০৬:১০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬
মহেশখালীতে ১ হাজার পরিবারকে খাদ্য সহায়তা দিল আইএসডিই বাংলাদেশ জকিগঞ্জে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন, অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আহ্বান তেলের বাজারের অদৃশ্য বিপদসীমা জিডিপির কাগুজে স্বস্তি, অর্থনীতির বাস্তব সংকট বাংলাদেশে সামনে খাদ্য সংকট কতটা প্রকট হতে পারে চীনের কূটনৈতিক ভাষা: নীতির চেয়েও শক্তিশালী অস্ত্র কয়লা, পাম অয়েল ও ফেরোঅ্যালয় রপ্তানিতে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ: ইন্দোনেশিয়া কি নতুন একচেটিয়া শক্তির পথে? খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অগ্নিকাণ্ড — আইসিইউর রোগীর মৃত্যু, তিন নার্স লাফ দিলেন তৃতীয় তলা থেকে ঢাকায় প্রতিবেশীর হাতে খুন হলো দ্বিতীয় শ্রেণির মেধাবী ছাত্রী রামিসা — আসামি গ্রেপ্তার টিকার ঘাটতিতে বাড়তে পারে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সের ঝুঁকি: নতুন নীতিপত্রে সতর্কবার্তা

মোদীকে প্রশ্ন করে আলোচনায় আসা নরওয়ের সাংবাদিক বিবিসিকে যা বললেন

  • Sarakhon Report
  • ০৩:৫০:৩৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬
  • 17

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর চলমান বিদেশ সফর বেশ কয়েকটি কারণে আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম মি. মোদীর উদ্দেশে নরওয়ের এক সাংবাদিকের প্রশ্ন।

সোমবার নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী জোনাস গর স্টোর ও নরেন্দ্র মোদী যৌথ বিবৃতি তুলে ধরার পর কক্ষ ছেড়ে চলে যাচ্ছিলেন, তারা কোনো সাংবাদিকের কাছ থেকে প্রশ্ন নেবেন না বলে জানান।

সেই সময় একজন নারী সাংবাদিককে প্রশ্ন করতে শোনা যায়, “প্রধানমন্ত্রী মোদী, আপনি কেন বিশ্বের স্বাধীনতম সংবাদমাধ্যমের প্রশ্নের মুখোমুখি হচ্ছেন না?”

ওই সাংবাদিকের নাম হেলা ল্যাং। নরওয়ে-ভিত্তিক সংবাদপত্র দাক্সতাভিস-এর সাংবাদিক তিনি।

পরে অসলোতে ভারতের দূতাবাসের তরফে আয়োজিত পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রেস ব্রিফিং-এ তাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। সেখানেও পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

ওই সাংবাদিকের সঙ্গে কথা বলেছিলেন বিবিসি হিন্দির সম্পাদক নীতিন শ্রীবাস্তব। বিবিসি নিউজ হিন্দিকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে হেলা ল্যাং বলেছেন, “একজন সাংবাদিক হিসেবে তার কাজ প্রশ্ন করা।”

উত্তর না পেলে “বারবার প্রশ্ন করতেও অভ্যস্ত তিনি।”

বিশ্বে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার নিরিখে এক নম্বরে রয়েছে নরওয়ে, ভারতের স্থান ১৫৭তে এবং এই মুহূর্তে খবরের শিরোনামে রয়েছেন নরওয়ের ওই সাংবাদিক।

তার প্রশ্ন ভারতের রাজতীতিতেও আলোচনার বস্তু হয়ে উঠেছে। এই ঘটনাকে হাতিয়ার করেই বিরোধীরা কটাক্ষ করতে ছাড়েনি নরেন্দ্র মোদীকে।

বিবিসি নিউজ হিন্দির সম্পাদক নীতিন শ্রীবাস্তবের সঙ্গে কথা বলছেন হেলা ল্যাং

বিবিসি নিউজ হিন্দির সম্পাদক নীতিন শ্রীবাস্তবের সঙ্গে কথা বলছেন হেলা ল্যাং

হেলা ল্যাং বিবিসিকে যা জানিয়েছেন

বিবিসির সঙ্গে আলাপকালে নিজের সম্পর্কে ওই সাংবাদিক বলেছেন, “সংক্ষেপে বলতে গেলে, আমি পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে সাংবাদিকতা করছি। নরওয়ের জাতীয় সংবাদপত্রগুলোতে কাজ করেছি।”

প্রধানমন্ত্রী মোদীর উদ্দেশে তার প্রশ্ন নিয়ে জানতে চাওয়া হয়েছিল। ওই সাংবাদিকের কথায়, “নরওয়েতে এই ধরনের সংবাদ সম্মেলনে সাধারণত এমনই হয়। নেতারা সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন এবং তারপর কিছু প্রশ্নের উত্তর দেন। যেমন, গত বছর যখন ম্যাক্রোঁ (ফরাসি প্রেসিডেন্ট) এসেছিলেন, তিনিও নরওয়ের সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিলেন।”

“আমি বিশ্বাস করি, সাংবাদিক হিসেবে প্রশ্ন করা আমাদের দায়িত্ব। যখন একটি শক্তিশালী দেশ আমাদের মতো ছোট দেশে এসে সম্পর্ক জোরদার করতে চায়, তখন প্রশ্ন করা আমাদের দায়িত্ব। আমি জানি আপনাদের প্রধানমন্ত্রী প্রশ্ন নিতে পছন্দ করেন না, কিন্তু প্রশ্ন করাটা আমার কর্তব্য ছিল।”

পরে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাংবাদিক সম্মেলনে যে উত্তপ্ত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, সে বিষয়েও প্রশ্ন করা হয়েছিল তাকে।

হেলা ল্যাং বলেন, “পুরো প্রক্রিয়াতে গলদ ছিল বলে আমার মনে হয়েছে এবং আমি এও জিজ্ঞাসা করছিলাম, আপনি কি তাৎক্ষণিকভাবে উত্তর দিতে পারবেন?”

“সমস্যাটি ছিল, উনি (ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা) তিন-চারটি প্রশ্ন শোনার পর উত্তর দিচ্ছিলেন। একজন সাংবাদিক হিসেবে, আমি যদি আমার প্রশ্নের উত্তর না পাই, তাহলে তাকে থামিয়ে মূল প্রসঙ্গে ফিরিয়ে আনা আমার কর্তব্য।”

“মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে প্রশ্ন করেছিলাম, কিন্তু তিনি তার উত্তর দেননি। প্রায় এক মিনিট পর আমি তাকে থামিয়ে আলোচনাটি আবার সেই প্রসঙ্গে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করলেও পারিনি।”

তিনি বিবিসিকে জানিয়েছেন, উত্তরে সন্তুষ্ট না হলে আবার প্রশ্ন করতেই অভ্যস্ত তিনি। তার কথায়, “নরওয়েতে, উত্তর পছন্দ না হলে আমি আবার প্রশ্ন করতে অভ্যস্ত। অন্তত আমার যাতে মনে হয় যে আমার প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হয়েছে। আমি প্রশ্ন করব এবং রাজনীতিবিদ তার উত্তর দেবেন-এটি আমার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।”

“কিন্তু গতকাল আলোচনাটি ২০২০ সালে ভারতের টিকা সরবরাহ এবং যোগ ব্যায়ামের দিকে মোড় নেয়। আমি ইয়োগা এবং ভারতীয় সংস্কৃতির অনেক কিছুই ভালোবাসি। ভারত কিছু বিষয়ে চমৎকার কাজ করে। কিন্তু আমি সাধারণত কোনো দেশের প্রশংসা শুনতে সংবাদ সম্মেলনে যাই না।”

প্রেস ব্রিফিং-এর সময় যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল সে সম্পর্কে তার ব্যাখ্যা, “দ্বিতীয় সংবাদ সম্মেলনে আমাকে কিছুটা রূঢ় মনে হতে পারে, এমনটা হয়তো কারো কারো মনেও হয়েছে। কিন্তু এটাই হলো মুখোমুখি সাংবাদিকতার রীতি। আপনাকে কথা থামিয়ে উত্তর আদায়ের চেষ্টা করতে হয়। তবে, গতকাল আমি সেই উত্তর পাইনি।”

নরওয়ের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রী

নরওয়ের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর এই যৌথ সংবাদ সম্মেলনেই নরেন্দ্র মোদীকে কড়া প্রশ্ন করেছিলেন সাংবাদিক হেলা ল্যাং

ঘটনা পরম্পরা

এই মুহূর্তে বিদেশ সফরে রয়েছেন নরেন্দ্র মোদী। তার সফরসূচিতে ছিল সংযুক্ত আরব আমিরাত, নেদারল্যান্ডস, সুইডেন, নরওয়ে ও ইতালি। এই মুহূর্তে তিনি ইতালিতে।

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের নিরিখে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর পাঁচ দেশের এই সফর বেশ গুরুত্বপূর্ণ। সফররত দেশগুলোর সঙ্গে ভারতের একাধিক বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে। দেশগুলোর সঙ্গে ভারতের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উপর জোর দেওয়া হয়েছে।

সুইডেন সফরকালে সে দেশের সর্বোচ্চ সম্মান ‘রয়্যাল অর্ডার অফ দ্য পোলার স্টার কমান্ডার গ্র্যান্ড ক্রস’ও পেয়েছেন মোদী। একইসঙ্গে ‘অস্বস্তিকর’ মুহূর্তেরও সাক্ষী থেকেছে এই সফর।

নেদারল্যান্ডসে পৌঁছানোর আগে ডাচ প্রধানমন্ত্রী রব জেটেন ভারতে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এবং সংখ্যালঘুদের অবস্থা ঘিরে যে মন্তব্য করেছিলেন তাকে ঘিরে বিতর্ক বাঁধে। পরে ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ব্রিফিং-এ এক ডাচ সাংবাদিক ডাচ প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্য নিয়ে প্রশ্ন করেছিলেন। ভারত জানায়- এই প্রশ্ন ভারত সম্পর্কে সে দেশের জনগণের সচেতনতার অভাবকেই প্রমাণ করে।

এরপর সোমবার নরওয়ের রাজধানী অসলোতে নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী জোনাস স্টোরের সঙ্গে নরেন্দ্র মোদীর যৌথ বিবৃতির পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী যখন চলে যাচ্ছেন তখন তাকে উদ্দেশ করে প্রশ্ন করেন হেলা ল্যাং।

প্রধানমন্ত্রী মোদী তার প্রশ্ন শুনতে পেয়েছিলেন কি না তা যেমন স্পষ্ট নয়, তেমনই তাকে কোনো জবাবও দিতে বা দাঁড়াতে দেখা যায়নি।

হেলা ল্যাং সোশ্যাল মিডিয়ায় এই নিয়ে লেখেন, “ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী আমার প্রশ্ন নেননি, আমি তা আশাও করিনি।”

ওই পোস্টের জবাবে নরওয়েতে ভারতীয় দূতাবাস জানায়, ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রেস ব্রিফিং-এ এসে তিনি প্রশ্ন করতে পারেন।

ওই অনুষ্ঠানেও তার প্রশ্ন, তৎক্ষণাৎ জবাব পাওয়ার দাবি এবং ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব (পশ্চিম) সিবি জর্জ এবং মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়ালের কথার মাঝে কথা বলে ওঠাকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়।

ব্রিফিং-এ হেলা ল্যাং প্রশ্ন করেন, “আমরা আমাদের (নরওয়ে ও ভারতের) অংশীদারিত্বকে মজবুত করতে চলেছি- তো আমার প্রশ্ন হলো আপনাদের কেন ভরসা করব? এই বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দিতে পারবেন- আপনাদের দেশে যে মানবাধিকার লঙ্ঘন হয়-সেটি বন্ধ করার চেষ্টা করবেন? আগামী সময়ে প্রধানমন্ত্রী মোদী কি ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের কাছ থেকে কড়া প্রশ্ন শোনা শুরু করবেন? এবং যদি সম্ভব হয়, তাহলে যদি এখনই জবাব দেন।”

ওই সাংবাদিক সম্মেলনে রণধীর জয়সওয়াল পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন। ধাপে ধাপে কয়েকজন সাংবাদিকদের কাছ থেকে প্রশ্ন শুনে তারপর তার জবাব দিচ্ছিলেন সিবি জর্জ।

হেলা ল্যাং-এর প্রশ্ন শুনে তিনি বলেন, “ঠিক আছে।”

তারপর পরবর্তী সাংবাদিককে প্রশ্ন করার জন্য ইশারা করতেই মিজ ল্যাং বলে ওঠেন, “এখনিই… এখনই। ফলোআপ-এর জন্য আমার প্রশ্ন থাকতে পারে। ভালো হয়, যদি এখনই উত্তর দেওয়া হয়, তাহলে আমি ফলোআপ প্রশ্ন করতে পারি।”

মি. জয়সওয়াল তাকে বলেন, “আমি এই প্রেস কনফারেন্স পরিচালনা করছি… প্লিজ।” এরপর তিনি অন্য এক সাংবাদিককে তার প্রশ্ন জানাতে বলেন।

অসলোতে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিং-এর ছবি

অসলোতে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিং-এর ছবি

ভারতের জবাব ও পাল্টা ‘সমালোচনা’

জবাব দেওয়া শুরু হলে মি. জর্জের উত্তরের মাঝেই বেশ কয়েকবার কথা বলতে শোনা যায় হেলা ল্যাংকে। ধীরে ধীরে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হতে থাকে।

উত্তরের শুরুর দিকে সিবি জর্জ বলেন, “আপনি আমাকে প্রশ্ন করেছেন, আমি তার উত্তর দিচ্ছি…ঠিক আছে? ভারত কী এবং কেন বিশ্ব ভারতকে বিশ্বাস করবে, তার প্রেক্ষাপট তুলে ধরতে চাই।”

“গত কয়েক বছরে বিশ্ব যে কয়েকটি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে, সেগুলোর দিকে নজর দেওয়া যাক। কোভিড ছিল বিশ্বের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। একটি দেশের ওপর আস্থা কীভাবে পরীক্ষা করা হয়?”

এরপর ভারতের প্রাচীন ইতিহাসের প্রসঙ্গও টানেন মি. জর্জ।

তিনি বলেন, “আজকের দিনে দাঁড়িয়ে একটি দেশের চারটি উপাদান রয়েছে-প্রথম, জনসংখ্যা, দ্বিতীয়- সরকার, তৃতীয়-সার্বভৌমত্ব এবং চতুর্থ- ভূখণ্ড। এই উপাদানগুলোই দেশকে দেশ হিসেবে হিসেবে গড়ে তোলে এবং আমরা গর্বিত যে আমরা ৫,০০০ বছরের প্রাচীন অবিচ্ছিন্ন সভ্যতার দেশ এবং বিশ্বের প্রতি যার অবদান অপরিমেয়। চারপাশে তাকালে দেখবেন, বিশ্বের সর্বত্রই ভারতীয় সংযোগ রয়েছে।”

এরপর শূন্য, ইয়োগা থেকে শুরু করে বিভিন্ন বিষয়ের উৎপত্তিস্থল যে ভারত তা উল্লেখ করেন। এর মাঝে ওই সাংবাদিককে আবার কথা বলতে শোনা যায়।

তাকে বাধা না দেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে মি. জর্জ বলেন, “সুতরাং, ভারত একটি সভ্য দেশ, যার কাছে এমন কিছু অনন্য বিষয় আছে যা সে বিশ্বকে দিয়েছে এবং এখনো দিয়ে চলেছে। এবার কোভিড প্রসঙ্গে ফিরে আসি। পুরো বিশ্ব কোভিডে ভুগেছিল।”

সেই সময়ে ভারতের ভূমিকা উল্লেখ করে বলেন, “আমরা বিশ্বের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলাম। এতে আস্থা তৈরি হয় এবং আমি খুব খুশি যে বিশ্ব এর কদর করছে। আমরা ১০০টিরও বেশি দেশে ভ্যাকসিন সরবরাহ করেছি। এতেও আস্থা তৈরি হয়। দ্বিতীয়ত, আমরা ১৫০টি দেশে ওষুধ সরবরাহ করেছি। এতে আস্থা তৈরি হয় এবং সেই কারণেই বিশ্ব আমাদের উপর ভরসা করে।”

এরপর তিনি জি-২০ সম্মেলনে ভারতের ভুমিকা, রাশিয়া-উইক্রেন যুদ্ধে অবস্থান-সহ বিভিন্ন বিষয়ে উল্লেখ করেন।

এর মাঝে ওই সাংবাদিককে আবার কথা বলতে শোনা যায়।

মানবাধিকার প্রসঙ্গে সিবি জর্জ বলেন, “এবার মানবাধিকার নিয়ে উনি (হেলা ল্যাং) যা জিজ্ঞাসা করেছিলেন, সে প্রসঙ্গে আসি। আমি উল্লেখ করতে চাই ভারত একটি সংবিধান-ভিত্তিক দেশ। ভারত বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র। শেষবার যখন ভারতে নির্বাচন হয়েছিল, তখন প্রায় ১০০ কোটি মানুষ অংশগ্রহণ করেছিলেন। ভারতে গণতন্ত্রের উৎসব পালিত হয়েছে। ভারত এমন এক দেশ… যেখানে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতার হস্তান্তর ঘটে এবং ভারতে তা ঘটেছে। বিশ্বের খুব কম দেশেই এটা ঘটে।”

তিনি আরো বলেন, “ভারতের প্রত্যেক মানুষের একটি মৌলিক অধিকার রয়েছে, যদি তার অধিকার লঙ্ঘিত হয় তবে আদালতে যাওয়ার অধিকার রয়েছে।”

ভারতে গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে তাকে পাল্টা সমালোচনা করতে শোনা যায়। সিবি জর্জ বলেছিলেন, “আপনাদের মধ্যে কেউ কেউ ভারতীয় গণমাধ্যমের (সঙ্গে যুক্ত)। আপনারা জানেন, কত খবর প্রকাশিত হয়। প্রতিদিন সন্ধ্যায় কত ব্রেকিং নিউজ আসে। শুধু দিল্লিতেই অন্তত ২০০টি টিভি চ্যানেল আছে- ইংরেজি, হিন্দি এবং একাধিক ভাষায়।”

“ভারতের বিশালতা সম্পর্কে মানুষের কোনো ধারণা নেই। মানুষের কোনো বোধশক্তি নেই। কিছু অজ্ঞ এনজিওর দ্বারা প্রকাশিত এক-দু’টি প্রতিবেদন পড়ে এবং তারপর প্রশ্ন করে। এ নিয়ে চিন্তা করবেন না। গণতন্ত্র নিয়ে আমরা গর্বিত।”

যৌথভাবে সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প ও নরেন্দ্র মোদী

যৌথভাবে সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প ও নরেন্দ্র মোদী

সাংবাদিক সম্মেলন ও মোদী

সাধারণত গণতান্ত্রিক দেশগুলিতে দ্বিপাক্ষিক সফরের দুই দেশের প্রধানকে হাতে গোনা হলেও গণমাধ্যমের প্রশ্নের মুখোমুখি হতে দেখা যায়। কিন্তু নরেন্দ্র মোদী ক্ষমতায় আসার পর কয়েকটি সফর বাদ দিলে তেমনটা দেখা যায়নি।

তবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ শুরু হওয়ার পরপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখোমুখি হতে দেখা গিয়েছিল মি. মোদীকে। প্রেসিডেন্ট ওবামা এবং জো বাইডেনের সঙ্গেও তাকে যৌথভাবে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে প্রশ্নের উত্তর দিতে দেখা গিয়েছে।

ভারতেও নরেন্দ্র মোদী খুবই কম সংবাদ সম্মেলন করেছেন এবং সেখানেও কোনো সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখোমুখি হন না তিনি।

এদিকে, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে ভারতে বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন উঠেছে। মানবাধিকার সংগঠন থেকে শুরু করে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি- সংবাদমাধ্যমের কণ্ঠস্বর রোধের অভিযোগও তুলেছে।

নরওয়ের ঘটনার পর কংগ্রেসের রাহুল গান্ধী কটাক্ষ করে বলেছেন, “যখন লুকানোর কিছু থাকে না, তখন ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই। যখন বিশ্ব দেখে যে একজন আপসকামী প্রধানমন্ত্রী কয়েকটি প্রশ্নের ভয়ে চলে যাচ্ছেন করছেন, তখন তা ভারতের ভাবমূর্তির ওপর কেমন প্রভাব ফেলে?”

তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মহুয়া মৈত্র এক্স-এ লিখেছেন, “প্রিয় হেলা ল্যাং ভারতের বিরোধী দল এবং লক্ষ লক্ষ ভারতীয়ের পক্ষ থেকে আপনাকে ধন্যবাদ। আপনি সেটাই করেছেন যা আমাদের নিজস্ব গণমাধ্যম ধারাবাহিকভাবে করতে ব্যর্থ হয়েছে – ক্ষমতার অধিকারীদের প্রশ্ন করা এবং জবাবদিহিতা দাবি করা। প্রেস ব্রিফিং বা প্রেস কনফারেন্স – নামেই পার্থক্য। উত্তরও নেই, সত্যও নেই।”

এদিকে, বিজেপির আইটি সেলের প্রধান অমিত মালবিয়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখেছেন , “দুই নেতার যৌথ সংবাদ সম্মেলনে নরওয়ের প্রধানমন্ত্রীও কোনো প্রশ্নের উত্তর দেননি। কিন্তু রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বাধীন উন্মত্ত কংগ্রেস পরিমণ্ডল একজন অসংযত সাংবাদিকের ভিত্তিহীন মন্তব্য উদযাপন করছে।”

বিবিসি নিউজ বাংলা

জনপ্রিয় সংবাদ

মহেশখালীতে ১ হাজার পরিবারকে খাদ্য সহায়তা দিল আইএসডিই বাংলাদেশ

মোদীকে প্রশ্ন করে আলোচনায় আসা নরওয়ের সাংবাদিক বিবিসিকে যা বললেন

০৩:৫০:৩৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর চলমান বিদেশ সফর বেশ কয়েকটি কারণে আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম মি. মোদীর উদ্দেশে নরওয়ের এক সাংবাদিকের প্রশ্ন।

সোমবার নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী জোনাস গর স্টোর ও নরেন্দ্র মোদী যৌথ বিবৃতি তুলে ধরার পর কক্ষ ছেড়ে চলে যাচ্ছিলেন, তারা কোনো সাংবাদিকের কাছ থেকে প্রশ্ন নেবেন না বলে জানান।

সেই সময় একজন নারী সাংবাদিককে প্রশ্ন করতে শোনা যায়, “প্রধানমন্ত্রী মোদী, আপনি কেন বিশ্বের স্বাধীনতম সংবাদমাধ্যমের প্রশ্নের মুখোমুখি হচ্ছেন না?”

ওই সাংবাদিকের নাম হেলা ল্যাং। নরওয়ে-ভিত্তিক সংবাদপত্র দাক্সতাভিস-এর সাংবাদিক তিনি।

পরে অসলোতে ভারতের দূতাবাসের তরফে আয়োজিত পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রেস ব্রিফিং-এ তাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। সেখানেও পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

ওই সাংবাদিকের সঙ্গে কথা বলেছিলেন বিবিসি হিন্দির সম্পাদক নীতিন শ্রীবাস্তব। বিবিসি নিউজ হিন্দিকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে হেলা ল্যাং বলেছেন, “একজন সাংবাদিক হিসেবে তার কাজ প্রশ্ন করা।”

উত্তর না পেলে “বারবার প্রশ্ন করতেও অভ্যস্ত তিনি।”

বিশ্বে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার নিরিখে এক নম্বরে রয়েছে নরওয়ে, ভারতের স্থান ১৫৭তে এবং এই মুহূর্তে খবরের শিরোনামে রয়েছেন নরওয়ের ওই সাংবাদিক।

তার প্রশ্ন ভারতের রাজতীতিতেও আলোচনার বস্তু হয়ে উঠেছে। এই ঘটনাকে হাতিয়ার করেই বিরোধীরা কটাক্ষ করতে ছাড়েনি নরেন্দ্র মোদীকে।

বিবিসি নিউজ হিন্দির সম্পাদক নীতিন শ্রীবাস্তবের সঙ্গে কথা বলছেন হেলা ল্যাং

বিবিসি নিউজ হিন্দির সম্পাদক নীতিন শ্রীবাস্তবের সঙ্গে কথা বলছেন হেলা ল্যাং

হেলা ল্যাং বিবিসিকে যা জানিয়েছেন

বিবিসির সঙ্গে আলাপকালে নিজের সম্পর্কে ওই সাংবাদিক বলেছেন, “সংক্ষেপে বলতে গেলে, আমি পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে সাংবাদিকতা করছি। নরওয়ের জাতীয় সংবাদপত্রগুলোতে কাজ করেছি।”

প্রধানমন্ত্রী মোদীর উদ্দেশে তার প্রশ্ন নিয়ে জানতে চাওয়া হয়েছিল। ওই সাংবাদিকের কথায়, “নরওয়েতে এই ধরনের সংবাদ সম্মেলনে সাধারণত এমনই হয়। নেতারা সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন এবং তারপর কিছু প্রশ্নের উত্তর দেন। যেমন, গত বছর যখন ম্যাক্রোঁ (ফরাসি প্রেসিডেন্ট) এসেছিলেন, তিনিও নরওয়ের সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিলেন।”

“আমি বিশ্বাস করি, সাংবাদিক হিসেবে প্রশ্ন করা আমাদের দায়িত্ব। যখন একটি শক্তিশালী দেশ আমাদের মতো ছোট দেশে এসে সম্পর্ক জোরদার করতে চায়, তখন প্রশ্ন করা আমাদের দায়িত্ব। আমি জানি আপনাদের প্রধানমন্ত্রী প্রশ্ন নিতে পছন্দ করেন না, কিন্তু প্রশ্ন করাটা আমার কর্তব্য ছিল।”

পরে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাংবাদিক সম্মেলনে যে উত্তপ্ত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, সে বিষয়েও প্রশ্ন করা হয়েছিল তাকে।

হেলা ল্যাং বলেন, “পুরো প্রক্রিয়াতে গলদ ছিল বলে আমার মনে হয়েছে এবং আমি এও জিজ্ঞাসা করছিলাম, আপনি কি তাৎক্ষণিকভাবে উত্তর দিতে পারবেন?”

“সমস্যাটি ছিল, উনি (ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা) তিন-চারটি প্রশ্ন শোনার পর উত্তর দিচ্ছিলেন। একজন সাংবাদিক হিসেবে, আমি যদি আমার প্রশ্নের উত্তর না পাই, তাহলে তাকে থামিয়ে মূল প্রসঙ্গে ফিরিয়ে আনা আমার কর্তব্য।”

“মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে প্রশ্ন করেছিলাম, কিন্তু তিনি তার উত্তর দেননি। প্রায় এক মিনিট পর আমি তাকে থামিয়ে আলোচনাটি আবার সেই প্রসঙ্গে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করলেও পারিনি।”

তিনি বিবিসিকে জানিয়েছেন, উত্তরে সন্তুষ্ট না হলে আবার প্রশ্ন করতেই অভ্যস্ত তিনি। তার কথায়, “নরওয়েতে, উত্তর পছন্দ না হলে আমি আবার প্রশ্ন করতে অভ্যস্ত। অন্তত আমার যাতে মনে হয় যে আমার প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হয়েছে। আমি প্রশ্ন করব এবং রাজনীতিবিদ তার উত্তর দেবেন-এটি আমার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।”

“কিন্তু গতকাল আলোচনাটি ২০২০ সালে ভারতের টিকা সরবরাহ এবং যোগ ব্যায়ামের দিকে মোড় নেয়। আমি ইয়োগা এবং ভারতীয় সংস্কৃতির অনেক কিছুই ভালোবাসি। ভারত কিছু বিষয়ে চমৎকার কাজ করে। কিন্তু আমি সাধারণত কোনো দেশের প্রশংসা শুনতে সংবাদ সম্মেলনে যাই না।”

প্রেস ব্রিফিং-এর সময় যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল সে সম্পর্কে তার ব্যাখ্যা, “দ্বিতীয় সংবাদ সম্মেলনে আমাকে কিছুটা রূঢ় মনে হতে পারে, এমনটা হয়তো কারো কারো মনেও হয়েছে। কিন্তু এটাই হলো মুখোমুখি সাংবাদিকতার রীতি। আপনাকে কথা থামিয়ে উত্তর আদায়ের চেষ্টা করতে হয়। তবে, গতকাল আমি সেই উত্তর পাইনি।”

নরওয়ের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রী

নরওয়ের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর এই যৌথ সংবাদ সম্মেলনেই নরেন্দ্র মোদীকে কড়া প্রশ্ন করেছিলেন সাংবাদিক হেলা ল্যাং

ঘটনা পরম্পরা

এই মুহূর্তে বিদেশ সফরে রয়েছেন নরেন্দ্র মোদী। তার সফরসূচিতে ছিল সংযুক্ত আরব আমিরাত, নেদারল্যান্ডস, সুইডেন, নরওয়ে ও ইতালি। এই মুহূর্তে তিনি ইতালিতে।

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের নিরিখে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর পাঁচ দেশের এই সফর বেশ গুরুত্বপূর্ণ। সফররত দেশগুলোর সঙ্গে ভারতের একাধিক বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে। দেশগুলোর সঙ্গে ভারতের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উপর জোর দেওয়া হয়েছে।

সুইডেন সফরকালে সে দেশের সর্বোচ্চ সম্মান ‘রয়্যাল অর্ডার অফ দ্য পোলার স্টার কমান্ডার গ্র্যান্ড ক্রস’ও পেয়েছেন মোদী। একইসঙ্গে ‘অস্বস্তিকর’ মুহূর্তেরও সাক্ষী থেকেছে এই সফর।

নেদারল্যান্ডসে পৌঁছানোর আগে ডাচ প্রধানমন্ত্রী রব জেটেন ভারতে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এবং সংখ্যালঘুদের অবস্থা ঘিরে যে মন্তব্য করেছিলেন তাকে ঘিরে বিতর্ক বাঁধে। পরে ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ব্রিফিং-এ এক ডাচ সাংবাদিক ডাচ প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্য নিয়ে প্রশ্ন করেছিলেন। ভারত জানায়- এই প্রশ্ন ভারত সম্পর্কে সে দেশের জনগণের সচেতনতার অভাবকেই প্রমাণ করে।

এরপর সোমবার নরওয়ের রাজধানী অসলোতে নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী জোনাস স্টোরের সঙ্গে নরেন্দ্র মোদীর যৌথ বিবৃতির পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী যখন চলে যাচ্ছেন তখন তাকে উদ্দেশ করে প্রশ্ন করেন হেলা ল্যাং।

প্রধানমন্ত্রী মোদী তার প্রশ্ন শুনতে পেয়েছিলেন কি না তা যেমন স্পষ্ট নয়, তেমনই তাকে কোনো জবাবও দিতে বা দাঁড়াতে দেখা যায়নি।

হেলা ল্যাং সোশ্যাল মিডিয়ায় এই নিয়ে লেখেন, “ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী আমার প্রশ্ন নেননি, আমি তা আশাও করিনি।”

ওই পোস্টের জবাবে নরওয়েতে ভারতীয় দূতাবাস জানায়, ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রেস ব্রিফিং-এ এসে তিনি প্রশ্ন করতে পারেন।

ওই অনুষ্ঠানেও তার প্রশ্ন, তৎক্ষণাৎ জবাব পাওয়ার দাবি এবং ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব (পশ্চিম) সিবি জর্জ এবং মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়ালের কথার মাঝে কথা বলে ওঠাকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়।

ব্রিফিং-এ হেলা ল্যাং প্রশ্ন করেন, “আমরা আমাদের (নরওয়ে ও ভারতের) অংশীদারিত্বকে মজবুত করতে চলেছি- তো আমার প্রশ্ন হলো আপনাদের কেন ভরসা করব? এই বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দিতে পারবেন- আপনাদের দেশে যে মানবাধিকার লঙ্ঘন হয়-সেটি বন্ধ করার চেষ্টা করবেন? আগামী সময়ে প্রধানমন্ত্রী মোদী কি ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের কাছ থেকে কড়া প্রশ্ন শোনা শুরু করবেন? এবং যদি সম্ভব হয়, তাহলে যদি এখনই জবাব দেন।”

ওই সাংবাদিক সম্মেলনে রণধীর জয়সওয়াল পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন। ধাপে ধাপে কয়েকজন সাংবাদিকদের কাছ থেকে প্রশ্ন শুনে তারপর তার জবাব দিচ্ছিলেন সিবি জর্জ।

হেলা ল্যাং-এর প্রশ্ন শুনে তিনি বলেন, “ঠিক আছে।”

তারপর পরবর্তী সাংবাদিককে প্রশ্ন করার জন্য ইশারা করতেই মিজ ল্যাং বলে ওঠেন, “এখনিই… এখনই। ফলোআপ-এর জন্য আমার প্রশ্ন থাকতে পারে। ভালো হয়, যদি এখনই উত্তর দেওয়া হয়, তাহলে আমি ফলোআপ প্রশ্ন করতে পারি।”

মি. জয়সওয়াল তাকে বলেন, “আমি এই প্রেস কনফারেন্স পরিচালনা করছি… প্লিজ।” এরপর তিনি অন্য এক সাংবাদিককে তার প্রশ্ন জানাতে বলেন।

অসলোতে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিং-এর ছবি

অসলোতে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিং-এর ছবি

ভারতের জবাব ও পাল্টা ‘সমালোচনা’

জবাব দেওয়া শুরু হলে মি. জর্জের উত্তরের মাঝেই বেশ কয়েকবার কথা বলতে শোনা যায় হেলা ল্যাংকে। ধীরে ধীরে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হতে থাকে।

উত্তরের শুরুর দিকে সিবি জর্জ বলেন, “আপনি আমাকে প্রশ্ন করেছেন, আমি তার উত্তর দিচ্ছি…ঠিক আছে? ভারত কী এবং কেন বিশ্ব ভারতকে বিশ্বাস করবে, তার প্রেক্ষাপট তুলে ধরতে চাই।”

“গত কয়েক বছরে বিশ্ব যে কয়েকটি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে, সেগুলোর দিকে নজর দেওয়া যাক। কোভিড ছিল বিশ্বের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। একটি দেশের ওপর আস্থা কীভাবে পরীক্ষা করা হয়?”

এরপর ভারতের প্রাচীন ইতিহাসের প্রসঙ্গও টানেন মি. জর্জ।

তিনি বলেন, “আজকের দিনে দাঁড়িয়ে একটি দেশের চারটি উপাদান রয়েছে-প্রথম, জনসংখ্যা, দ্বিতীয়- সরকার, তৃতীয়-সার্বভৌমত্ব এবং চতুর্থ- ভূখণ্ড। এই উপাদানগুলোই দেশকে দেশ হিসেবে হিসেবে গড়ে তোলে এবং আমরা গর্বিত যে আমরা ৫,০০০ বছরের প্রাচীন অবিচ্ছিন্ন সভ্যতার দেশ এবং বিশ্বের প্রতি যার অবদান অপরিমেয়। চারপাশে তাকালে দেখবেন, বিশ্বের সর্বত্রই ভারতীয় সংযোগ রয়েছে।”

এরপর শূন্য, ইয়োগা থেকে শুরু করে বিভিন্ন বিষয়ের উৎপত্তিস্থল যে ভারত তা উল্লেখ করেন। এর মাঝে ওই সাংবাদিককে আবার কথা বলতে শোনা যায়।

তাকে বাধা না দেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে মি. জর্জ বলেন, “সুতরাং, ভারত একটি সভ্য দেশ, যার কাছে এমন কিছু অনন্য বিষয় আছে যা সে বিশ্বকে দিয়েছে এবং এখনো দিয়ে চলেছে। এবার কোভিড প্রসঙ্গে ফিরে আসি। পুরো বিশ্ব কোভিডে ভুগেছিল।”

সেই সময়ে ভারতের ভূমিকা উল্লেখ করে বলেন, “আমরা বিশ্বের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলাম। এতে আস্থা তৈরি হয় এবং আমি খুব খুশি যে বিশ্ব এর কদর করছে। আমরা ১০০টিরও বেশি দেশে ভ্যাকসিন সরবরাহ করেছি। এতেও আস্থা তৈরি হয়। দ্বিতীয়ত, আমরা ১৫০টি দেশে ওষুধ সরবরাহ করেছি। এতে আস্থা তৈরি হয় এবং সেই কারণেই বিশ্ব আমাদের উপর ভরসা করে।”

এরপর তিনি জি-২০ সম্মেলনে ভারতের ভুমিকা, রাশিয়া-উইক্রেন যুদ্ধে অবস্থান-সহ বিভিন্ন বিষয়ে উল্লেখ করেন।

এর মাঝে ওই সাংবাদিককে আবার কথা বলতে শোনা যায়।

মানবাধিকার প্রসঙ্গে সিবি জর্জ বলেন, “এবার মানবাধিকার নিয়ে উনি (হেলা ল্যাং) যা জিজ্ঞাসা করেছিলেন, সে প্রসঙ্গে আসি। আমি উল্লেখ করতে চাই ভারত একটি সংবিধান-ভিত্তিক দেশ। ভারত বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র। শেষবার যখন ভারতে নির্বাচন হয়েছিল, তখন প্রায় ১০০ কোটি মানুষ অংশগ্রহণ করেছিলেন। ভারতে গণতন্ত্রের উৎসব পালিত হয়েছে। ভারত এমন এক দেশ… যেখানে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতার হস্তান্তর ঘটে এবং ভারতে তা ঘটেছে। বিশ্বের খুব কম দেশেই এটা ঘটে।”

তিনি আরো বলেন, “ভারতের প্রত্যেক মানুষের একটি মৌলিক অধিকার রয়েছে, যদি তার অধিকার লঙ্ঘিত হয় তবে আদালতে যাওয়ার অধিকার রয়েছে।”

ভারতে গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে তাকে পাল্টা সমালোচনা করতে শোনা যায়। সিবি জর্জ বলেছিলেন, “আপনাদের মধ্যে কেউ কেউ ভারতীয় গণমাধ্যমের (সঙ্গে যুক্ত)। আপনারা জানেন, কত খবর প্রকাশিত হয়। প্রতিদিন সন্ধ্যায় কত ব্রেকিং নিউজ আসে। শুধু দিল্লিতেই অন্তত ২০০টি টিভি চ্যানেল আছে- ইংরেজি, হিন্দি এবং একাধিক ভাষায়।”

“ভারতের বিশালতা সম্পর্কে মানুষের কোনো ধারণা নেই। মানুষের কোনো বোধশক্তি নেই। কিছু অজ্ঞ এনজিওর দ্বারা প্রকাশিত এক-দু’টি প্রতিবেদন পড়ে এবং তারপর প্রশ্ন করে। এ নিয়ে চিন্তা করবেন না। গণতন্ত্র নিয়ে আমরা গর্বিত।”

যৌথভাবে সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প ও নরেন্দ্র মোদী

যৌথভাবে সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প ও নরেন্দ্র মোদী

সাংবাদিক সম্মেলন ও মোদী

সাধারণত গণতান্ত্রিক দেশগুলিতে দ্বিপাক্ষিক সফরের দুই দেশের প্রধানকে হাতে গোনা হলেও গণমাধ্যমের প্রশ্নের মুখোমুখি হতে দেখা যায়। কিন্তু নরেন্দ্র মোদী ক্ষমতায় আসার পর কয়েকটি সফর বাদ দিলে তেমনটা দেখা যায়নি।

তবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ শুরু হওয়ার পরপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখোমুখি হতে দেখা গিয়েছিল মি. মোদীকে। প্রেসিডেন্ট ওবামা এবং জো বাইডেনের সঙ্গেও তাকে যৌথভাবে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে প্রশ্নের উত্তর দিতে দেখা গিয়েছে।

ভারতেও নরেন্দ্র মোদী খুবই কম সংবাদ সম্মেলন করেছেন এবং সেখানেও কোনো সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখোমুখি হন না তিনি।

এদিকে, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে ভারতে বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন উঠেছে। মানবাধিকার সংগঠন থেকে শুরু করে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি- সংবাদমাধ্যমের কণ্ঠস্বর রোধের অভিযোগও তুলেছে।

নরওয়ের ঘটনার পর কংগ্রেসের রাহুল গান্ধী কটাক্ষ করে বলেছেন, “যখন লুকানোর কিছু থাকে না, তখন ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই। যখন বিশ্ব দেখে যে একজন আপসকামী প্রধানমন্ত্রী কয়েকটি প্রশ্নের ভয়ে চলে যাচ্ছেন করছেন, তখন তা ভারতের ভাবমূর্তির ওপর কেমন প্রভাব ফেলে?”

তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মহুয়া মৈত্র এক্স-এ লিখেছেন, “প্রিয় হেলা ল্যাং ভারতের বিরোধী দল এবং লক্ষ লক্ষ ভারতীয়ের পক্ষ থেকে আপনাকে ধন্যবাদ। আপনি সেটাই করেছেন যা আমাদের নিজস্ব গণমাধ্যম ধারাবাহিকভাবে করতে ব্যর্থ হয়েছে – ক্ষমতার অধিকারীদের প্রশ্ন করা এবং জবাবদিহিতা দাবি করা। প্রেস ব্রিফিং বা প্রেস কনফারেন্স – নামেই পার্থক্য। উত্তরও নেই, সত্যও নেই।”

এদিকে, বিজেপির আইটি সেলের প্রধান অমিত মালবিয়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখেছেন , “দুই নেতার যৌথ সংবাদ সম্মেলনে নরওয়ের প্রধানমন্ত্রীও কোনো প্রশ্নের উত্তর দেননি। কিন্তু রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বাধীন উন্মত্ত কংগ্রেস পরিমণ্ডল একজন অসংযত সাংবাদিকের ভিত্তিহীন মন্তব্য উদযাপন করছে।”

বিবিসি নিউজ বাংলা