বিশ্ব অর্থনীতি বহুবার জ্বালানি সংকট দেখেছে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতির বিশেষত্ব হলো, এবার বাজার ধ্বংসের মুখে দাঁড়িয়ে থেকেও এখনও পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি। ইরান যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালির কার্যত অচলাবস্থার পরও বৈশ্বিক তেল সরবরাহব্যবস্থা এখনও টিকে আছে—এটি যেমন বিস্ময়কর, তেমনি উদ্বেগজনকও। কারণ এই স্থিতি দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার প্রমাণ নয়; বরং এটি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে বাজার এখন নিজের সঞ্চিত শক্তি খরচ করে সময় কিনছে।
বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস পরিবহনের একটি বিশাল অংশ হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরশীল। যুদ্ধ শুরুর আগে অনেকে ধারণা করেছিলেন, উত্তেজনা বাড়লেও এই পথ পুরোপুরি অচল হবে না। কারণ সেটি শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্যও বিপজ্জনক। কিন্তু কয়েক মাস পেরিয়ে যাওয়ার পর বাস্তবতা অন্য কথা বলছে। যুদ্ধ থামার লক্ষণ নেই, কূটনৈতিক উদ্যোগ ফল দিচ্ছে না, আর বাজার ধীরে ধীরে বুঝতে শুরু করেছে যে এই সংকট সাময়িক নাও হতে পারে।
এখন পর্যন্ত বিশ্ব অর্থনীতি মূলত তিনটি উপায়ে এই ধাক্কা সামাল দিয়েছে। প্রথমত, আমদানিনির্ভর দেশগুলো দ্রুত বিকল্প উৎস খুঁজেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও লাতিন আমেরিকার তেল উৎপাদকরা নতুন সুযোগ পেয়েছে। দ্বিতীয়ত, সরকার ও কোম্পানিগুলো মজুত তেল ব্যবহার শুরু করেছে। তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থাগুলো কৌশলগত রিজার্ভ উন্মুক্ত করেছে, যাতে বাজারে আতঙ্ক কম থাকে।
কিন্তু এই সমাধানগুলোর একটি মৌলিক সীমাবদ্ধতা আছে: এগুলো সময়সাপেক্ষ নয়, বরং সময় ক্ষয়কারী। অর্থাৎ এগুলো সংকট মেটায় না, শুধু বিলম্বিত করে।
এই বিলম্বের মূল্যও ইতোমধ্যে দৃশ্যমান। বিশ্বজুড়ে পরিশোধনাগার উৎপাদন কমাচ্ছে, বিমান সংস্থাগুলো ফ্লাইট সীমিত করছে, বিভিন্ন সরকার জ্বালানি সাশ্রয়মূলক ব্যবস্থা নিচ্ছে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ধীরে ধীরে সংকুচিত হচ্ছে। বাজারের ভাষায় এটিকে বলা হয় “ডিমান্ড ডেস্ট্রাকশন”—অর্থাৎ উচ্চমূল্যের চাপে মানুষ ও শিল্প কম ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছে।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বৈশ্বিক মজুতের দ্রুত পতন। তেলের বাজারে মজুত এক ধরনের নিরাপত্তা বাফার। সরবরাহে সাময়িক ধাক্কা লাগলে এই মজুত ব্যবহৃত হয়। কিন্তু এখন সেই বাফারই দ্রুত নিঃশেষ হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন পূর্বাভাস বলছে, বর্তমান পরিস্থিতি চলতে থাকলে কয়েক মাসের মধ্যেই বাণিজ্যিক মজুত ন্যূনতম কার্যকর সীমায় পৌঁছে যেতে পারে। সেই অবস্থায় বাজার শুধু ব্যয়বহুল হবে না; বরং সরবরাহ ব্যবস্থাই অকার্যকর হয়ে পড়তে পারে।

তবে ইতিহাস বলছে, বাজার সাধারণত একেবারে শেষ সীমায় পৌঁছানোর আগেই নিজেকে মানিয়ে নেয়। মূল্যবৃদ্ধি নিজেই একটি নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা হিসেবে কাজ করে। দাম যত বাড়ে, ব্যবহার তত কমে। এতে চাপ কিছুটা কমে আসে। ইতোমধ্যে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কিন্তু সংকটের গভীরতা বিবেচনায় নিলে বাজার এখনও পুরো আতঙ্কে যায়নি।
এর আরেকটি কারণ চীন। বিশ্বের সবচেয়ে বড় কৌশলগত তেল মজুতের একটি রয়েছে বেইজিংয়ের হাতে। চীন চাইলে নিজস্ব রিজার্ভ ব্যবহার করে আমদানি কমাতে পারে, যা বৈশ্বিক বাজারে কিছুটা স্বস্তি দেবে। কিন্তু সেটিও সীমাহীন সমাধান নয়। কারণ কোনো দেশই দীর্ঘ সময় ধরে নিজস্ব কৌশলগত মজুত খালি করতে চায় না।
এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা হলো সময়। যদি দ্রুত কূটনৈতিক সমাধান আসে এবং হরমুজে স্বাভাবিক চলাচল ফিরে আসে, তাহলে বাজার হয়তো বড় ধাক্কা এড়াতে পারবে। কিন্তু প্রতিটি অতিরিক্ত দিন পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক করে তুলছে। কারণ বাজারের প্রতিটি স্তম্ভ—মজুত, বিকল্প সরবরাহ, চাহিদা হ্রাস, সরকারি সহায়তা—একসঙ্গে চাপ বহন করছে।
এটি শুধু তেলের বাজারের গল্প নয়। এটি আধুনিক বৈশ্বিক অর্থনীতির ভঙ্গুরতার গল্প। বিশ্বায়নের যুগে সরবরাহব্যবস্থা এমনভাবে গড়ে উঠেছে যে একটি সংকীর্ণ সামুদ্রিক পথও পুরো অর্থনৈতিক কাঠামোকে জিম্মি করতে পারে। গত কয়েক দশকে দক্ষতা বাড়াতে গিয়ে বিশ্ব অর্থনীতি স্থিতিস্থাপকতার অনেক অংশ হারিয়েছে। ফলে সংকট দেখা দিলে বিকল্প পথ সীমিত হয়ে যায়।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই সংকট এখনও পূর্ণমাত্রায় বিস্ফোরিত হয়নি। বাজার এখনও “মাডলিং থ্রু”—অর্থাৎ কষ্টেসৃষ্টে টিকে থাকার পর্যায়ে আছে। কিন্তু সেই সক্ষমতা দ্রুত ক্ষয় হচ্ছে। যদি পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে সামনে শুধু উচ্চ তেলের দাম নয়, বরং শিল্প উৎপাদন কমে যাওয়া, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি তীব্র হওয়া এবং বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি ধাক্কা খাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
সংকটের প্রকৃত বিপদ তাই বর্তমান নয়; বরং সেই মুহূর্ত, যখন বাজার বুঝতে পারবে তার হাতে আর কোনো অতিরিক্ত সুরক্ষা নেই। আর সেই মুহূর্ত যতই দূরের মনে হোক, বাস্তবে তা প্রতিদিন একটু একটু করে কাছে চলে আসছে।
রন বুসো 



















