০৯:৫৭ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬
প্রশ্নপত্র ফাঁসের ক্ষত ও অনশনের আর্তনাদ: আমরা কবে শুনব ক্ষুধার ভাষা? শুধু শ্রদ্ধা নয়, শহীদ সেনাদের প্রতি রাষ্ট্রের প্রকৃত দায়িত্ব এখনই পালন করতে হবে ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণ পুনঃতফসিলে বিশেষ সুবিধা বাড়াল বাংলাদেশ ব্যাংক আইএমএফের সতর্কবার্তা: প্রবৃদ্ধি ৩.৫%, মধ্যমেয়াদে ৩ শতাংশের নিচে নামার শঙ্কা বাগেরহাটে ঘরে মিলল দম্পতির মরদেহ, পাশে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার দেড় মাসের শিশু বিশ্বকাপের পরাজয়ের যন্ত্রণা নয়, অনুভূতিহীনতাই জীবনের সবচেয়ে বড় হার কালেমার পতাকা ইস্যুতে উগ্রবাদী তৎপরতার প্রমাণ নেই: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী চীনের দল নেই, তবু বিশ্বকাপ জ্বরে উন্মাতাল দেশ; দর্শক, ব্র্যান্ড ও ব্যবসায় নতুন সাফল্যের গল্প বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে ১০৮ কিলোমিটার বেড়া নির্মাণের সিদ্ধান্ত, নিরাপত্তা জোরদারে নতুন উদ্যোগ গভীর সমুদ্র থেকে উঠে এলো শ্যাকলটন ও স্কটের ঐতিহাসিক জাহাজের রহস্যময় ছবি

চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের নতুন বাস্তবতা: সংঘাত নয়, দরকষাকষির যুগ

বিশ্ব রাজনীতিতে অনেক সময় বড় পরিবর্তনগুলো শব্দ করে আসে না। সেগুলো ধীরে ধীরে কূটনীতির ভাষা, বাণিজ্যের অগ্রাধিকার এবং রাষ্ট্রগুলোর আচরণের ভেতর দিয়ে দৃশ্যমান হয়। বর্তমানে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক ঠিক সেই ধরনের এক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কয়েক বছর আগেও দুই দেশের সম্পর্ককে ঘিরে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত শব্দ ছিল “ডিকাপলিং”, “বাণিজ্যযুদ্ধ” কিংবা “প্রযুক্তিগত অবরোধ”। এখন সেই জায়গা দখল করছে আরেক ধরনের বাস্তববাদী রাজনীতি, যেখানে আদর্শিক দ্বন্দ্বের চেয়ে তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক লাভ বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বেইজিং সফর সেই পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। একসময় ওয়াশিংটনের লক্ষ্য ছিল চীনের রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত অর্থনৈতিক কাঠামোকে বদলে ফেলা অথবা অন্তত আন্তর্জাতিক বাণিজ্যব্যবস্থাকে এমনভাবে সাজানো যাতে বেইজিংকে নিয়ম মানতে বাধ্য করা যায়। কিন্তু এখনকার কৌশল ভিন্ন। যুক্তরাষ্ট্র আর চীনের অর্থনৈতিক মডেল পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখছে না; বরং চেষ্টা করছে নিজেদের শিল্প, কৃষি ও জ্বালানি খাতের জন্য দ্রুত দৃশ্যমান সাফল্য নিশ্চিত করতে।

এই পরিবর্তনের পেছনে কেবল কূটনৈতিক হিসাব নয়, মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতাও কাজ করছে। দীর্ঘ আন্তর্জাতিক উত্তেজনা, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত এবং জ্বালানি দামের অস্থিরতা আমেরিকার ভোটারদের মধ্যে ক্লান্তি তৈরি করেছে। এমন পরিস্থিতিতে ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য কয়েক বিলিয়ন ডলারের বোয়িং চুক্তি কিংবা কৃষিপণ্যের বিশাল রপ্তানি সমঝোতা অনেক বেশি কার্যকর রাজনৈতিক বার্তা বহন করে, যা সাধারণ ভোটারের কাছে সরাসরি অর্থনৈতিক স্বস্তির প্রতীক হিসেবে দেখা যায়।

U.S.-China Relations | Council on Foreign Relations

এই কারণেই বর্তমান মার্কিন কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে দৃশ্যমান বাণিজ্যিক ফলাফল। সয়াবিন, গরুর মাংস, জ্বালানি বা বিমান—সবকিছুই এখন বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক সমীকরণের অংশ। আগের মতো শুল্ক আরোপ বা দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে চাপ সৃষ্টি করার বদলে ওয়াশিংটন এখন চায় চীন স্বেচ্ছায় আমেরিকান পণ্য কেনার প্রতিশ্রুতি দিক। অর্থাৎ “শাস্তিমূলক অর্থনীতি” থেকে সম্পর্ক ধীরে ধীরে “লেনদেনভিত্তিক সমঝোতা”-র দিকে যাচ্ছে।

তবে এই বাস্তববাদী অবস্থানকে দুর্বলতা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। বরং এটি এমন এক বিশ্বব্যবস্থার প্রতিফলন, যেখানে চীনের ক্ষমতা আগের তুলনায় অনেক বেশি বিস্তৃত। বেইজিং এখন শুধু উৎপাদনশীল অর্থনীতি নয়; জ্বালানি, সরবরাহব্যবস্থা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা প্রশ্নেও একটি অপরিহার্য শক্তি। মধ্যপ্রাচ্যের সংকটে চীনের ভূমিকা নিয়ে সাম্প্রতিক আলোচনাগুলো সেটিই প্রমাণ করছে। ইরানের প্রধান তেল ক্রেতা হিসেবে বেইজিংয়ের অবস্থান এমন এক প্রভাব তৈরি করেছে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার স্থিতিশীল করার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

ফলে বাণিজ্য ও নিরাপত্তা এখন আর আলাদা বিষয় নয়। তাইওয়ান প্রশ্ন, দক্ষিণ চীন সাগর, মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি প্রবাহ কিংবা প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা—সবকিছু একই আলোচনার টেবিলে চলে এসেছে। এক খাতে ছাড় দিলে অন্য খাতে তার মূল্য চাওয়া হচ্ছে। এই বাস্তবতা আন্তর্জাতিক ব্যবসা ও বিনিয়োগকারীদের জন্যও নতুন সতর্কবার্তা বহন করে। কারণ ভবিষ্যতের বাণিজ্যচুক্তি শুধু অর্থনৈতিক সমঝোতা হবে না; তার সঙ্গে নিরাপত্তা ও কৌশলগত ভারসাম্যের হিসাবও জড়িয়ে থাকবে।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর জন্য এই পরিস্থিতি একই সঙ্গে সুযোগ ও ঝুঁকি তৈরি করছে। একদিকে স্থিতিশীল চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক বৈশ্বিক মন্দার আশঙ্কা কমায়, যা আঞ্চলিক অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক। অন্যদিকে যদি দুই পরাশক্তি নিজেদের মধ্যে সরাসরি সমঝোতার নতুন কাঠামো তৈরি করে, তাহলে ছোট ও মাঝারি অর্থনীতিগুলো সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্র থেকে আরও দূরে সরে যেতে পারে।

Trade Zone: Avoiding World War of Trade -

গত কয়েক বছরে “চায়না প্লাস ওয়ান” কৌশলের কারণে ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম বা মালয়েশিয়ার মতো দেশগুলো উৎপাদন স্থানান্তরের সুবিধা পেয়েছে। কিন্তু যদি ওয়াশিংটন ও বেইজিং এমন সমঝোতায় পৌঁছে, যেখানে চীনের উৎপাদন সক্ষমতা অক্ষুণ্ণ রেখেই বাজার প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা যায়, তাহলে সরবরাহশৃঙ্খল স্থানান্তরের গতি কমে যেতে পারে। তখন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোকে শুধু সস্তা বিকল্প হিসেবে নয়, বরং অবকাঠামো, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে হবে।

এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় সিঙ্গাপুরের মতো দেশগুলোর গুরুত্ব আরও বাড়তে পারে। কারণ “নিয়ন্ত্রিত প্রতিদ্বন্দ্বিতা”-র এই যুগে এমন নিরপেক্ষ আর্থিক ও আইনি প্ল্যাটফর্মের প্রয়োজন হবে, যেখানে বড় শক্তিগুলো নিরাপদে সমঝোতা করতে পারে। বৈশ্বিক বাণিজ্য যদি ক্রমেই বোর্ড, কমিটি ও দ্বিপক্ষীয় ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভরশীল হয়ে ওঠে, তাহলে নির্ভরযোগ্য মধ্যস্থতাকারী রাষ্ট্রের চাহিদাও বাড়বে।

সব মিলিয়ে বিশ্ব এখন এমন এক পর্যায়ে প্রবেশ করছে, যেখানে চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক আর আদর্শিক সংঘাতের একরৈখিক গল্প নয়। বরং এটি স্বার্থ, নিরাপত্তা, জ্বালানি, প্রযুক্তি এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতির জটিল সমন্বয়। দুই দেশই বুঝতে শুরু করেছে যে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নতা বাস্তবসম্মত নয়। তাই প্রতিযোগিতা থাকবে, কিন্তু সেই প্রতিযোগিতা পরিচালিত হবে হিসাবি সমঝোতা ও পারস্পরিক নির্ভরতার মধ্য দিয়ে।

এই নতুন বাস্তবতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—বিশ্ব অর্থনীতি এখন আর শুধু মুক্তবাজারের তত্ত্বে চলছে না; এটি ধীরে ধীরে পরিণত হচ্ছে প্রভাব, দরকষাকষি ও কৌশলগত সমন্বয়ের এক নতুন ব্যবস্থায়। আর সেই ব্যবস্থায় টিকে থাকতে হলে ছোট-বড় সব দেশকেই আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রস্তুত, নমনীয় এবং কৌশলী হতে হবে।

Not Destined for War - TimesKuwait

জনপ্রিয় সংবাদ

প্রশ্নপত্র ফাঁসের ক্ষত ও অনশনের আর্তনাদ: আমরা কবে শুনব ক্ষুধার ভাষা?

চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের নতুন বাস্তবতা: সংঘাত নয়, দরকষাকষির যুগ

০৩:৩৫:১৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬

বিশ্ব রাজনীতিতে অনেক সময় বড় পরিবর্তনগুলো শব্দ করে আসে না। সেগুলো ধীরে ধীরে কূটনীতির ভাষা, বাণিজ্যের অগ্রাধিকার এবং রাষ্ট্রগুলোর আচরণের ভেতর দিয়ে দৃশ্যমান হয়। বর্তমানে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক ঠিক সেই ধরনের এক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কয়েক বছর আগেও দুই দেশের সম্পর্ককে ঘিরে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত শব্দ ছিল “ডিকাপলিং”, “বাণিজ্যযুদ্ধ” কিংবা “প্রযুক্তিগত অবরোধ”। এখন সেই জায়গা দখল করছে আরেক ধরনের বাস্তববাদী রাজনীতি, যেখানে আদর্শিক দ্বন্দ্বের চেয়ে তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক লাভ বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বেইজিং সফর সেই পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। একসময় ওয়াশিংটনের লক্ষ্য ছিল চীনের রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত অর্থনৈতিক কাঠামোকে বদলে ফেলা অথবা অন্তত আন্তর্জাতিক বাণিজ্যব্যবস্থাকে এমনভাবে সাজানো যাতে বেইজিংকে নিয়ম মানতে বাধ্য করা যায়। কিন্তু এখনকার কৌশল ভিন্ন। যুক্তরাষ্ট্র আর চীনের অর্থনৈতিক মডেল পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখছে না; বরং চেষ্টা করছে নিজেদের শিল্প, কৃষি ও জ্বালানি খাতের জন্য দ্রুত দৃশ্যমান সাফল্য নিশ্চিত করতে।

এই পরিবর্তনের পেছনে কেবল কূটনৈতিক হিসাব নয়, মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতাও কাজ করছে। দীর্ঘ আন্তর্জাতিক উত্তেজনা, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত এবং জ্বালানি দামের অস্থিরতা আমেরিকার ভোটারদের মধ্যে ক্লান্তি তৈরি করেছে। এমন পরিস্থিতিতে ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য কয়েক বিলিয়ন ডলারের বোয়িং চুক্তি কিংবা কৃষিপণ্যের বিশাল রপ্তানি সমঝোতা অনেক বেশি কার্যকর রাজনৈতিক বার্তা বহন করে, যা সাধারণ ভোটারের কাছে সরাসরি অর্থনৈতিক স্বস্তির প্রতীক হিসেবে দেখা যায়।

U.S.-China Relations | Council on Foreign Relations

এই কারণেই বর্তমান মার্কিন কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে দৃশ্যমান বাণিজ্যিক ফলাফল। সয়াবিন, গরুর মাংস, জ্বালানি বা বিমান—সবকিছুই এখন বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক সমীকরণের অংশ। আগের মতো শুল্ক আরোপ বা দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে চাপ সৃষ্টি করার বদলে ওয়াশিংটন এখন চায় চীন স্বেচ্ছায় আমেরিকান পণ্য কেনার প্রতিশ্রুতি দিক। অর্থাৎ “শাস্তিমূলক অর্থনীতি” থেকে সম্পর্ক ধীরে ধীরে “লেনদেনভিত্তিক সমঝোতা”-র দিকে যাচ্ছে।

তবে এই বাস্তববাদী অবস্থানকে দুর্বলতা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। বরং এটি এমন এক বিশ্বব্যবস্থার প্রতিফলন, যেখানে চীনের ক্ষমতা আগের তুলনায় অনেক বেশি বিস্তৃত। বেইজিং এখন শুধু উৎপাদনশীল অর্থনীতি নয়; জ্বালানি, সরবরাহব্যবস্থা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা প্রশ্নেও একটি অপরিহার্য শক্তি। মধ্যপ্রাচ্যের সংকটে চীনের ভূমিকা নিয়ে সাম্প্রতিক আলোচনাগুলো সেটিই প্রমাণ করছে। ইরানের প্রধান তেল ক্রেতা হিসেবে বেইজিংয়ের অবস্থান এমন এক প্রভাব তৈরি করেছে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার স্থিতিশীল করার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

ফলে বাণিজ্য ও নিরাপত্তা এখন আর আলাদা বিষয় নয়। তাইওয়ান প্রশ্ন, দক্ষিণ চীন সাগর, মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি প্রবাহ কিংবা প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা—সবকিছু একই আলোচনার টেবিলে চলে এসেছে। এক খাতে ছাড় দিলে অন্য খাতে তার মূল্য চাওয়া হচ্ছে। এই বাস্তবতা আন্তর্জাতিক ব্যবসা ও বিনিয়োগকারীদের জন্যও নতুন সতর্কবার্তা বহন করে। কারণ ভবিষ্যতের বাণিজ্যচুক্তি শুধু অর্থনৈতিক সমঝোতা হবে না; তার সঙ্গে নিরাপত্তা ও কৌশলগত ভারসাম্যের হিসাবও জড়িয়ে থাকবে।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর জন্য এই পরিস্থিতি একই সঙ্গে সুযোগ ও ঝুঁকি তৈরি করছে। একদিকে স্থিতিশীল চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক বৈশ্বিক মন্দার আশঙ্কা কমায়, যা আঞ্চলিক অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক। অন্যদিকে যদি দুই পরাশক্তি নিজেদের মধ্যে সরাসরি সমঝোতার নতুন কাঠামো তৈরি করে, তাহলে ছোট ও মাঝারি অর্থনীতিগুলো সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্র থেকে আরও দূরে সরে যেতে পারে।

Trade Zone: Avoiding World War of Trade -

গত কয়েক বছরে “চায়না প্লাস ওয়ান” কৌশলের কারণে ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম বা মালয়েশিয়ার মতো দেশগুলো উৎপাদন স্থানান্তরের সুবিধা পেয়েছে। কিন্তু যদি ওয়াশিংটন ও বেইজিং এমন সমঝোতায় পৌঁছে, যেখানে চীনের উৎপাদন সক্ষমতা অক্ষুণ্ণ রেখেই বাজার প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা যায়, তাহলে সরবরাহশৃঙ্খল স্থানান্তরের গতি কমে যেতে পারে। তখন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোকে শুধু সস্তা বিকল্প হিসেবে নয়, বরং অবকাঠামো, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে হবে।

এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় সিঙ্গাপুরের মতো দেশগুলোর গুরুত্ব আরও বাড়তে পারে। কারণ “নিয়ন্ত্রিত প্রতিদ্বন্দ্বিতা”-র এই যুগে এমন নিরপেক্ষ আর্থিক ও আইনি প্ল্যাটফর্মের প্রয়োজন হবে, যেখানে বড় শক্তিগুলো নিরাপদে সমঝোতা করতে পারে। বৈশ্বিক বাণিজ্য যদি ক্রমেই বোর্ড, কমিটি ও দ্বিপক্ষীয় ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভরশীল হয়ে ওঠে, তাহলে নির্ভরযোগ্য মধ্যস্থতাকারী রাষ্ট্রের চাহিদাও বাড়বে।

সব মিলিয়ে বিশ্ব এখন এমন এক পর্যায়ে প্রবেশ করছে, যেখানে চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক আর আদর্শিক সংঘাতের একরৈখিক গল্প নয়। বরং এটি স্বার্থ, নিরাপত্তা, জ্বালানি, প্রযুক্তি এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতির জটিল সমন্বয়। দুই দেশই বুঝতে শুরু করেছে যে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নতা বাস্তবসম্মত নয়। তাই প্রতিযোগিতা থাকবে, কিন্তু সেই প্রতিযোগিতা পরিচালিত হবে হিসাবি সমঝোতা ও পারস্পরিক নির্ভরতার মধ্য দিয়ে।

এই নতুন বাস্তবতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—বিশ্ব অর্থনীতি এখন আর শুধু মুক্তবাজারের তত্ত্বে চলছে না; এটি ধীরে ধীরে পরিণত হচ্ছে প্রভাব, দরকষাকষি ও কৌশলগত সমন্বয়ের এক নতুন ব্যবস্থায়। আর সেই ব্যবস্থায় টিকে থাকতে হলে ছোট-বড় সব দেশকেই আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রস্তুত, নমনীয় এবং কৌশলী হতে হবে।

Not Destined for War - TimesKuwait