০৯:০৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬
তামিলনাড়ু মন্ত্রিসভায় ঐতিহাসিক সম্প্রসারণ, বিজয়ের দলে ২১ ও কংগ্রেসের ২ বিধায়ক শপথ জাপানে কঠোর ভিসা নীতিতে বিপাকে বিদেশি ব্যবসায়ীরা বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব নিম্নআয়ের মানুষের পকেট কাটার শামিল: রুহিন প্রিন্স চট্টগ্রামে পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৩, প্রাণ গেল মাদ্রাসাছাত্রের বজ্রপাতে নওগাঁ, বরিশাল ও নাটোরে ৬ জনের মৃত্যু বিদ্যুতের দাম বাড়ালে বাড়বে মূল্যস্ফীতি, বিইআরসিকে সতর্ক করল ক্যাব বাজারে অনিয়মে কঠোর বিএসইসি, তিন কোম্পানিকে ২ কোটি ৮৩ লাখ টাকা জরিমানা নারায়ণগঞ্জে বিএনপি নেতা ওসমান গনি খুন, আটক ৪ ডুয়েটে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’-এর মধ্যেই দায়িত্ব নিলেন নতুন ভিসি নরওয়েতে মোদিকে প্রশ্ন করে ভাইরাল সাংবাদিক, বাকস্বাধীনতা নিয়ে নতুন বিতর্ক

১২ তম লং কোর্সের পাসিং আউট প্যারেড-স্মৃতির ভেলায় যাই ভেসে…

চট্টগ্রাম মহানগরীর উত্তরে অবস্থিত ভাটিয়ারী এক অপরূপ সৌন্দর্য্যের রাজকন্যা। অন্যদিকে, বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের বিপ্লবী ও মহান মুক্তিযুদ্ধের অসমসাহসী যোদ্ধাদের স্মৃতিধন্য অনেকগুলো যুদ্ধক্ষেত্রের মধ্যে ভাটিয়ারী অবস্থিত। এর পূর্বে অরণ্য ছোঁয়া সীতাকুণ্ড পাহাড়মালার সারি আর পশ্চিমে বঙ্গোপসাগরের জলের অনুপম হাতছানি। এর মাঝেই বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অত্যন্ত মর্যাদাবান একটি প্রতিষ্ঠান, বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমি (বিএমএ) অবস্থিত।
বিএমএ বা যে কোন মিলিটারি একাডেমির ক্যাডেটদের কাছে প্রার্থিত ও অত্যান্ত গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান হলো শিক্ষা সমাপনী কুচকাওয়াজ বা পাসিং আউট প্যারেড। এই প্যারেড বিভিন্ন সামরিক ঐতিহ্য, ড্রিল ও জাতীয় সংস্কৃতির প্রতিফলন ঘটে থাকে। এই প্যারেডকে প্রেসিডেন্ট প্যারেডও বলা হয়।
ভাটিয়ারিতে এক ঝাঁক তরুন
আমার কোর্স ১২তম দীর্ঘ মেয়াদী কোর্স (লং কোর্স)। ১৯৮৫ সালে ১৮ মে অনুষ্ঠিত পাসিং আউট প্যারেডের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছিল আমাদের সামরিক জীবন। উল্লেখ্য, ১৯৮৩ সালের ২৭জুলাই ১২তম লং কোর্সের জন্য নির্বাচিত এক ঝাঁক তরুণ (জেন্টলম্যান ক্যাডেট) বিএমএ যোগদান করে। আমরা সবাই তখন দুঃসাহসিক নেতৃত্বের চ্যালেঞ্জ গ্রহণকারী তরুণ। আমাদের সঙ্গে প্রথমবারের মতো নৌ ও বিমান বাহিনীর ক্যাডেটবৃন্দ যৌথ প্রশিক্ষণে (প্রাথমিক সামরিক প্রশিক্ষণ) অংশগ্রহণ করেছিল। তিন বাহিনীর ক্যাডেট সংখ্যা ছিল ১৫৬ জন।
চন্দ্রনাথ পাহাড়, সীতাকুণ্ড, চট্টগ্রাম » আদার ব্যাপারী
একটি পাসিং আউট প্যারেড
দুই বছর কঠোর প্রশিক্ষণের পর ১২৪ জন তরুণ সেনাবাহিনীতে সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট হিসেবে কমিশন লাভ করে। ১৯ মে আমাদের কমিশন লাভের দিবস (পাসিং আউটের একদিন পর)। সামরিক অফিসারদের স্মৃতিতে মিলিটারি একাডেমির প্রথম দিন (যোগদানের দিন) ও শেষ দিন (পাসিং আউট প্যারেড) চির সবুজ, চির উজ্জল। অনেকটা প্রথম ভালোবাসার মতো।
আমাদের দ্রোণাচার্যগন
আমাদের সময় কমান্ড্যান্ট ছিলেন ব্রিগেডিয়ার সৈয়দ বদরুজ্জামান (পরবর্তীতে মেজর জেনারেল) বেসামরিক তরুণদের যথাযথ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে গড়ে পিঠে, সেনা অফিসার রূপান্তরের প্রধান ভূমিকায় ছিলেন আমাদের প্রশিক্ষকগণ। এরাই ছিলেন আমাদের দ্রোণাচার্য। টার্ম কমান্ডার ও প্লাটুন কমান্ডারগণ ছিলেন আমাদের চোখে সেনা অফিসারের মূর্ত প্রতীক-রোল মডেল।
একই সঙ্গে একাডেমিক ট্রাম কমান্ডার ও এক ঝাঁক নিবেদিতপ্রাণ একাডেমিক প্লাটুন কমান্ডারগণ একাডেমিক শিক্ষায় আমাদের আলোকিত করেন। বেশ কঠিন একটি পরিবেশে আমাদের মননকেও শাণিত করেছেন।
The President Parade of 84 BMA Long Course
ডেট লাইন ১৮মে ১৯৮৫
ডেট লাইন ১৮মে ১৯৮৫। বাংলাদেশে তখন পুষ্প উৎসবের গ্রীষ্মকাল। প্রবল এক উত্তেজনায় ভরা ছিল জ্যৈষ্ঠের সেই উজ্জ্বল দিন। সীতাকুণ্ড পাহাড় শ্রেণির উপর সূর্য ততক্ষণে তাপ ছড়াচ্ছে। পাসিং আউট প্যারেডের জন্য বিএমএ কে সাজানো হয়েছে নববধূর সাজে। কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া, সোনালু ও জারুলের রঙিন উচ্ছ্বাসে বর্ণিল হয়ে উঠেছে ভাটিয়ারীর নিসর্গ।
দুই বছরের অকল্পনীয় পরিশ্রম ও কঠোর প্রশিক্ষণের পর কমিশন প্রাপ্তি ছিল প্রশিক্ষণরত তরুণ ক্যাডেটদের জন্য জীবনের শ্রেষ্ঠ এক স্বপ্নের বাস্তবায়ন। সকাল সাতটা পঁয়ত্রিশ মিনিটে ট্রাম্পেটের ধ্বনির মাধ্যমে ক্যাডেটদের মাঠে প্রবেশের আগাম বার্তা জানানো হলো। দীপ্ত ভঙ্গিতে ও বিশেষ স্টাইলে মার্চ করে গ্রাউন্ডে প্রবেশ করলের রিসালদার এডজুটেন্ট (পরে অনারারী ক্যাপটেন) মুহাম্মদ মুজিবুর রহমান। বিএমএ’র ক্যাডেটদের সামরিক বেয়ারিং (চাল চলন) ড্রিল ও প্যারেডের ক্ষেত্রে তার অতি মানবিক দক্ষতা তখন প্রায় কিংবদন্তি।
ঘোড়ায় চড়ে এলেন প্যারেড অ্যাডজুটেন্ট
এরপর শুরু হলো প্যারেডের ঐতিহ্যবাহী ধারাবাহিক কার্যক্রম। দক্ষিণ দিক থেকে মার্চ করে আমরা (ক্যাডেটগন) প্যারেড গ্রাউন্ডে প্রবেশ করলাম। এ সময় ব্যান্ডে ‘চির উন্নত মম শির সুর বাজতে থাকে।
রাজপুত্রের মতো ঘোড়ায় চড়ে প্যারেড গ্রাউন্ডে এলেন প্যারেড অ্যাডজুটেন্ট মেজর সিনা ইবনে জামালী (পরবর্তীতে লেঃ জেনারেল)। সকাল আটটা বাজার পাঁচ মিনিট আগে প্যারেড প্রস্তুত হয়ে ক্যাডেটগণ অপেক্ষা করতে থাকে প্রধান অতিথির আগমনের জন্য। আমরা সকলে খাকি সামরিক পোষাকে শোভিত। মাথায় বিএমএ’র মনোগ্রাম খচিত সবুজ টুপিতে লাল পালক, হাতে রাইফেল।
50th Raising Day of Bangladesh Military Academy
এক জন মুক্তিযোদ্ধার প্যারেড রিভিউ
আমাদের পাসিং আউট প্যারেড রিভিউ করেছিলেন তৎকালীন বিমান বাহিনী প্রধান বীর মুক্তিযোদ্ধা এয়ার ভাইস মার্শাল সুলতান মাহমুদ, বীর উত্তম। একাত্তরের নায়কোচিত দুঃসাহসিক এই বিমান সেনার উপস্থিতি এই অনুষ্ঠানকে আরো আকর্ষণীয় ও স্মরনীয় করে তোলে। প্রধান অতিথির মোটর যান থেকে অভিবাদন মঞ্চে অবস্থান নেয়ার সাথে সাথে প্যারেড কমান্ডারের আদেশ ক্যাডেটগণ এয়ার ভাইস মার্শাল সুলতান মাহমুদকে সশস্ত্র সালাম জানান। এ সময় ব্যান্ডে জাতীয় সঙ্গীতের সুর বাজানো হয়। এরপর পর্যায়ক্রমিক চলতে থাকে প্যারেড পরিদর্শন, বিএমএ কালার প্রদান অনুষ্ঠান ও ধীর গতিতে কুচকাওয়াজ। এই সময়ে ব্যান্ডে ধনধান্যে পুষ্পে ভরা গানের সুর বাজতে থাকে।
অনুষ্ঠানের শেষ পর্বেঃ শপথ অনুষ্ঠান, পুরস্কার প্রদান ও প্রধান অতিথির ভাষণ। সেই দিন প্যারেড গ্রাউন্ডে আমরা শপথ নিয়েছিলাম- প্রাণপ্রিয় বাংলাদেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করতেও আমরা প্রস্তুত থাকবো। আমাদের কোর্সে শ্রেষ্ঠ ক্যাডেট হিসেবে ‘সোর্ড অব অনার’ পেয়েছিলেন ব্যাটালিয়ন সিনিয়র আন্ডার অফিসার মোঃ সিদ্দিকুল আলম শিকদার (পরবর্তীতে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল)। ভাষণ ও আনন্দ ধ্বনি শেষে প্যারেড অধিনায়ক অনুষ্ঠান সমাপ্তির জন্য প্রধান অতিথির অনুমতি গ্রহণ করেন।
পোডিয়ামের সিড়ি পেরিয়ে প্রার্থিত যে রুপান্তর…
আমরা ধীর গতিতে মার্চ করে প্রধান অতিথিকে অভিবাদন জানিয়ে সকাল প্রায় সোয়া নয়টায় পোডিয়ামের দিকে এগিয়ে যাই। আমরা যখন পোডিয়াম অতিক্রম করছিলাম, তখন অর্কেষ্ট্রায় বেজে ওঠে স্কটিশ কবি রবার্ট বার্নসএর রচিত গান ‘অ্যন্ড ল্যাং সাইন’। সে সুর মনে করিয়ে দেয় বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘পুরনো সেই দিনের কথা, গানটির কথা। মূল গানটির ভাবার্থ একই। পোডিয়ামের সিঁড়ি বেয়ে পূর্বদিকে নেমেই (ক্যাডেট থেকে) সেনা অফিসার পদে উন্নতি। কি শিহরণময় জাগানো সেই আনন্দ। প্রশিক্ষণের ভয়ংকর কঠোরতা আমাদের সকলের আনন্দের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছিল। আনন্দের অতিসয্যে হাতের তরবারী উর্ধ্বে ছুড়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছিল কেউ কেউ।
চির উন্নত মম শির
বার বার ফিরে যাই বিএমএ, ভাটিয়ারীতে। অযুত স্মৃতির খোঁজে অনাবিল ভ্রমনে। একদা যেখানে ছিল আমাদের প্রিয়তম স্বপ্নের জন্মভূমি।
ভাটিয়ারির সবুজ পাহাড়ে খোচিত বিএমএ’র মটো/আদর্শ- এখনও পথ দেখায়। সব সময় পথ দেখাবে।
লেখক: অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, গবেষক ও বিশ্লেষক
জনপ্রিয় সংবাদ

তামিলনাড়ু মন্ত্রিসভায় ঐতিহাসিক সম্প্রসারণ, বিজয়ের দলে ২১ ও কংগ্রেসের ২ বিধায়ক শপথ

১২ তম লং কোর্সের পাসিং আউট প্যারেড-স্মৃতির ভেলায় যাই ভেসে…

০৮:০৯:৩২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬
চট্টগ্রাম মহানগরীর উত্তরে অবস্থিত ভাটিয়ারী এক অপরূপ সৌন্দর্য্যের রাজকন্যা। অন্যদিকে, বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের বিপ্লবী ও মহান মুক্তিযুদ্ধের অসমসাহসী যোদ্ধাদের স্মৃতিধন্য অনেকগুলো যুদ্ধক্ষেত্রের মধ্যে ভাটিয়ারী অবস্থিত। এর পূর্বে অরণ্য ছোঁয়া সীতাকুণ্ড পাহাড়মালার সারি আর পশ্চিমে বঙ্গোপসাগরের জলের অনুপম হাতছানি। এর মাঝেই বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অত্যন্ত মর্যাদাবান একটি প্রতিষ্ঠান, বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমি (বিএমএ) অবস্থিত।
বিএমএ বা যে কোন মিলিটারি একাডেমির ক্যাডেটদের কাছে প্রার্থিত ও অত্যান্ত গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান হলো শিক্ষা সমাপনী কুচকাওয়াজ বা পাসিং আউট প্যারেড। এই প্যারেড বিভিন্ন সামরিক ঐতিহ্য, ড্রিল ও জাতীয় সংস্কৃতির প্রতিফলন ঘটে থাকে। এই প্যারেডকে প্রেসিডেন্ট প্যারেডও বলা হয়।
ভাটিয়ারিতে এক ঝাঁক তরুন
আমার কোর্স ১২তম দীর্ঘ মেয়াদী কোর্স (লং কোর্স)। ১৯৮৫ সালে ১৮ মে অনুষ্ঠিত পাসিং আউট প্যারেডের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছিল আমাদের সামরিক জীবন। উল্লেখ্য, ১৯৮৩ সালের ২৭জুলাই ১২তম লং কোর্সের জন্য নির্বাচিত এক ঝাঁক তরুণ (জেন্টলম্যান ক্যাডেট) বিএমএ যোগদান করে। আমরা সবাই তখন দুঃসাহসিক নেতৃত্বের চ্যালেঞ্জ গ্রহণকারী তরুণ। আমাদের সঙ্গে প্রথমবারের মতো নৌ ও বিমান বাহিনীর ক্যাডেটবৃন্দ যৌথ প্রশিক্ষণে (প্রাথমিক সামরিক প্রশিক্ষণ) অংশগ্রহণ করেছিল। তিন বাহিনীর ক্যাডেট সংখ্যা ছিল ১৫৬ জন।
চন্দ্রনাথ পাহাড়, সীতাকুণ্ড, চট্টগ্রাম » আদার ব্যাপারী
একটি পাসিং আউট প্যারেড
দুই বছর কঠোর প্রশিক্ষণের পর ১২৪ জন তরুণ সেনাবাহিনীতে সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট হিসেবে কমিশন লাভ করে। ১৯ মে আমাদের কমিশন লাভের দিবস (পাসিং আউটের একদিন পর)। সামরিক অফিসারদের স্মৃতিতে মিলিটারি একাডেমির প্রথম দিন (যোগদানের দিন) ও শেষ দিন (পাসিং আউট প্যারেড) চির সবুজ, চির উজ্জল। অনেকটা প্রথম ভালোবাসার মতো।
আমাদের দ্রোণাচার্যগন
আমাদের সময় কমান্ড্যান্ট ছিলেন ব্রিগেডিয়ার সৈয়দ বদরুজ্জামান (পরবর্তীতে মেজর জেনারেল) বেসামরিক তরুণদের যথাযথ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে গড়ে পিঠে, সেনা অফিসার রূপান্তরের প্রধান ভূমিকায় ছিলেন আমাদের প্রশিক্ষকগণ। এরাই ছিলেন আমাদের দ্রোণাচার্য। টার্ম কমান্ডার ও প্লাটুন কমান্ডারগণ ছিলেন আমাদের চোখে সেনা অফিসারের মূর্ত প্রতীক-রোল মডেল।
একই সঙ্গে একাডেমিক ট্রাম কমান্ডার ও এক ঝাঁক নিবেদিতপ্রাণ একাডেমিক প্লাটুন কমান্ডারগণ একাডেমিক শিক্ষায় আমাদের আলোকিত করেন। বেশ কঠিন একটি পরিবেশে আমাদের মননকেও শাণিত করেছেন।
The President Parade of 84 BMA Long Course
ডেট লাইন ১৮মে ১৯৮৫
ডেট লাইন ১৮মে ১৯৮৫। বাংলাদেশে তখন পুষ্প উৎসবের গ্রীষ্মকাল। প্রবল এক উত্তেজনায় ভরা ছিল জ্যৈষ্ঠের সেই উজ্জ্বল দিন। সীতাকুণ্ড পাহাড় শ্রেণির উপর সূর্য ততক্ষণে তাপ ছড়াচ্ছে। পাসিং আউট প্যারেডের জন্য বিএমএ কে সাজানো হয়েছে নববধূর সাজে। কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া, সোনালু ও জারুলের রঙিন উচ্ছ্বাসে বর্ণিল হয়ে উঠেছে ভাটিয়ারীর নিসর্গ।
দুই বছরের অকল্পনীয় পরিশ্রম ও কঠোর প্রশিক্ষণের পর কমিশন প্রাপ্তি ছিল প্রশিক্ষণরত তরুণ ক্যাডেটদের জন্য জীবনের শ্রেষ্ঠ এক স্বপ্নের বাস্তবায়ন। সকাল সাতটা পঁয়ত্রিশ মিনিটে ট্রাম্পেটের ধ্বনির মাধ্যমে ক্যাডেটদের মাঠে প্রবেশের আগাম বার্তা জানানো হলো। দীপ্ত ভঙ্গিতে ও বিশেষ স্টাইলে মার্চ করে গ্রাউন্ডে প্রবেশ করলের রিসালদার এডজুটেন্ট (পরে অনারারী ক্যাপটেন) মুহাম্মদ মুজিবুর রহমান। বিএমএ’র ক্যাডেটদের সামরিক বেয়ারিং (চাল চলন) ড্রিল ও প্যারেডের ক্ষেত্রে তার অতি মানবিক দক্ষতা তখন প্রায় কিংবদন্তি।
ঘোড়ায় চড়ে এলেন প্যারেড অ্যাডজুটেন্ট
এরপর শুরু হলো প্যারেডের ঐতিহ্যবাহী ধারাবাহিক কার্যক্রম। দক্ষিণ দিক থেকে মার্চ করে আমরা (ক্যাডেটগন) প্যারেড গ্রাউন্ডে প্রবেশ করলাম। এ সময় ব্যান্ডে ‘চির উন্নত মম শির সুর বাজতে থাকে।
রাজপুত্রের মতো ঘোড়ায় চড়ে প্যারেড গ্রাউন্ডে এলেন প্যারেড অ্যাডজুটেন্ট মেজর সিনা ইবনে জামালী (পরবর্তীতে লেঃ জেনারেল)। সকাল আটটা বাজার পাঁচ মিনিট আগে প্যারেড প্রস্তুত হয়ে ক্যাডেটগণ অপেক্ষা করতে থাকে প্রধান অতিথির আগমনের জন্য। আমরা সকলে খাকি সামরিক পোষাকে শোভিত। মাথায় বিএমএ’র মনোগ্রাম খচিত সবুজ টুপিতে লাল পালক, হাতে রাইফেল।
50th Raising Day of Bangladesh Military Academy
এক জন মুক্তিযোদ্ধার প্যারেড রিভিউ
আমাদের পাসিং আউট প্যারেড রিভিউ করেছিলেন তৎকালীন বিমান বাহিনী প্রধান বীর মুক্তিযোদ্ধা এয়ার ভাইস মার্শাল সুলতান মাহমুদ, বীর উত্তম। একাত্তরের নায়কোচিত দুঃসাহসিক এই বিমান সেনার উপস্থিতি এই অনুষ্ঠানকে আরো আকর্ষণীয় ও স্মরনীয় করে তোলে। প্রধান অতিথির মোটর যান থেকে অভিবাদন মঞ্চে অবস্থান নেয়ার সাথে সাথে প্যারেড কমান্ডারের আদেশ ক্যাডেটগণ এয়ার ভাইস মার্শাল সুলতান মাহমুদকে সশস্ত্র সালাম জানান। এ সময় ব্যান্ডে জাতীয় সঙ্গীতের সুর বাজানো হয়। এরপর পর্যায়ক্রমিক চলতে থাকে প্যারেড পরিদর্শন, বিএমএ কালার প্রদান অনুষ্ঠান ও ধীর গতিতে কুচকাওয়াজ। এই সময়ে ব্যান্ডে ধনধান্যে পুষ্পে ভরা গানের সুর বাজতে থাকে।
অনুষ্ঠানের শেষ পর্বেঃ শপথ অনুষ্ঠান, পুরস্কার প্রদান ও প্রধান অতিথির ভাষণ। সেই দিন প্যারেড গ্রাউন্ডে আমরা শপথ নিয়েছিলাম- প্রাণপ্রিয় বাংলাদেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করতেও আমরা প্রস্তুত থাকবো। আমাদের কোর্সে শ্রেষ্ঠ ক্যাডেট হিসেবে ‘সোর্ড অব অনার’ পেয়েছিলেন ব্যাটালিয়ন সিনিয়র আন্ডার অফিসার মোঃ সিদ্দিকুল আলম শিকদার (পরবর্তীতে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল)। ভাষণ ও আনন্দ ধ্বনি শেষে প্যারেড অধিনায়ক অনুষ্ঠান সমাপ্তির জন্য প্রধান অতিথির অনুমতি গ্রহণ করেন।
পোডিয়ামের সিড়ি পেরিয়ে প্রার্থিত যে রুপান্তর…
আমরা ধীর গতিতে মার্চ করে প্রধান অতিথিকে অভিবাদন জানিয়ে সকাল প্রায় সোয়া নয়টায় পোডিয়ামের দিকে এগিয়ে যাই। আমরা যখন পোডিয়াম অতিক্রম করছিলাম, তখন অর্কেষ্ট্রায় বেজে ওঠে স্কটিশ কবি রবার্ট বার্নসএর রচিত গান ‘অ্যন্ড ল্যাং সাইন’। সে সুর মনে করিয়ে দেয় বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘পুরনো সেই দিনের কথা, গানটির কথা। মূল গানটির ভাবার্থ একই। পোডিয়ামের সিঁড়ি বেয়ে পূর্বদিকে নেমেই (ক্যাডেট থেকে) সেনা অফিসার পদে উন্নতি। কি শিহরণময় জাগানো সেই আনন্দ। প্রশিক্ষণের ভয়ংকর কঠোরতা আমাদের সকলের আনন্দের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছিল। আনন্দের অতিসয্যে হাতের তরবারী উর্ধ্বে ছুড়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছিল কেউ কেউ।
চির উন্নত মম শির
বার বার ফিরে যাই বিএমএ, ভাটিয়ারীতে। অযুত স্মৃতির খোঁজে অনাবিল ভ্রমনে। একদা যেখানে ছিল আমাদের প্রিয়তম স্বপ্নের জন্মভূমি।
ভাটিয়ারির সবুজ পাহাড়ে খোচিত বিএমএ’র মটো/আদর্শ- এখনও পথ দেখায়। সব সময় পথ দেখাবে।
লেখক: অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, গবেষক ও বিশ্লেষক