জাপানের সাইতামা প্রিফেকচারের একটি পুরোনো রেস্তোরাঁ আজও ধরে রেখেছে এক ফরাসি কর্নেলের প্রিয় খাবারের স্বাদ। শত বছরের বেশি পুরোনো সেই রেস্তোরাঁর বিশেষ ‘ফোর কাটলেট’ এখন শুধু একটি জনপ্রিয় খাবারই নয়, বরং জাপানের বিমান চলাচলের শুরুর দিনের এক জীবন্ত স্মৃতিও।
টোকোরোজাওয়া স্টেশন থেকে একটু এগোলেই আবাসিক এলাকার মধ্যে দেখা মেলে একতলা ঐতিহ্যবাহী ভবনের। এখানেই অবস্থিত ‘কাপ্পো মিয়োশি’, যার যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৮৮২ সালে। বাইরে থেকে সাধারণ জাপানি খাবারের দোকান মনে হলেও ভেতরে ঢুকলেই চোখে পড়ে ইতিহাসের নানা স্মৃতি ও খ্যাতিমান অতিথিদের ছবি।
সবচেয়ে বেশি নজর কাড়ে গোঁফওয়ালা এক বিদেশি সামরিক কর্মকর্তার ছবি। তিনি ছিলেন কর্নেল জে.পি. ফোর। ১৯১৯ সালে ফ্রান্স থেকে জাপানে আসা বিমান প্রশিক্ষণ দলের প্রধান ছিলেন তিনি। সেই সময় বিমান প্রযুক্তিতে ফ্রান্স ছিল বিশ্বের অগ্রগামী দেশগুলোর একটি।
জাপানের বিমান ইতিহাসের সঙ্গে জড়ানো এক রেস্তোরাঁ

টোকোরোজাওয়াতেই জাপানের প্রথম বিমানঘাঁটি তৈরি হয়েছিল। সেখানে ফরাসি প্রশিক্ষক দল আধুনিক বিমান চালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের প্রশিক্ষণ দেয় প্রায় এক বছর সাত মাস ধরে। সেই সময় কর্নেল ফোর ও তাঁর সহকর্মীদের খাবারের দায়িত্বে ছিল মিয়োশি রেস্তোরাঁ।
তখন এটি ছিল পাশ্চাত্য ধাঁচের খাবারের দোকান। তৃতীয় প্রজন্মের মালিক কাওয়াতা কিসুকে ফ্রান্সে রান্নার প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন এবং জাহাজেও শেফ হিসেবে কাজ করেছিলেন। তিনি প্রতিদিন অতিথিদের জন্য পরিবেশন করতেন পূর্ণাঙ্গ ফরাসি খাবার।
কিন্তু কিছুদিন পর কর্নেল ফোর বারবার কাটলেট অর্ডার দিতে শুরু করেন। ধারণা করা হয়, দীর্ঘদিন সমৃদ্ধ খাবার খাওয়ার পর তিনি ঘরোয়া স্বাদের সাধারণ খাবারের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েছিলেন।
শত বছরের পুরোনো স্বাদ এখনো অপরিবর্তিত
রেস্তোরাঁর চতুর্থ প্রজন্মের মালিক মিয়োকো জানান, তাঁর বাবা বলতেন কর্নেল ফোর বিশেষভাবে এই কাটলেট পছন্দ করতেন। সেই স্মৃতি ধরে রেখেই খাবারটির নাম রাখা হয় ‘ফোর কাটলেট’।

১৯৯১ সালে বড় সংস্কারের পর রেস্তোরাঁটি জাপানি খাবারের দিকে ঝুঁকলেও ফোর কাটলেটের স্বাদ অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। উন্নত মানের শূকরের মাংস, ইজু ওশিমা দ্বীপের লবণ, বিশেষ ব্রেডক্রাম্ব এবং তামার পাত্রে ভাজার পদ্ধতি আজও অনুসরণ করা হয়।
এই কাটলেটের আরেকটি বিশেষ আকর্ষণ হলো ডেমি-গ্লাস সস। ১২ ধরনের সবজি দীর্ঘ সময় ধরে জ্বাল দিয়ে তৈরি এই সসের রেসিপিও তাইশো যুগ থেকে অপরিবর্তিত রয়েছে।
খাবারের মধ্যেই লুকিয়ে ইতিহাস
খাস্তা ভাজা কাটলেট, ঘন সবজির স্বাদে ভরা সস এবং এক ফরাসি কর্নেলের স্মৃতি—সব মিলিয়ে এই খাবার যেন জাপানের বিমান চলাচলের শুরুর দিনের এক অনন্য গল্প বহন করে চলেছে।
আজও বহু মানুষ শুধু খাবারের স্বাদ নয়, ইতিহাসের স্পর্শ অনুভব করতেই এই রেস্তোরাঁয় ভিড় করেন। শতবর্ষ পেরিয়েও একটি খাবার কীভাবে দুই দেশের সাংস্কৃতিক সম্পর্কের স্মারক হয়ে থাকতে পারে, তারই এক অসাধারণ উদাহরণ এই ফোর কাটলেট।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















