০৫:১৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬
চীনের কূটনৈতিক ভাষা: নীতির চেয়েও শক্তিশালী অস্ত্র কয়লা, পাম অয়েল ও ফেরোঅ্যালয় রপ্তানিতে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ: ইন্দোনেশিয়া কি নতুন একচেটিয়া শক্তির পথে? খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অগ্নিকাণ্ড — আইসিইউর রোগীর মৃত্যু, তিন নার্স লাফ দিলেন তৃতীয় তলা থেকে ঢাকায় প্রতিবেশীর হাতে খুন হলো দ্বিতীয় শ্রেণির মেধাবী ছাত্রী রামিসা — আসামি গ্রেপ্তার টিকার ঘাটতিতে বাড়তে পারে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সের ঝুঁকি: নতুন নীতিপত্রে সতর্কবার্তা পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলের হারে ধাক্কা আঞ্চলিক শক্তিতে কারখানায়, ঘরে বিদ্যুৎ বিভ্রাট, গরমে কাতর পোশাক শ্রমিকরা আকাশ কি সবসময়ই নীল থাকবে? মোদীকে প্রশ্ন করে আলোচনায় আসা নরওয়ের সাংবাদিক বিবিসিকে যা বললেন ‘আবার যদি গোলাগুলি শুরু হয়, ভয়ে কেউ সীমান্তের কাছে খেত-খামারেও যাচ্ছে না’

খাদ্যের দাম বেঁধে দিলে কি মূল্যস্ফীতি থামবে?

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, জ্বালানির দামের ঊর্ধ্বগতি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ার চাপে ব্রিটিশ সরকার এখন এমন একটি ধারণা নিয়ে আলোচনা করছে, যা শুনতে জনবান্ধব হলেও অর্থনীতির বাস্তবতায় গভীর বিতর্ক তৈরি করেছে। সুপারমার্কেটগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে ডিম, দুধ, পাউরুটির মতো কিছু নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের দাম স্থির রাখার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। লক্ষ্য একটাই—সাধারণ মানুষের ওপর মূল্যস্ফীতির চাপ কমানো।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, বাজারে মূল্যবৃদ্ধি কি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত দিয়ে থামানো সম্ভব?

দামের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের ধারণা নতুন নয়। ইতিহাসে বহু সরকার সংকটকালে এই পথ বেছে নিয়েছে। কারণ রাজনৈতিকভাবে এটি সহজে গ্রহণযোগ্য। মানুষ যখন প্রতিদিন বাজারে বাড়তি দাম দেখছে, তখন সরকার যদি বলে “কিছু পণ্যের দাম আর বাড়বে না”, সেটি স্বাভাবিকভাবেই স্বস্তির বার্তা দেয়। কিন্তু অর্থনীতি কেবল রাজনৈতিক বার্তায় চলে না; এর নিজস্ব নিয়ম রয়েছে।

সমস্যা হচ্ছে, খাদ্যের দাম কেবল সুপারমার্কেটের ইচ্ছায় বাড়ে না। এর পেছনে জ্বালানি ব্যয়, পরিবহন খরচ, কৃষি উৎপাদনের চাপ, আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থার অস্থিরতা—সবকিছু জড়িত। যখন উৎপাদন খরচ বাড়ছে, তখন কৃত্রিমভাবে বিক্রয়মূল্য আটকে দিলে ব্যবসার ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে। সেই চাপ শেষ পর্যন্ত কোথাও না কোথাও গিয়ে পড়ে—কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ বা পণ্যের গুণগত মানে।

May be an image of fruit

ব্রিটেনের খুচরা বিক্রেতারা ইতিমধ্যেই বলছেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় অনেক পণ্যে তাদের লাভের পরিমাণ অত্যন্ত কম। কোথাও কোথাও লোকসানও হচ্ছে। অর্থাৎ বাজারে প্রতিযোগিতা এমনিতেই দামের লাগাম টেনে রাখছে। এর মধ্যে যদি সরকার মূল্যসীমা নির্ধারণের দিকে যায়, তাহলে ব্যবসাগুলোর জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

অর্থনীতির আরেকটি বাস্তবতা হলো, মূল্য কেবল অর্থ আদায়ের মাধ্যম নয়; এটি সংকেতও। বাজারে কোনো পণ্যের দাম বাড়া মানে সেখানে ব্যয় বেড়েছে বা সরবরাহে চাপ তৈরি হয়েছে। সরকার যদি সেই সংকেতকে কৃত্রিমভাবে বদলে দেয়, তাহলে বাস্তব সমস্যাটি আড়াল হয়, সমাধান হয় না।

এই কারণেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর থেকে শুরু করে খুচরা বাজারের বড় ব্যবসায়ীরা সতর্কবার্তা দিচ্ছেন। তাদের যুক্তি, স্বল্পমেয়াদে কিছু রাজনৈতিক সুবিধা মিললেও দীর্ঘমেয়াদে এটি টেকসই নয়। ব্যবসা যদি বুঝতে পারে তাদের মূল্য নির্ধারণের স্বাধীনতা কমছে, তাহলে তারা বিনিয়োগে আগ্রহ হারাবে। নতুন কর্মসংস্থান কমবে। বাজারে ঘাটতি তৈরি হওয়ার ঝুঁকিও বাড়বে।

আরও বড় প্রশ্ন হলো, বর্তমান মূল্যস্ফীতির জন্য আসলে কে দায়ী? ব্যবসায়ীরা বলছেন, সরকারের নীতিও এর একটি কারণ। ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি, কর বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন অতিরিক্ত ব্যয় ব্যবসার পরিচালন খরচ বাড়িয়ে দিয়েছে। অর্থাৎ সরকার একদিকে ব্যয় বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে সেই বাড়তি ব্যয়ের প্রভাব মূল্যনিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ঠেকাতে চাইছে। এই দ্বৈত অবস্থান স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি করে।

Inflation continues to ease, but rice prices remain a major concern:  Planning Commission | The Business Standard

অবশ্য সরকার যে রাজনৈতিক চাপে আছে, সেটিও অস্বীকার করার উপায় নেই। জ্বালানি বিল বাড়ছে, খাদ্যের দাম বাড়ছে, আর সাধারণ মানুষের আয় সেই হারে বাড়ছে না। ফলে সরকারকে কিছু একটা করতেই হবে। কিন্তু “দাম বেঁধে দেওয়া” হয়তো সবচেয়ে কার্যকর পথ নয়।

বরং লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা—যেমন নিম্নআয়ের পরিবারকে সরাসরি ভর্তুকি, জ্বালানি সহায়তা বা কর ছাড়—অনেক বেশি বাস্তবসম্মত হতে পারে। এতে বাজারের স্বাভাবিক কার্যক্রমও বজায় থাকে, আবার মানুষের চাপও কিছুটা কমে।

অর্থনীতির কঠিন সত্য হলো, জনপ্রিয় সমাধান সব সময় কার্যকর সমাধান নয়। মূল্যস্ফীতির মতো জটিল সংকটকে প্রশাসনিক নির্দেশ দিয়ে সাময়িকভাবে আড়াল করা যায়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে বাজার তার নিজের নিয়মেই প্রতিক্রিয়া দেখায়। আর সেই প্রতিক্রিয়ার মূল্য শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষকেই দিতে হয়।

জনপ্রিয় সংবাদ

চীনের কূটনৈতিক ভাষা: নীতির চেয়েও শক্তিশালী অস্ত্র

খাদ্যের দাম বেঁধে দিলে কি মূল্যস্ফীতি থামবে?

০৩:২৭:২৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, জ্বালানির দামের ঊর্ধ্বগতি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ার চাপে ব্রিটিশ সরকার এখন এমন একটি ধারণা নিয়ে আলোচনা করছে, যা শুনতে জনবান্ধব হলেও অর্থনীতির বাস্তবতায় গভীর বিতর্ক তৈরি করেছে। সুপারমার্কেটগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে ডিম, দুধ, পাউরুটির মতো কিছু নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের দাম স্থির রাখার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। লক্ষ্য একটাই—সাধারণ মানুষের ওপর মূল্যস্ফীতির চাপ কমানো।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, বাজারে মূল্যবৃদ্ধি কি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত দিয়ে থামানো সম্ভব?

দামের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের ধারণা নতুন নয়। ইতিহাসে বহু সরকার সংকটকালে এই পথ বেছে নিয়েছে। কারণ রাজনৈতিকভাবে এটি সহজে গ্রহণযোগ্য। মানুষ যখন প্রতিদিন বাজারে বাড়তি দাম দেখছে, তখন সরকার যদি বলে “কিছু পণ্যের দাম আর বাড়বে না”, সেটি স্বাভাবিকভাবেই স্বস্তির বার্তা দেয়। কিন্তু অর্থনীতি কেবল রাজনৈতিক বার্তায় চলে না; এর নিজস্ব নিয়ম রয়েছে।

সমস্যা হচ্ছে, খাদ্যের দাম কেবল সুপারমার্কেটের ইচ্ছায় বাড়ে না। এর পেছনে জ্বালানি ব্যয়, পরিবহন খরচ, কৃষি উৎপাদনের চাপ, আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থার অস্থিরতা—সবকিছু জড়িত। যখন উৎপাদন খরচ বাড়ছে, তখন কৃত্রিমভাবে বিক্রয়মূল্য আটকে দিলে ব্যবসার ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে। সেই চাপ শেষ পর্যন্ত কোথাও না কোথাও গিয়ে পড়ে—কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ বা পণ্যের গুণগত মানে।

May be an image of fruit

ব্রিটেনের খুচরা বিক্রেতারা ইতিমধ্যেই বলছেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় অনেক পণ্যে তাদের লাভের পরিমাণ অত্যন্ত কম। কোথাও কোথাও লোকসানও হচ্ছে। অর্থাৎ বাজারে প্রতিযোগিতা এমনিতেই দামের লাগাম টেনে রাখছে। এর মধ্যে যদি সরকার মূল্যসীমা নির্ধারণের দিকে যায়, তাহলে ব্যবসাগুলোর জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

অর্থনীতির আরেকটি বাস্তবতা হলো, মূল্য কেবল অর্থ আদায়ের মাধ্যম নয়; এটি সংকেতও। বাজারে কোনো পণ্যের দাম বাড়া মানে সেখানে ব্যয় বেড়েছে বা সরবরাহে চাপ তৈরি হয়েছে। সরকার যদি সেই সংকেতকে কৃত্রিমভাবে বদলে দেয়, তাহলে বাস্তব সমস্যাটি আড়াল হয়, সমাধান হয় না।

এই কারণেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর থেকে শুরু করে খুচরা বাজারের বড় ব্যবসায়ীরা সতর্কবার্তা দিচ্ছেন। তাদের যুক্তি, স্বল্পমেয়াদে কিছু রাজনৈতিক সুবিধা মিললেও দীর্ঘমেয়াদে এটি টেকসই নয়। ব্যবসা যদি বুঝতে পারে তাদের মূল্য নির্ধারণের স্বাধীনতা কমছে, তাহলে তারা বিনিয়োগে আগ্রহ হারাবে। নতুন কর্মসংস্থান কমবে। বাজারে ঘাটতি তৈরি হওয়ার ঝুঁকিও বাড়বে।

আরও বড় প্রশ্ন হলো, বর্তমান মূল্যস্ফীতির জন্য আসলে কে দায়ী? ব্যবসায়ীরা বলছেন, সরকারের নীতিও এর একটি কারণ। ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি, কর বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন অতিরিক্ত ব্যয় ব্যবসার পরিচালন খরচ বাড়িয়ে দিয়েছে। অর্থাৎ সরকার একদিকে ব্যয় বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে সেই বাড়তি ব্যয়ের প্রভাব মূল্যনিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ঠেকাতে চাইছে। এই দ্বৈত অবস্থান স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি করে।

Inflation continues to ease, but rice prices remain a major concern:  Planning Commission | The Business Standard

অবশ্য সরকার যে রাজনৈতিক চাপে আছে, সেটিও অস্বীকার করার উপায় নেই। জ্বালানি বিল বাড়ছে, খাদ্যের দাম বাড়ছে, আর সাধারণ মানুষের আয় সেই হারে বাড়ছে না। ফলে সরকারকে কিছু একটা করতেই হবে। কিন্তু “দাম বেঁধে দেওয়া” হয়তো সবচেয়ে কার্যকর পথ নয়।

বরং লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা—যেমন নিম্নআয়ের পরিবারকে সরাসরি ভর্তুকি, জ্বালানি সহায়তা বা কর ছাড়—অনেক বেশি বাস্তবসম্মত হতে পারে। এতে বাজারের স্বাভাবিক কার্যক্রমও বজায় থাকে, আবার মানুষের চাপও কিছুটা কমে।

অর্থনীতির কঠিন সত্য হলো, জনপ্রিয় সমাধান সব সময় কার্যকর সমাধান নয়। মূল্যস্ফীতির মতো জটিল সংকটকে প্রশাসনিক নির্দেশ দিয়ে সাময়িকভাবে আড়াল করা যায়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে বাজার তার নিজের নিয়মেই প্রতিক্রিয়া দেখায়। আর সেই প্রতিক্রিয়ার মূল্য শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষকেই দিতে হয়।