এ মুহূর্তে হরমুজ প্রণালী বন্ধ হওয়ায় বা সেখানে বাধা সৃষ্টি হওয়ায় জ্বালানি তেলের মূল্য নিয়ে বাংলাদেশের মানুষ চিন্তিত। সকলের চিন্তা হরমুজ প্রণালী কতদিনে খুলতে পারে, তেলের বাজার আবার কবে স্বাভাবিক হবে? বেশিরভাগের চিন্তায় হরমুজ প্রণালীর সঙ্গে এশিয়ার সার সরবরাহের বিষয়টি এখনও খুব বেশি সামনে আসেনি। যুদ্ধ যে খুব সহজে শেষ হবে না এটা এতদিনে সকলের কাছে পরিষ্কার হয়ে গেছে। তাই হরমুজ প্রণালী দিয়ে যেমন পৃথিবীর মোট জ্বালানির ২০ থেকে ২৫ ভাগ পার হয় এ কারণে জ্বালানি সংকট দীর্ঘ দিন চলবে। তেমনি হরমুজ প্রণালী দিয়ে পৃথিবীর সারের ৩০ থেকে ৩৫ ভাগ পার হয়। এবং যার বড় অংশ এশিয়াতেই আসে। তাই সারের অভাবে এই এলাকায় খাদ্য সংকট ও খাদ্য মূল্যের ঊর্ধ্বগতির বিষয়টিও ধীরে ধীরে আরও বাড়বে। এমনকি ইতোমধ্যে এর প্রভাব অন্যতম চাল উৎপাদনকারী দেশ ইন্দোনেশিয়ার ওপর পড়েছে। তারা অতিরিক্ত গম কেনার মধ্য দিয়ে খাদ্য মজুদ বাড়ানো শুরু করেছে।
হরমুজ প্রণালী নিয়ে যুদ্ধ যেদিকে যাচ্ছে তাতে এশিয়ায় এ মুহূর্তে চীন ছাড়া অন্য কোনো দেশের জন্য এই খাদ্য উৎপাদনকারী সার মজুদ রাখার কাজে অন্য কোনো দেশ খুব বেশি সুবিধা করতে পারবে কি? অতটা সক্ষমতা এশিয়ার অন্য কোনো দেশের নেই। বাস্তবে হরমুজ প্রণালী ২০ থেকে ২৫ ভাগ জ্বালানি চলাচল ও ৩০ থেকে ৩৫ ভাগ সার চলাচল আটকে দিয়ে এশিয়ার খাদ্য সংকটকে একটি জটিল প্রক্রিয়ায় নিয়ে গেছে। জ্বালানির অভাবে ও উচ্চমূল্যের ফলে কৃষি উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হবে দুইভাবে। পরিপূর্ণ উৎপাদনে যেতে পারবে না সার, বিদ্যুৎসহ জ্বালানি সংশ্লিষ্ট কৃষি উৎপাদনের উপকরণের অভাবে। অন্যদিকে যে সব দেশের কাছ থেকে আমদানি করতে হবে তাদেরও উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে ইতোমধ্যে উচ্চ জ্বালানি মূল্যের ও সারের অভাবের কারণে। তাই বাংলাদেশকে আমদানিও করতে হবে বেশি দামে। বাংলাদেশে এবার যখন বোরো চাষ শুরু হয় তখনও জ্বালানি মূল্য বাড়েনি। এমনকি বোরো সংগ্রহের একমাস বাকি থাকা পর্যন্ত সরকার ভর্তুকি দিয়ে জ্বালানির দাম কম রেখেছিল। কিন্তু সমস্যা ছিল ওই সময়ে প্রয়োজনীয় যে জ্বালানি বিশেষ করে ডিজেল সরবরাহ রেশনিং পদ্ধতিতে চলছিল। অর্থাৎ প্রয়োজনীয় জ্বালানি না পাওয়ার ফলে প্রথম দিকে কিছুটা হলেও ক্ষতি হয় বোরো ক্ষেতের। তবে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন এলাকায় শেখ হাসিনার আমলে করা সোলার সিস্টেমের কারণে বেশ বড় একটা অংশের বোরো চাষের কোনো ক্ষতি হয়নি। কিন্তু শেষ মুহূর্তে ক্ষতি হয়ে গেছে বৃহত্তর সিলেট ও বৃহত্তর ময়মনসিংহের যে অংশ দেশের চাহিদার একটি বড় অংশের বোরো ধান জোগান দেয় ওই এলাকাগুলোর পাকা ধান সংগ্রহ করতে না পারায়- অর্থাৎ পানিতে ডুবে গড়ে ওই এলাকায় ৭৫% বোরো ধান নষ্ট হয়ে গেছে। যদিও এটাকে প্রাকৃতিক বলা হচ্ছে, তবে বিগত বহুদিনের অভিজ্ঞতা ও বাস্তবতা মিলিয়ে যে কেউ একটু পর্যালোচনা করলে বুঝতে পারবেন- এই ফসল নষ্ট হবার একটি বড় কারণ ওই সব এলাকার জনপ্রতিনিধিদের অনঅভিজ্ঞতা বা সচেতন না হওয়া। পানি ধীরে ধীরে বেড়েছিল। পানির গতি যে তীব্র হবে সামনে তাও বোঝা যাচ্ছিল। সচেতন হলে আরও কিছুটা ফসল রক্ষা করা যেত। আরও কয়েক পার্সেন্ট বেশি ধান কৃষকের ঘরে আসত। যাহোক, বোরো এখন অতীত। সামনে আমন ধানের চাষের মৌসুম আসছে। আমন ধান দেশের চালের এখনও বড় অংশের জোগান দেয়। আমন ধানের চাষের মৌসুমটি যে সময়ে আসছে তার আগেই ডিজেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের দুই মূল জ্বালানি এখন আন্তর্জাতিক বাজারে পর্যাপ্ত নেই তেমনই দামও বেশি। অন্যদিকে তরল গ্যাসের সংকটের ফলে দেশের ইউরিয়া সার কারখানাগুলোর সিংহভাগ বন্ধ। বাংলাদেশে ফসফেট ও ইউরিয়া সারের উৎপাদনের বড় উৎস ছিল সৌদি আরব ও কাতার। বাংলাদেশকে তার মোট চাহিদার ৬৪% এর কিছু বেশি তরল গ্যাস আমদানি করতে হয়। যার একটি বড় অংশ ইউরিয়া সার উৎপাদনে ব্যবহার হয়। এই তরল গ্যাসের ৩০ ভাগেরও বেশি আমদানি হতো কাতার থেকে। যে মুহূর্তে এ লেখা লিখছি এ দিনের নিউইয়র্ক টাইমসের প্রধান খবর- কাতার ধনী দেশ থেকে এখন একটি বিপর্যস্ত দেশে পরিণত হয়েছে। বাস্তবে প্রতি বছর ৭৭ মিলিয়ন মেট্রিক টনের ওপরে গ্যাস উৎপাদনকারী এই দেশটি- পৃথিবীর ২২ থেকে ২৫ ভাগ কখনও সর্বনিম্ন হলেও ২০ ভাগ তরল গ্যাসের চাহিদা মেটায়- সেই দেশটি গত দুই মাস কোনো গ্যাস রফতানি করেনি। এবং তাদের গ্যাস ক্ষেত্রগুলো যেভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তার ফলে আগামী দুই বছরের মধ্যেও তারা স্বাভাবিক অবস্থায় যেতে পারবে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ আছে। কারণ ইরানের মিসাইল আক্রমণের ফলে অধিকাংশ গ্যাস ক্ষেত্রের কূপের অবস্থানচ্যুতি ঘটে গেছে। যার ফলে ইতোমধ্যে স্পট মার্কেটে ইউরিয়া সারের মূল্য ১৬০% বেড়ে গেছে। ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপিন্স, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া প্রভৃতি ধান উৎপাদনকারী দেশগুলো এখন ইউরিয়া সার সংগ্রহে ব্যস্ত। এ সপ্তাহের জাকার্তা পোস্টের খবর অনুযায়ী ওই এলাকার স্পট মার্কেটগুলোতে ইউরিয়া সার স্পট মার্কেটে একদিনেই বেড়ে ১৬০% বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। আর স্পট মার্কেটগুলোতে যে সময়ে কোনো পণ্যের দাম এমন ওঠা-নামা করে, বিশেষ করে বেশিভাগ সময়ই ঊর্ধ্বগতি থাকে- ওই সময়ে কোনো সরকারের পক্ষে কোনো কোম্পানির কাছ থেকে টেন্ডার পদ্ধতিতে ওই পণ্য কেনা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। কারণ, সকল কোম্পানিই তখন স্পট মার্কেটের দিকে ঝুঁকে যায় অস্বাভাবিক লাভের আশায়। অনেকটা শেয়ার মার্কেটের মতো। আর যে কোনো দেশের সরকারের কাছ থেকে বড় কোম্পানিকে বাদ দিয়ে সরাসরি কোনো কিছু কিনতে গেলে বেশিক্ষেত্রে দেশগুলো যে অন্যান্য শর্ত দেয়- সেগুলো পূরণ করতে গেলে ক্রেতা দেশের অর্থনীতির অন্যদিকে অনেক বেশি ক্ষতি হয়।
এখনও অনেকে বলছেন, ইরান যুদ্ধ যে কোনো দিন শেষ হয়ে যেতে পারে। কারণ ট্রাম্প একটি সম্মানজনক এক্সিট খুঁজছেন। যারা বলছেন, তাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা রেখেই বলছি, যুদ্ধ যিনি শুরু করেন, এই শুরু করার কাজটি তার হাতে থাকে- শেষ করার কাজটি কোনো মতেই তার হাতে থাকে না। পৃথিবীর যুদ্ধের ইতিহাস কিন্তু তাই বলে। যুদ্ধের গতি, প্রভাব এগুলো শেষ অবধি পৃথিবীকে কোথায় টেনে নিয়ে যায় তাও বলা খুবই কঠিন। আর ইরান যুদ্ধের প্রভাব যে যুদ্ধের ক্ষতির থেকে পৃথিবী জুড়ে আরও অন্যান্য খাতে বেশি পড়েছে তা ইতোমধ্যে প্রমাণিত। ইরান যুদ্ধ নিয়ে আমার প্রথম লেখায় লিখেছিলাম, ৭০ দশকের জ্বালানি যুদ্ধের থেকেও ইরানের জ্বালানি যুদ্ধ ভয়াবহ। কয়েকজন প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, তেলের বাজারের গতি বা অন্যান্য ইনডিকেটর হিসাব করলে কোনো মতেই ৭০ দশকের জ্বালানি যুদ্ধের থেকে এটাকে বড় বলা যাবে না। তাদের প্রতি বিনীতভাবে বলছি, ৭০ দশকের ওই জ্বালানি যুদ্ধের সময় আমেরিকাও তেল আমদানিকারক দেশ ছিল। আর এবার হরমুজ যখন বন্ধ করে ইরান যুদ্ধকে “জ্বালানি যুদ্ধে” নিয়ে গেছে সে সময়ে আমেরিকা তেল ও খাদ্য বা কৃষিপণ্য রফতানিকারী দেশ। এ কারণে এখানে একটি বিষয় চিন্তা করা প্রয়োজন। আমেরিকা যুদ্ধ শুরু করলে ইরান যে হরমুজ বন্ধ করে দেবে না এটা তো যে কোনো সাধারণ যুদ্ধ বিজ্ঞান পড়া ও জিওগ্রাফিকাল পাওয়ার সম্পর্কে ন্যূনতম ধারণা থাকা মানুষের পক্ষেই বোঝা সম্ভব। এ কারণে যে আমেরিকার হিসেবে যে বিষয়টি ছিল না তা কিন্তু এখন আর বলা যাচ্ছে না। কারণ, ইরান যেমন হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে নিজেকে রক্ষা করছে, তেমনি হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকাতে আমেরিকা ও ইউরোপের তেল কোম্পানিগুলো কি অধিকতর লাভবান হয়নি গত দুই মাসে? কোম্পানিগুলোর ওয়েব সাইটে গেলেই, তাদের শেয়ার বিক্রির লাভ দেখলেই বোঝা যাবে। পাশাপাশি এই জ্বালানি তেলের দাম ও ইরান যুদ্ধের ফাঁদে ফেলে আমেরিকা থেকে কত দেশকে বেশি দামে তাদের কাছ থেকে তেল ও কৃষিপণ্য কিনতে বাধ্য করতে সমর্থ হচ্ছে- তাও এখন স্পষ্ট। তাই এ যুদ্ধে সামরিক ও ভূ-রাজনীতিতে আমেরিকার পরাজয় মনে হলেও- ডলারের মূল্য বৃদ্ধি, বেশি দামে জ্বালানি তেল ও কৃষিপণ্য বিক্রির সুবিধার দিক থেকে আমেরিকা এগিয়ে আছে। ফলে যুদ্ধ শেষ করার তাগিদ তারাও বা কেন থাকবে? এ বাস্তবতায় বাংলাদেশে এ মুহূর্তে সব ধরনের কৃষিপণ্য উৎপাদনের খরচ ও আমদানি খরচ বেড়ে গেছে। আগামীতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও সারের দাম আরও বাড়বে। ফলে উৎপাদন খরচ আরও বাড়বে। সরবরাহ ও আমদানি খরচও বাড়বে। আবার এ সময়ে বাংলাদেশ বাধ্য হচ্ছে আমেরিকা থেকে বেশি দামে গম ও অন্যান্য কৃষিপণ্য এমনকি সুতা ও তুলাও কিনতে। যেখানে শুধু দাম নয়, পরিবহন খরচও বেশি। কেউ হয়তো বলতে পারেন, এটা তো ইরান যুদ্ধের আগেই ইউনূসের করা চুক্তির কারণে বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। কিন্তু এখন বাস্তবতা হচ্ছে দ্রুতই আমেরিকার বাইরে গমসহ অনেক কৃষিপণ্যের বাজার ঊর্ধ্বমুখী থাকবে। যেমন এই জ্বালানি ও সারা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও আফ্রিকার ভোজ্য তেলের উৎপাদন খরচও বাড়িয়ে দিচ্ছে। তাই বাংলাদেশের জন্য কম দামে খাদ্যপণ্য আমদানির স্পেসটা কমে যাচ্ছে। সার আমদানির সুযোগ কমে যাচ্ছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তানের মতো দরিদ্র দেশগুলোতে জ্বালানি মূল্য বাড়লে ছোট কৃষক কৃষিকাজের ক্ষেত্র কমিয়ে দেয়। কারণ, পণ্য সরবরাহের খরচ বেড়ে যাওয়াতে তার পক্ষে আর পণ্য বাজারে নেওয়া সম্ভব হয় না। বাজারও তার কাছে পৌঁছায় না।
মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতে এক ধরনের অর্থনীতিবিদ আছেন। তারা যে আসলে কার হয়ে কাজ করেন সেটাও বড় প্রশ্ন। যমুনা রেলসেতু, পদ্মা রেলসেতু, রূপপুর বিদ্যুৎ কেন্দ্র এগুলোকে তারা সব সময় অর্থনীতির শ্বেতহস্তী, অহেতুক মেগা প্রজেক্ট ইত্যাদি বলে এক শ্রেণীর তথাকথিত রাজনীতিক ও সাধারণ জনগণের মধ্যে একটি ভুল ধারণা সৃষ্টি করে। এরা বাস্তবে কোনো তেল কোম্পানির হয়ে কাজ করে কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। কারণ ডিজেল নির্ভর সরবরাহ ব্যবস্থা সব দেশে সব সময়ের জন্যই ব্যয়বহুল। আর এ ধরনের আপদকালীন বা জ্বালানি যুদ্ধকালীন সময়ে তো আরও বেশি ব্যয়বহুল। তাই একটা দেশের কম খরচের নির্ভরযোগ্য সরবরাহ চেইন তৈরি করতে হলে অবশ্যই রেলব্যবস্থা যত বেশি সম্প্রসারণ ও সহজ করা যাবে ততই সেটা টেকসই সরবরাহ ব্যবস্থা হবে। আর এই রেলের জন্য বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে হলে সে বিদ্যুৎকেও যে কোনো ধরনের তেল গ্যাস নির্ভর জ্বালানি থেকে বের হয়ে আসতে হবে। যেমন এ মুহূর্তে পৃথিবীর প্রতিটি দেশই চেষ্টা করছে, সৌর বিদ্যুৎ, ব্যাটারি প্রযুক্তি, বিদ্যুৎ চালিত গাড়ি ও বায়ু শক্তির মাধ্যমে জ্বালানি তেলের খরচের বিপরীতে কিছুটা সাশ্রয় করার জন্যে। বাংলাদেশের প্রকৃতি ওই অর্থে বায়ু শক্তি ও সৌর বিদ্যুতের পক্ষে নয়। তাই বাংলাদেশে যতটুকু যা হয়েছে তা ওই পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র। আর কয়লা চালিত বিদ্যুৎ। তবে কয়লার দামও বেড়ে গেছে ইতোমধ্যে ইন্দোনেশিয়া ও আফ্রিকাতে। চীন, ভারতের মতো বড় চাহিদার দেশগুলো তাদের কয়লার চাহিদাও বাড়িয়ে দিয়েছে। তাতে দাম আরও বেড়ে যাবে। আর এ সবগুলোরই প্রভাব পড়া শুরু হয়ে গেছে। তাই আগামী আমন ফসল, রবি শস্য উৎপাদন বা বাংলাদেশ যে সারা বছর সবজি উৎপাদনে ঢুকে গিয়েছিল- সব কিছুতেই উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে। যার ফলে একদিকে কৃষিপণ্যের বা খাদ্যের দাম বেড়ে তো যাবেই অন্যদিকে সবজি জাতীয় পণ্যের উৎপাদন কমে যেতে পারে। কারণ দেশীয় বাজারের বাইরে রফতানি বাজার ছোট হবার সম্ভাবনা বেশি পরিবহন খরচের কারণে। জেট ফুয়েলের দাম বৃদ্ধি ও বাজেট এয়ারের কারণে পৃথিবীতে যে কানেকটিভিটি এসেছিল এবং কৃষিপণ্য রফতানিতে যে সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল- সেখানে ইতোমধ্যে বাধা পড়ে গেছে। বাজেট এয়ার তো প্রায় সবই ধুঁকছে। এমনকি বড় বড় এয়ারলাইন্সগুলোর অনেকগুলোই এখন দেউলিয়া হবার পথে। ফলে বাংলাদেশের মতো দেশগুলো যদি অতি শীঘ্রই এমন একটি চক্রে ঢুকে যেতে পারে যে কৃষক উৎপাদন মূল্য পাবে না অন্যদিকে মধ্যবিত্তকে বেশি দামে কৃষিপণ্য কিনতে হবে। তাই বাংলাদেশের জিডিপির মূল ভিত্তি কৃষিতে যে খুব বড় আকারের ধাক্কা আসছে এটাকে অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। অন্যদিকে বাংলাদেশের মোট রফতানির ৮৫ থেকে ৮৬ ভাগ যে গার্মেন্টস খাত। সে খাতের মালিক সংগঠন ইতোমধ্যে বলেছে- বিদ্যুৎ ও জ্বালানিসহ অন্যান্য আস্থাহীনতার কারণে তাদের অধিকাংশ অর্ডার এখন চলে যাচ্ছে। অর্থাৎ দেশের ৫৭/৫৮ বিলিয়ন ডলার রফতানির ৪৮ বিলিয়নের মতো রফতানির গার্মেন্টস খাতও এখন খাদের মুখে দাঁড়িয়ে। আর এখানেও দ্বিমুখী সংকট, এক দেশ রফতানি হারাবে; অন্যদিকে দরিদ্র লাখ লাখ মানুষ কাজ হারাবে। তাদের খাদ্য কেনার অর্থ কমে যাবে বা থাকবে না। সর্বশেষ গত প্রায় সাড়ে তিন দশক নিজ উদ্যোগ ছাড়া সরকারি উদ্যোগ মোটেই ছিল না জন্মনিয়ন্ত্রণ প্রকল্পে। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল বেশি মানুষ জন্ম দিয়ে- বিদেশে শ্রমিক রফতানি। এ লেখায় কাতারের প্রসঙ্গ প্রথমেই এসেছে। অর্থাৎ আগামী বেশ কয়েক বছর কাতার আর আগের মতো ধনী দেশ থাকতে পারছে না। বরং তার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত, সৌদি আরবও বড় বড় প্রকল্প অর্থাভাবে বন্ধ করছে, ইউনাইটেড আরব আমিরাতও তাই। এসবই ইরান আমেরিকা যুদ্ধের ক্ষতির ফলে। তাই স্বাভাবিকই এ দেশগুলো থেকে এখন প্রতিদিনই শ্রমিক ফিরে আসবে। লিবিয়া, ইরাক, সিরিয়ার শ্রম বাজার আগেই চলে গেছে। বন্ধ হয়ে আছে মালয়েশিয়ার শ্রম বাজার। এর ফল কি হচ্ছে তা নেপালের কিছু ঘটনা আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় এসেছে। সেখানে প্রতিদিনই কোনো না কোনো পরিবারে স্বপ্ন ভেঙে যাচ্ছে- প্রবাসী শ্রমিক ফিরে আসাতে। যার নিট রেজাল্ট শারীরিক পরিশ্রম করে যে ডলার শ্রমিকরা দেশে পাঠাত সেই খাতেও ধাক্কা লেগেছে। বাংলাদেশকেও এর বাইরে বেশি দিন থাকা অনেকটা অসম্ভব। আর এর বিপরীতে ইতোমধ্যেই জ্বালানি কেনার জন্য চার বিলিয়ন ডলার বাড়তি মূল্য দিতে হয়েছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে। অর্থাৎ যখন সরকারের অনেক বেশি ডলার বা রিজার্ভ প্রয়োজন সেই সময়ে চারিদিক থেকেই সংকট আসছে। এমন সময়ে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ফলে আগামী ১ জুলাই থেকে সরকারি কর্মচারীদের নতুন পে স্কেল ঘোষণা করতে যাচ্ছে সরকার। এই নতুন পে স্কেল ঘোষণা হচ্ছে এমন একটি সময় যখন বেসরকারি খাত ধুঁকছে, কৃষকের উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে। গ্রামে গ্রামে যে প্রবাসী শ্রমিকরা অর্থের জোগান দিত- তা সংকুচিত হয়ে আসছে। অর্থাৎ এই নতুন পে স্কেলের প্রভাবে বাজারে পণ্যের দাম যখন আরও বাড়বে সে সময়ে বেসরকারি খাতে চাকরি হারাচ্ছে মানুষ, বেতন অনিয়মিত, অবসরপ্রাপ্তদের সঞ্চয়পত্র ও অন্যান্য ব্যাংকিং আয়ের সুবিধা কমে গেছে। বাজারের পণ্যের দামের সঙ্গে বিশেষ করে খাদ্যপণ্যের দামের সঙ্গে বাঁটা করলে টাকার বা সুদের হারের মান নেই বললেই চলে। যার ফলে বিপুল সংখ্যক মানুষ খাদ্য কেনার সামর্থ্য হারিয়ে ফেলবে। ইতোমধ্যেই প্রোটিনসহ অন্যান্য খাদ্য কেনার সামর্থ্য একটি বিপুল সংখ্যক মানুষ হারিয়ে ফেলেছে। তাই জ্বালানি সংকট এখন মিডিয়ায় ও আলোচনায় বেশি হলেও বাস্তবে আঘাতটি ধেয়ে আসছে খাদ্য সংকটের দিক থেকে। আর এ ধরনের সংকটে যখন দেশ ঢুকে যায়, এ সময়ে বিদেশি ঋণ, আস্থার অর্থনীতি ও সুচিন্তিত রাষ্ট্র পরিচালকই থাকে দেশের মানুষের বাঁচানোর পথ। অস্থিরতা, কৃচ্ছ্রতা এগুলো বাস্তবে কোনো কাজে আসে না। তাই এখন শুধু প্রার্থনা করা যায়, কোনো কবিকে যেন লিখতে না হয় “খর দুপুরে কোথায় আমি অন্ন পাবো”? লেখক: সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিক, সম্পাদক, সারাক্ষণ, The Present World.
বাংলাদেশে সামনে খাদ্য সংকট কতটা প্রকট হতে পারে
-
স্বদেশ রায় - ০৫:৩৮:৪১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬
- 48
জনপ্রিয় সংবাদ
স্বদেশ রায় 



















