০৬:০১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬
জকিগঞ্জে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন, অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আহ্বান তেলের বাজারের অদৃশ্য বিপদসীমা জিডিপির কাগুজে স্বস্তি, অর্থনীতির বাস্তব সংকট বাংলাদেশে সামনে খাদ্য সংকট কতটা প্রকট হতে পারে চীনের কূটনৈতিক ভাষা: নীতির চেয়েও শক্তিশালী অস্ত্র কয়লা, পাম অয়েল ও ফেরোঅ্যালয় রপ্তানিতে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ: ইন্দোনেশিয়া কি নতুন একচেটিয়া শক্তির পথে? খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অগ্নিকাণ্ড — আইসিইউর রোগীর মৃত্যু, তিন নার্স লাফ দিলেন তৃতীয় তলা থেকে ঢাকায় প্রতিবেশীর হাতে খুন হলো দ্বিতীয় শ্রেণির মেধাবী ছাত্রী রামিসা — আসামি গ্রেপ্তার টিকার ঘাটতিতে বাড়তে পারে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সের ঝুঁকি: নতুন নীতিপত্রে সতর্কবার্তা পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলের হারে ধাক্কা আঞ্চলিক শক্তিতে

পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলের হারে ধাক্কা আঞ্চলিক শক্তিতে

দুই-তৃতীয়াংশের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে এই রাজ্যে ক্ষমতায় এসেছে বিজেপি৷

ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনে ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেস এবং তামিলনাড়ুতে ডিএমকের পরাজয়ে জোর ধাক্কা খেয়েছে আঞ্চলিক শক্তি৷ দুই বড় দলের লড়াই কি রাজনীতির ভবিতব্য?

ভারতে ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি ধাক্কা খেয়েছিল৷ কংগ্রেসের আসন বেড়ে পৌঁছে গিয়েছিল তিন অঙ্কে৷ কিন্তু বিভিন্ন রাজ্যে কংগ্রেস শক্তিশালী বিজেপির বিরুদ্ধে তেমন প্রতিরোধ করে তুলতে পারছে না৷

ভারতে যে আঞ্চলিক দলগুলি বিজেপির প্রবল প্রতিপক্ষ হিসেবে পরিচিত, তার অন্যতম তৃণমূল কংগ্রেস৷ এই দলের হাতে থাকা দেড় দশকের দুর্গ পশ্চিমবঙ্গের পতন হয়েছে গত চার মে৷

দুই-তৃতীয়াংশের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে এই রাজ্যে ক্ষমতায় এসেছে বিজেপি৷ ৭৭ থেকে তাদের আসন পৌঁছে গিয়েছে ২০৭-এ৷ প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে শুরু করে দলের নিচুতলার নেতারা কার্যত ঘরবন্দি হয়ে গিয়েছেন৷ ঘরোয়া বৈঠকের বাইরে পথেঘাটে তাদের কোনো রাজনৈতিক কার্যকলাপ দেখা যাচ্ছে না বললেই চলে৷

তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বক্তৃতা দিচ্ছেন

ভারতে যে আঞ্চলিক দলগুলি বিজেপির প্রবল প্রতিপক্ষ হিসেবে পরিচিত, তার অন্যতম তৃণমূল কংগ্রেস৷ এই দলের হাতে থাকা দেড় দশকের দুর্গ পশ্চিমবঙ্গের পতন হয়েছে গত চার মে৷

ডিএমকে ও এডিএমকে

দক্ষিণ ভারতের রাজ্য তামিলনাড়ুতে বিজেপি বিশেষ সুবিধা করতে না পারলেও সেখানকার নির্বাচনে দুটি পুরনো আঞ্চলিক দলের পরাজয় হয়েছে৷ বিজেপি বিরোধী ক্ষমতাসীন ডিএমকে এবং এডিএমকে পরাজিত হয়েছে৷ উত্থান হয়েছে নতুন রাজনৈতিক দল টিভিকে-র৷ কংগ্রেসের সমর্থনে তারা সরকার গড়েছে৷

পরাজিত দুটি আঞ্চলিক দল তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে চিরাচরিত প্রতিপক্ষ হিসেবে পরিচিত৷ তারা হারলেও রাজ্যের শাসন ক্ষমতা থেকে গিয়েছে একটি আঞ্চলিক দলের হাতে৷ সেই দলটি একেবারে নবাগত শক্তি হওয়ায় বিজেপি বিরোধী রাজনীতিতে কতটা কার্যকরী ভূমিকা নেবে, সেটা স্পষ্ট নয়৷

অসমে বিজেপি ও কেরলে কংগ্রেস ক্ষমতা দখল করেছে৷ এখানে কোনো আঞ্চলিক দল বিশেষ সুবিধা করতে পারেনি৷

প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী এম কে স্ট্যালিনের সঙ্গে নতুন মুখ্যমন্ত্রী বিজয়

দক্ষিণ ভারতে উত্থান হয়েছে নতুন রাজনৈতিক দল টিভিকে-র৷ কংগ্রেসের সমর্থনে তারা সরকার গড়েছে৷

দুর্বলতর আঞ্চলিক দল

দেশের রাজনৈতিক মানচিত্রের দিকে তাকালে দেখা যাবে, বিজেপি বিরোধী আর মাত্র দুটি দল ক্ষমতায় রয়েছে দুটি রাজ্য৷ পূর্ব ভারতের ঝাড়খণ্ডে শাসন চালাচ্ছে ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চা৷ উত্তর ভারতের পাঞ্জাবে আম আদমি পার্টি ক্ষমতায় রয়েছে৷ এছাড়া পূর্ণাঙ্গ কোনো রাজ্যে আর কোনো আঞ্চলিক দল ক্ষমতায় নেই৷ কাশ্মীর, পুদুচেরি ও উত্তর-পূর্বের কয়েকটি রাজ্যে আঞ্চলিক দলের ক্ষমতা রয়েছে৷

অনেক রাজ্যে বিজেপি আঞ্চলিক দলের সঙ্গে হাত মিলিয়ে সরকার চালায়৷ অন্ধ্রপ্রদেশে তেলুগু দেশম পার্টির সঙ্গে বিজেপির জোট সরকার৷ বিহারে জনতা দল ইউনাইটেডের সঙ্গে তারা সরকার চালাচ্ছে৷ এই ফর্মুলায় পশ্চিম, মধ্য, উত্তর, পূর্ব এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের বিরাট অংশ গেরুয়া শিবিরের নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে৷

উত্তরপ্রদেশে সমাজবাদী পার্টি, বিহারে রাষ্ট্রীয় জনতা দল বিজেপি বিরোধী শক্তি হিসেবে এখনো টিকে রয়েছে৷ বিহারে গত বিধানসভা নির্বাচনে প্রথম লড়েছে প্রশান্ত কিশোরের জনসুরাজ পার্টি৷ কংগ্রেস ভেঙে তৈরি হওয়া তৃণমূল কংগ্রেস, ওয়াইএসআর কংগ্রেস, এনসিপি মূল দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পৃথক আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে৷

ব্যতিক্রম দক্ষিণ ভারত

দক্ষিণ ভারতে কর্ণাটক ছাড়া আর কোথাও বিজেপি সেভাবে প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি৷ এখানকার তিনটি রাজ্য কর্নাটক তেলেঙ্গানা ও কেরালায় এখন কংগ্রেস সরকার৷ কেরালা ও তামিলনাড়ুতে এবারে নির্বাচনে কয়েকটি আসনে বিজেপি জিতলেও উল্লেখযোগ্য শক্তি হয়ে উঠতে পারেনি৷ শুধু কর্নাটকে তারা শাসন ক্ষমতা দখল করতে পেরেছিল৷

তবে এখানে কংগ্রেস দেশের অন্যান্য প্রান্তের মতো ততটা হীনবল নয় একই সঙ্গে শক্তিশালী আঞ্চলিক দলের অস্তিত্ব রয়েছে দক্ষিণ ভারতে৷ এর ফলে বিজেপির জয়যাত্রা থমকে যাচ্ছে দক্ষিণে৷

এই দক্ষিণ ভারত থেকেই বলা চলে আঞ্চলিক দলগুলির জয়যাত্রা শুরু হয়েছিল৷ ১৯৬৭ সালে ডিএমকে জাতীয় দল কংগ্রেসকে হারিয়ে তামিলনাড়ুতে প্রথম সরকার গঠন করে৷ এই রাজ্যে সাতের দশকে ডিএমকে ভেঙে এডিএমকে তৈরি হয়৷ তারপর থেকে গত পাঁচ দশক এই দুই দলের মধ্যে ক্ষমতার হাতবদল হয়েছে৷ যে পরম্পরা এবার ভেঙে দিয়েছে আর একটি আঞ্চলিক দল টিভিকে৷

দ্বিদলীয় ব্যবস্থার ইঙ্গিত 

ভারতের সংবিধান অনুযায়ী এদেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত৷ শুধু কাগজে-কলমে নয়, গত কয়েক দশকে কেন্দ্রে ও বিভিন্ন রাজ্যে একের পর এক জোট সরকার এর মাহাত্ম্য প্রমাণ করেছে৷ কেন্দ্রে এখন যে এনডিএ সরকার ক্ষমতায়, তাতে কোনো একটি দলের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই৷ তবে প্রাদেশিক সরকারগুলিতে একটি দলের আধিপত্য দেখা যাচ্ছে৷

কেন্দ্রে জোট সরকার চালানোর পাশাপাশি বিজেপি ২২টি রাজ্যে সরকার পরিচালনা করছে৷ কোথাও একক ক্ষমতায়, কোথাও শরিক দলের সঙ্গে যৌথভাবে৷ তার বিরুদ্ধে জাতীয় দল হিসেবে একমাত্র কংগ্রেস লড়াইতে আছে৷ এই পরিস্থিতি কি দ্বিমেরু রাজনীতির ইঙ্গিত দিচ্ছে?

সাংবাদিক সুমন ভট্টাচার্য ডিডাব্লিউকে বলেন, ‘‘আমার মনে হয় না যে এখনি এই বাইনারি হয়ে যাবে৷ তামিলনাড়ুতে ডিএমকে হেরেছে ঠিকই, কিন্তু যে দলটি ক্ষমতায় এসেছে, সেই টিভিকে একটি আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল৷ আর তৃণমূলও পশ্চিমবঙ্গে ভোটে হেরেছে, কিন্তু তারা এখনো রাজ্যের দ্বিতীয় বৃহত্তম রাজনৈতিক শক্তি৷ তাই সবটাই দুটি মেরুতে বিভক্ত হবে, এই সিদ্ধান্ত এখনি নেয়া ঠিক নয়৷”

আঞ্চলিক দলগুলির পুনরুত্থান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘‘এটা যে কোনো আঞ্চলিক দলেরই সঙ্কট৷ শুধু তৃণমূল না, শরদ পাওয়ারের দল এনসিপি, অরবিন্দ কেজরিওয়ালের দল আপ-এরও সঙ্কট৷ এরা অতি ডানপন্থী রাজনীতির বিরোধিতায় কংগ্রেসের ভোট ব্যাঙ্কে ভাগ বসিয়ে নিজেদের সমর্থনের ভিত্তি তৈরি করেছে৷ ফলে কংগ্রেসের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক কী হবে, তারা একটা বৃহত্তর জোট তৈরি করতে পারবে কিনা অতি ডানপন্থী রাজনীতির মোকাবিলায়, নিজেদের কতটা আদর্শগত এবং অবস্থানগত ভাবে দৃশ্যমান করতে পারবে, তার উপরে বিষয়টা নির্ভর করবে৷”

টিভিকের মতো নতুন শক্তির উত্থান বা দুর্বল হয়ে পড়া দলগুলির ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনাও রয়েছে৷

রাজনৈতিক বিশ্লেষক, অধ্যাপক রবীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য ডিডাব্লিউকে বলেন, ‘‘ভিন্ন ভিন্ন রাজ্যে আলাদা কারণে ক্ষয় হচ্ছে আঞ্চলিক দলগুলির৷ পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে তৃণমূলের শক্তি যেভাবে ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে, তাতে মনে হচ্ছে, নতুন কোনো শক্তি জায়গা করে নিতে পারে৷ কংগ্রেস-সহ অন্যান্য শক্তির যে পরিসর বাড়ছে, তাতে এদের নেতৃত্বে অন্যান্য আঞ্চলিক দলগুলি জোটবদ্ধ হবে৷ পশ্চিমবঙ্গ ছাড়াও অন্যান্য রাজ্যে এই সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে৷ বিজেপির বিরুদ্ধে কংগ্রেস বা অন্য দলগুলি এককভাবে লড়াই করার জায়গায় নেই৷ আঞ্চলিক দলগুলি কংগ্রেসের পাশে দাঁড়াবে এবং সেই জোট বিজেপির বিরুদ্ধে লড়বে৷ যেখানে আঞ্চলিক দল শক্তিশালী বা প্রধান শক্তি, সেখানে কংগ্রেস তাদের সমর্থন করবে৷”

দুই মেরুর রাজনীতির বিপরীতে ভারতীয় রাজনীতি আগামীতে কোন পথে এগোবে?

সুমন বলেন, ‘‘পশ্চিমবঙ্গ বা গোটা বিশ্বের রাজনীতি এখন অন্য একটা বাইনারিতে চলে গিয়েছে৷ সেটা হচ্ছে হয় আপনি অতি ডানপন্থী অথবা তাদের বিরোধী৷ একটি দল অতি ডানপন্থী রাজনীতির বিরোধিতায় কতটা কুশলী বা কতটা সার্থকভাবে জোট তৈরি করতে পারছে, সেটার উপরে অনেক কিছু নির্ভর করছে৷ কংগ্রেস নিঃসন্দেহে একটা বড় রাজনৈতিক শক্তি, যারা ভারতে অতি ডানপন্থী রাজনীতির বিরুদ্ধে৷ ইংরেজিতে বললে সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট টার্ম ব্যবহার করতে হয়৷ এই অতি ডানপন্থী রাজনীতির বিরুদ্ধে যে বৃহত্তর রাজনৈতিক জোট তৈরি হচ্ছে, তার সঙ্গে তৃণমূল কীভাবে নিজেদের মিশিয়ে দেবে, তার উপরে ভবিষ্যতের রাজনীতি নির্ভর করছে৷”

ডিডাব্লিউ ডটকম

জনপ্রিয় সংবাদ

জকিগঞ্জে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন, অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আহ্বান

পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলের হারে ধাক্কা আঞ্চলিক শক্তিতে

০৪:০৬:০৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬

ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনে ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেস এবং তামিলনাড়ুতে ডিএমকের পরাজয়ে জোর ধাক্কা খেয়েছে আঞ্চলিক শক্তি৷ দুই বড় দলের লড়াই কি রাজনীতির ভবিতব্য?

ভারতে ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি ধাক্কা খেয়েছিল৷ কংগ্রেসের আসন বেড়ে পৌঁছে গিয়েছিল তিন অঙ্কে৷ কিন্তু বিভিন্ন রাজ্যে কংগ্রেস শক্তিশালী বিজেপির বিরুদ্ধে তেমন প্রতিরোধ করে তুলতে পারছে না৷

ভারতে যে আঞ্চলিক দলগুলি বিজেপির প্রবল প্রতিপক্ষ হিসেবে পরিচিত, তার অন্যতম তৃণমূল কংগ্রেস৷ এই দলের হাতে থাকা দেড় দশকের দুর্গ পশ্চিমবঙ্গের পতন হয়েছে গত চার মে৷

দুই-তৃতীয়াংশের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে এই রাজ্যে ক্ষমতায় এসেছে বিজেপি৷ ৭৭ থেকে তাদের আসন পৌঁছে গিয়েছে ২০৭-এ৷ প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে শুরু করে দলের নিচুতলার নেতারা কার্যত ঘরবন্দি হয়ে গিয়েছেন৷ ঘরোয়া বৈঠকের বাইরে পথেঘাটে তাদের কোনো রাজনৈতিক কার্যকলাপ দেখা যাচ্ছে না বললেই চলে৷

তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বক্তৃতা দিচ্ছেন

ভারতে যে আঞ্চলিক দলগুলি বিজেপির প্রবল প্রতিপক্ষ হিসেবে পরিচিত, তার অন্যতম তৃণমূল কংগ্রেস৷ এই দলের হাতে থাকা দেড় দশকের দুর্গ পশ্চিমবঙ্গের পতন হয়েছে গত চার মে৷

ডিএমকে ও এডিএমকে

দক্ষিণ ভারতের রাজ্য তামিলনাড়ুতে বিজেপি বিশেষ সুবিধা করতে না পারলেও সেখানকার নির্বাচনে দুটি পুরনো আঞ্চলিক দলের পরাজয় হয়েছে৷ বিজেপি বিরোধী ক্ষমতাসীন ডিএমকে এবং এডিএমকে পরাজিত হয়েছে৷ উত্থান হয়েছে নতুন রাজনৈতিক দল টিভিকে-র৷ কংগ্রেসের সমর্থনে তারা সরকার গড়েছে৷

পরাজিত দুটি আঞ্চলিক দল তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে চিরাচরিত প্রতিপক্ষ হিসেবে পরিচিত৷ তারা হারলেও রাজ্যের শাসন ক্ষমতা থেকে গিয়েছে একটি আঞ্চলিক দলের হাতে৷ সেই দলটি একেবারে নবাগত শক্তি হওয়ায় বিজেপি বিরোধী রাজনীতিতে কতটা কার্যকরী ভূমিকা নেবে, সেটা স্পষ্ট নয়৷

অসমে বিজেপি ও কেরলে কংগ্রেস ক্ষমতা দখল করেছে৷ এখানে কোনো আঞ্চলিক দল বিশেষ সুবিধা করতে পারেনি৷

প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী এম কে স্ট্যালিনের সঙ্গে নতুন মুখ্যমন্ত্রী বিজয়

দক্ষিণ ভারতে উত্থান হয়েছে নতুন রাজনৈতিক দল টিভিকে-র৷ কংগ্রেসের সমর্থনে তারা সরকার গড়েছে৷

দুর্বলতর আঞ্চলিক দল

দেশের রাজনৈতিক মানচিত্রের দিকে তাকালে দেখা যাবে, বিজেপি বিরোধী আর মাত্র দুটি দল ক্ষমতায় রয়েছে দুটি রাজ্য৷ পূর্ব ভারতের ঝাড়খণ্ডে শাসন চালাচ্ছে ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চা৷ উত্তর ভারতের পাঞ্জাবে আম আদমি পার্টি ক্ষমতায় রয়েছে৷ এছাড়া পূর্ণাঙ্গ কোনো রাজ্যে আর কোনো আঞ্চলিক দল ক্ষমতায় নেই৷ কাশ্মীর, পুদুচেরি ও উত্তর-পূর্বের কয়েকটি রাজ্যে আঞ্চলিক দলের ক্ষমতা রয়েছে৷

অনেক রাজ্যে বিজেপি আঞ্চলিক দলের সঙ্গে হাত মিলিয়ে সরকার চালায়৷ অন্ধ্রপ্রদেশে তেলুগু দেশম পার্টির সঙ্গে বিজেপির জোট সরকার৷ বিহারে জনতা দল ইউনাইটেডের সঙ্গে তারা সরকার চালাচ্ছে৷ এই ফর্মুলায় পশ্চিম, মধ্য, উত্তর, পূর্ব এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের বিরাট অংশ গেরুয়া শিবিরের নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে৷

উত্তরপ্রদেশে সমাজবাদী পার্টি, বিহারে রাষ্ট্রীয় জনতা দল বিজেপি বিরোধী শক্তি হিসেবে এখনো টিকে রয়েছে৷ বিহারে গত বিধানসভা নির্বাচনে প্রথম লড়েছে প্রশান্ত কিশোরের জনসুরাজ পার্টি৷ কংগ্রেস ভেঙে তৈরি হওয়া তৃণমূল কংগ্রেস, ওয়াইএসআর কংগ্রেস, এনসিপি মূল দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পৃথক আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে৷

ব্যতিক্রম দক্ষিণ ভারত

দক্ষিণ ভারতে কর্ণাটক ছাড়া আর কোথাও বিজেপি সেভাবে প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি৷ এখানকার তিনটি রাজ্য কর্নাটক তেলেঙ্গানা ও কেরালায় এখন কংগ্রেস সরকার৷ কেরালা ও তামিলনাড়ুতে এবারে নির্বাচনে কয়েকটি আসনে বিজেপি জিতলেও উল্লেখযোগ্য শক্তি হয়ে উঠতে পারেনি৷ শুধু কর্নাটকে তারা শাসন ক্ষমতা দখল করতে পেরেছিল৷

তবে এখানে কংগ্রেস দেশের অন্যান্য প্রান্তের মতো ততটা হীনবল নয় একই সঙ্গে শক্তিশালী আঞ্চলিক দলের অস্তিত্ব রয়েছে দক্ষিণ ভারতে৷ এর ফলে বিজেপির জয়যাত্রা থমকে যাচ্ছে দক্ষিণে৷

এই দক্ষিণ ভারত থেকেই বলা চলে আঞ্চলিক দলগুলির জয়যাত্রা শুরু হয়েছিল৷ ১৯৬৭ সালে ডিএমকে জাতীয় দল কংগ্রেসকে হারিয়ে তামিলনাড়ুতে প্রথম সরকার গঠন করে৷ এই রাজ্যে সাতের দশকে ডিএমকে ভেঙে এডিএমকে তৈরি হয়৷ তারপর থেকে গত পাঁচ দশক এই দুই দলের মধ্যে ক্ষমতার হাতবদল হয়েছে৷ যে পরম্পরা এবার ভেঙে দিয়েছে আর একটি আঞ্চলিক দল টিভিকে৷

দ্বিদলীয় ব্যবস্থার ইঙ্গিত 

ভারতের সংবিধান অনুযায়ী এদেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত৷ শুধু কাগজে-কলমে নয়, গত কয়েক দশকে কেন্দ্রে ও বিভিন্ন রাজ্যে একের পর এক জোট সরকার এর মাহাত্ম্য প্রমাণ করেছে৷ কেন্দ্রে এখন যে এনডিএ সরকার ক্ষমতায়, তাতে কোনো একটি দলের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই৷ তবে প্রাদেশিক সরকারগুলিতে একটি দলের আধিপত্য দেখা যাচ্ছে৷

কেন্দ্রে জোট সরকার চালানোর পাশাপাশি বিজেপি ২২টি রাজ্যে সরকার পরিচালনা করছে৷ কোথাও একক ক্ষমতায়, কোথাও শরিক দলের সঙ্গে যৌথভাবে৷ তার বিরুদ্ধে জাতীয় দল হিসেবে একমাত্র কংগ্রেস লড়াইতে আছে৷ এই পরিস্থিতি কি দ্বিমেরু রাজনীতির ইঙ্গিত দিচ্ছে?

সাংবাদিক সুমন ভট্টাচার্য ডিডাব্লিউকে বলেন, ‘‘আমার মনে হয় না যে এখনি এই বাইনারি হয়ে যাবে৷ তামিলনাড়ুতে ডিএমকে হেরেছে ঠিকই, কিন্তু যে দলটি ক্ষমতায় এসেছে, সেই টিভিকে একটি আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল৷ আর তৃণমূলও পশ্চিমবঙ্গে ভোটে হেরেছে, কিন্তু তারা এখনো রাজ্যের দ্বিতীয় বৃহত্তম রাজনৈতিক শক্তি৷ তাই সবটাই দুটি মেরুতে বিভক্ত হবে, এই সিদ্ধান্ত এখনি নেয়া ঠিক নয়৷”

আঞ্চলিক দলগুলির পুনরুত্থান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘‘এটা যে কোনো আঞ্চলিক দলেরই সঙ্কট৷ শুধু তৃণমূল না, শরদ পাওয়ারের দল এনসিপি, অরবিন্দ কেজরিওয়ালের দল আপ-এরও সঙ্কট৷ এরা অতি ডানপন্থী রাজনীতির বিরোধিতায় কংগ্রেসের ভোট ব্যাঙ্কে ভাগ বসিয়ে নিজেদের সমর্থনের ভিত্তি তৈরি করেছে৷ ফলে কংগ্রেসের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক কী হবে, তারা একটা বৃহত্তর জোট তৈরি করতে পারবে কিনা অতি ডানপন্থী রাজনীতির মোকাবিলায়, নিজেদের কতটা আদর্শগত এবং অবস্থানগত ভাবে দৃশ্যমান করতে পারবে, তার উপরে বিষয়টা নির্ভর করবে৷”

টিভিকের মতো নতুন শক্তির উত্থান বা দুর্বল হয়ে পড়া দলগুলির ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনাও রয়েছে৷

রাজনৈতিক বিশ্লেষক, অধ্যাপক রবীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য ডিডাব্লিউকে বলেন, ‘‘ভিন্ন ভিন্ন রাজ্যে আলাদা কারণে ক্ষয় হচ্ছে আঞ্চলিক দলগুলির৷ পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে তৃণমূলের শক্তি যেভাবে ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে, তাতে মনে হচ্ছে, নতুন কোনো শক্তি জায়গা করে নিতে পারে৷ কংগ্রেস-সহ অন্যান্য শক্তির যে পরিসর বাড়ছে, তাতে এদের নেতৃত্বে অন্যান্য আঞ্চলিক দলগুলি জোটবদ্ধ হবে৷ পশ্চিমবঙ্গ ছাড়াও অন্যান্য রাজ্যে এই সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে৷ বিজেপির বিরুদ্ধে কংগ্রেস বা অন্য দলগুলি এককভাবে লড়াই করার জায়গায় নেই৷ আঞ্চলিক দলগুলি কংগ্রেসের পাশে দাঁড়াবে এবং সেই জোট বিজেপির বিরুদ্ধে লড়বে৷ যেখানে আঞ্চলিক দল শক্তিশালী বা প্রধান শক্তি, সেখানে কংগ্রেস তাদের সমর্থন করবে৷”

দুই মেরুর রাজনীতির বিপরীতে ভারতীয় রাজনীতি আগামীতে কোন পথে এগোবে?

সুমন বলেন, ‘‘পশ্চিমবঙ্গ বা গোটা বিশ্বের রাজনীতি এখন অন্য একটা বাইনারিতে চলে গিয়েছে৷ সেটা হচ্ছে হয় আপনি অতি ডানপন্থী অথবা তাদের বিরোধী৷ একটি দল অতি ডানপন্থী রাজনীতির বিরোধিতায় কতটা কুশলী বা কতটা সার্থকভাবে জোট তৈরি করতে পারছে, সেটার উপরে অনেক কিছু নির্ভর করছে৷ কংগ্রেস নিঃসন্দেহে একটা বড় রাজনৈতিক শক্তি, যারা ভারতে অতি ডানপন্থী রাজনীতির বিরুদ্ধে৷ ইংরেজিতে বললে সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট টার্ম ব্যবহার করতে হয়৷ এই অতি ডানপন্থী রাজনীতির বিরুদ্ধে যে বৃহত্তর রাজনৈতিক জোট তৈরি হচ্ছে, তার সঙ্গে তৃণমূল কীভাবে নিজেদের মিশিয়ে দেবে, তার উপরে ভবিষ্যতের রাজনীতি নির্ভর করছে৷”

ডিডাব্লিউ ডটকম