীয় ব্র্যান্ড জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার গুরুত্ব স্বীকার করলেও  শ্রমিকদের ‘হিট স্ট্রেস, অর্থাৎ তাপজনিত ধকলের মতো সমস্যাগুলো মোকাবিলায় সহায়তা করতে খুব সামান্য অর্থ বরাদ্দ দিয়ে থাকে৷

গাজীপুরের পোশাক শ্রমিক, মনির শিকদার থমসন রয়টার্স ফাউন্ডেশনকে জানান, ‘‘কিছু কিছু কারখানায় অসুস্থ হয়ে পড়লে শ্রমিকদের ওরাল রিহাইড্রেশন সল্ট  (খাবার স্যালাইন) বা অন্য কোনো প্চিকিৎসাসেবার ব্যবস্থাও রাখা হয় না৷”

তিনি আরো বলেন, ‘‘(আমাদের) বাসার পরিস্থিতি আরো শোচনীয়৷ সেখানে সারাদিনে মাত্র কয়েক ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাই৷”

ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন ২০২৪ সালে যে ‘জলবায়ু কর্মপরিকল্পনা’  প্রকাশ করেছিল, সেখানে শ্রমিকসহ অন্য সাধারণ মানুষদের তীব্র গরমের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রক্ষা করার লক্ষ্যে নানামুখী পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছিল৷ পদক্ষেপগুলোর মধ্যে তাপপ্রবাহের বিষয়ে আগাম সতর্কবার্তা প্রচার, তাপজনিত অসুস্থতা মোকাবিলার লক্ষ্যে নগরীর স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা এবং বিভিন্ন ভবন ও বস্তি এলাকায় তাপ-নিরোধক ছাদ স্থাপনের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল৷

কিন্তু সেসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নে তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি বলে জানালেন আইসিএলইআই-এর বাংলাদেশ কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ মো. জুবায়ের রশিদ৷ পরিকল্পনাগুলো প্রণয়নে আইসিএলইআই সিটি কর্পোরেশনগুলোকে সহায়তা করেছিল৷

২০২৪ সালে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনও তাপ মোকাবেলার কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল, যার মধ্যে ছিল বৃক্ষরোপণ এবং নিম্ন আয়ের বাসিন্দাদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির মতো পদক্ষেপ৷

কিন্তু ২০২৪ সালে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর তাপ মোকাবেলা কর্মপরিকল্পনার কাজ থমকে যায়, বলে জানান ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের সাবেক হিট অফিসার বুশরা আফরিন৷

ব্র্যান্ডগুলোর অগ্রাধিকারে শ্রমিকদের ডিকার্বনাইজেশন

সরকার ২০২৬ থেকে ২০৩১ পর্যন্ত সময়ের জন্য একটি জাতীয় স্বাস্থ্য অভিযোজন পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে৷ অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন আগামী পাঁচ বছরে ৩ লাখ গাছ লাগানোর উদ্যোগ নিয়েছে৷

ব্র্যাক জেমস পি গ্র্যান্ট স্কুল অব পাবলিক হেলথের সহযোগী অধ্যাপক ফারজানা মিশা জানান, তার দল বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে ঢাকা জুড়ে তাপপ্রবাহের মানচিত্র তৈরি এবং একটি তাপ স্বাস্থ্য কর্মপরিকল্পনার খসড়া প্রণয়নের কাজ করছে৷ এই পরিকল্পনায় সবুজ অঞ্চল তৈরি, শীতল আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ এবং স্থানীয়ভাবে আগাম সতর্কীকরণের মতো এলাকাভিত্তিক পদক্ষেপও থাকবে বলে জানান তিনি৷

ফারজানা মিশা বলেন, বাংলাদেশে কারখানায় বায়ুচলাচল, পানীয় জল এবং প্রাথমিক চিকিৎসার দেয়ার নিয়ম থাকলেও তাপমাত্রা নির্দিষ্ট সীমা অতিক্রম করলে বাধ্যতামূলক বিরতি এবং কর্মক্ষেত্রে ক্লান্তি ও তাপজনিত চাপকে স্বীকৃতি দেওয়ার পরিস্তিতি বা তাপজনিত চাপ থেকে সুরক্ষার ব্যবস্থা এখনো অনুপস্থিত৷

জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ক্রমশ বেড়ে চলা তাপপ্রবাহ সরবরাহ শৃঙ্খলের জন্যও সমস্যা৷ কিন্তু পোশাক খাতের আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের নিয়ম মেনে চলার কথা থাকলেও এ বিষয়টি প্রায় সব সময়ই উপেক্ষিত হয়৷

ডিডাব্লিউ ডটকম