বাংলাদেশে টিকাদানের ঘাটতি বাড়তে থাকলে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স বা এএমআরের ঝুঁকি আরও তীব্র হতে পারে বলে সতর্ক করেছে নতুন একটি নীতিপত্র। গ্লোবাল অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স পার্টনারশিপ (গার্প) প্রকাশিত এই নীতিপত্রে বলা হয়েছে, টিকা শুধু সংক্রামক রোগ প্রতিরোধেই নয়, অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার কমানো এবং ওষুধ প্রতিরোধী জীবাণুর বিস্তার ঠেকাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ওয়ান হেলথ ট্রাস্ট ও আইসিডিডিআর,বি’র নেতৃত্বে প্রস্তুত করা এই নীতিপত্রে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতিকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমে ব্যাঘাত এবং কিছু অঞ্চলে টিকা নিয়ে অনাস্থা তৈরি হওয়ায় প্রতিরোধ ক্ষমতার ঘাটতি বাড়ছে। এর ফলেই সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে অন্যতম বড় হাম প্রাদুর্ভাবের মুখে পড়েছে বাংলাদেশ। চলতি বছরের মে পর্যন্ত দেশে ৫১ হাজার ৫০০-এর বেশি সন্দেহভাজন হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে এবং নিশ্চিত ও সন্দেহভাজন মিলিয়ে ৩৫০ জনের বেশি মৃত্যুর তথ্য এসেছে।
টিকা ও এএমআরের সম্পর্ক

নীতিপত্রে বলা হয়েছে, প্রতিটি প্রতিরোধযোগ্য সংক্রমণ কমাতে পারলে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের প্রয়োজনও কমে যায়। ফলে ওষুধ প্রতিরোধী জীবাণু তৈরির ঝুঁকিও হ্রাস পায়। আইসিডিডিআর,বি’র বিজ্ঞানী এবং গার্প-বাংলাদেশের চেয়ার ড. ওয়াসিফ আলী খান বলেছেন, টিকা সংক্রমণ প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর ও সাশ্রয়ী উপায়গুলোর একটি। তাঁর মতে, চলমান হাম পরিস্থিতি দেখিয়ে দিয়েছে যে টিকাদানে সামান্য ঘাটতিও বহু বছরের জনস্বাস্থ্য অর্জনকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে।
বিশ্বব্যাপী এএমআর এখন অন্যতম বড় জনস্বাস্থ্য সংকট হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। নীতিপত্রের তথ্যমতে, ২০২৫ থেকে ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে ৩ কোটি ৯০ লাখের বেশি মানুষের মৃত্যুর কারণ হতে পারে এএমআর। বাংলাদেশে ২০২১ সালে প্রায় ৯৬ হাজার ৮৭৮টি মৃত্যু এএমআরের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল, যার মধ্যে ২৩ হাজার ৪৫৪টি মৃত্যু সরাসরি এএমআরের কারণে হয়েছে।
বাংলাদেশের অগ্রগতি ও নতুন উদ্বেগ
নীতিপত্রে বাংলাদেশের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির সাফল্যের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। এই কর্মসূচির মাধ্যমে দেশে নবজাতকের ধনুষ্টঙ্কার নির্মূল, পোলিও নিয়ন্ত্রণ এবং জন্মগত রুবেলা সিনড্রোম মোকাবিলায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি এসেছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব অর্জন ধরে রাখতে হলে টিকাদান কাভারেজ আরও শক্তিশালী করতে হবে।

ওয়ান হেলথ ট্রাস্টের পার্টনারশিপ পরিচালক ড. এর্তা কালানক্সি বলেছেন, বৈশ্বিকভাবে এএমআর মোকাবিলায় নজরদারির ওপর বেশি জোর দেওয়া হলেও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাকে এখন সমান গুরুত্ব দিতে হবে। তাঁর মতে, টিকা সেই প্রতিরোধ ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান উপাদান হতে পারে।
যেসব সুপারিশ এসেছে
নীতিপত্রে শিশুদের সর্বজনীন টিকাদান নিশ্চিত করা, এএমআর প্রতিরোধে কার্যকর টিকার বিস্তার বাড়ানো এবং জাতীয় এএমআর কৌশলের সঙ্গে টিকাদান কার্যক্রমকে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করার আহ্বান জানানো হয়েছে। পাশাপাশি নিউমোকক্কাল কনজুগেট ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা নিয়মিত মূল্যায়ন, টাইফয়েড কনজুগেট ভ্যাকসিনকে দীর্ঘমেয়াদে নিয়মিত টিকাদানে অন্তর্ভুক্ত রাখা এবং দ্রুত রোটাভাইরাস টিকা চালুর সুপারিশ করা হয়েছে।
নীতিপত্রটি প্রণয়নে আইসিডিডিআর,বি, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, আইইডিসিআর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ, ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন সংস্থা ও বিশেষজ্ঞরা অংশ নেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, টিকাদানকে এএমআর মোকাবিলার কেন্দ্রীয় কৌশল হিসেবে বিবেচনা না করলে ভবিষ্যতে জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 

















