যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে শিক্ষার্থীদের পড়ার দক্ষতা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দেশটিতে ধীরে ধীরে তৈরি হয়েছে এক ধরনের “পড়াশোনা সংকট”, যেখানে মহামারির পরও বেশিরভাগ শিক্ষার্থী আগের মানে ফিরতে পারেনি। কিছু স্কুল জেলায় উন্নতির চিত্র থাকলেও জাতীয় পর্যায়ে পড়ার দক্ষতা এখনও উদ্বেগজনক অবস্থায় রয়েছে।
গবেষকদের মতে, করোনা মহামারির সময় শিক্ষাব্যবস্থায় যে ধাক্কা লেগেছিল, তা আগের থেকেই চলা দুর্বলতাকে আরও গভীর করেছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের লাখো শিক্ষার্থী এখন তাদের শ্রেণি উপযোগী পড়াশোনার মান থেকে পিছিয়ে আছে।
ক্যালিফোর্নিয়ার এক ভিন্নধর্মী উদ্যোগ
ক্যালিফোর্নিয়ার মোডেস্টো শহরের একটি স্কুলে শিক্ষক ন্যান্সি বারাহাস পরীক্ষার আগে শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাস বাড়াতে অভিনব পদ্ধতি ব্যবহার করেন। ক্লাসরুমের আলো কমিয়ে, গান চালিয়ে এবং ডিস্কো বলের আলোয় শিক্ষার্থীদের কিছুক্ষণ নাচতে দেওয়া হয়।

এই উদ্যোগ শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ কমাতে সহায়তা করছে বলে মনে করা হচ্ছে। স্থানীয়ভাবে ওই স্কুলে গণিত ও পড়াশোনার ফলাফলে ধীরে ধীরে উন্নতি দেখা গেছে। তবে সামগ্রিকভাবে শিক্ষার্থীদের অর্জন এখনও প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
জাতীয় চিত্র আরও উদ্বেগজনক
হার্ভার্ড, স্ট্যানফোর্ড ও ডার্টমাউথের গবেষকদের যৌথ বিশ্লেষণে ৩৮টি অঙ্গরাজ্যের পাঁচ হাজারের বেশি স্কুল জেলার তথ্য পর্যালোচনা করা হয়েছে। সেখানে দেখা গেছে, ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে মাত্র পাঁচটি অঙ্গরাজ্য ও ওয়াশিংটন ডিসিতে পড়ার দক্ষতায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে।
অন্যদিকে অধিকাংশ শিক্ষার্থী এখনও মহামারির আগের মানদণ্ডের তুলনায় প্রায় অর্ধেক শ্রেণি পিছিয়ে রয়েছে। গণিতে সামান্য অগ্রগতি হলেও পড়াশোনার ক্ষেত্রে সংকট আরও গভীর।
দীর্ঘদিন ধরেই কমছে পড়ার দক্ষতা

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংকট শুধু মহামারির কারণে তৈরি হয়নি। অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পড়ার ফল ২০১৩ সাল থেকেই কমতে শুরু করে। চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা যায় ২০১৫ সাল থেকে।
গবেষক থমাস কেনের মতে, মহামারি আসলে দীর্ঘদিনের অবনতিকে আরও দ্রুত নিচের দিকে ঠেলে দিয়েছে। তিনি পরিস্থিতিকে “ধীরে ধীরে ক্ষয় হয়ে পরে হঠাৎ ধস নামার মতো” বলে বর্ণনা করেছেন।
কেন কমছে পড়ার অভ্যাস
গবেষকরা কয়েকটি কারণকে এই অবস্থার জন্য দায়ী করছেন। শিশুদের অতিরিক্ত পর্দানির্ভরতা, বই পড়ার অভ্যাস কমে যাওয়া এবং স্কুলে জবাবদিহিতার দুর্বলতা বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে।
অনেক শিশুই এখন অবসর সময়ে বইয়ের বদলে মোবাইল বা অন্যান্য ডিজিটাল মাধ্যমে বেশি সময় কাটায়। ফলে ভাষা ও পড়ার দক্ষতা স্বাভাবিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
কিছু অঙ্গরাজ্যে আশার আলো
লুইজিয়ানা, টেনেসি, কেনটাকি, ইন্ডিয়ানা ও মেরিল্যান্ডের মতো কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে পড়ার দক্ষতা উন্নত হয়েছে। এসব স্থানে ধ্বনিভিত্তিক শিক্ষাপদ্ধতি চালু করা হয়েছে, যেখানে শব্দের গঠন ও উচ্চারণ শেখানোর ওপর জোর দেওয়া হয়।
এছাড়া ডিসলেক্সিয়া শনাক্তকরণ, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ এবং বিশেষ সহায়তামূলক কর্মসূচিও চালু করা হয়েছে। তবে সব জায়গায় এই সংস্কার সমানভাবে সফল হয়নি।
উপস্থিতির ওপর জোর
মিশিগানের ডেট্রয়েট শহরে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত স্কুলে আনার উদ্যোগ ফল দিতে শুরু করেছে। অনুপস্থিত শিক্ষার্থীদের খোঁজে বিশেষ কর্মকর্তারা কাজ করছেন। পাশাপাশি ছোট ছোট দলে আলাদা সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
শিক্ষাবিদদের মতে, শুধু নতুন পদ্ধতি চালু করলেই হবে না, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ, নিয়মিত নজরদারি এবং ধারাবাহিক শিক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। নাহলে যুক্তরাষ্ট্রের এই পড়াশোনা সংকট আরও গভীর হতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















