দেশে টেলিযোগাযোগ খাত সম্প্রসারণ এবং ডিজিটাল সংযোগ আরও শক্তিশালী করতে নতুন সিমের ওপর কর কমানো এবং বদলি সিম ও আইওটি সিমের ওপর বিদ্যমান কর প্রত্যাহারের চিন্তা করছে সরকার। এ নিয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে আলোচনা চলছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
সম্প্রতি বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগে এ বিষয়ে একটি প্রস্তাব পাঠায়। পরে সেটি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে পাঠানো হয়। সরকারের উচ্চপর্যায়ের এক বৈঠকে এসব সুপারিশ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।
বর্তমান কর কাঠামো নিয়ে উদ্বেগ
টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থার মতে, বর্তমানে নতুন সিম চালু করতে মোবাইল অপারেটরদের প্রায় ৭০০ টাকা ব্যয় হয়। এর মধ্যে ৩০০ টাকা সরাসরি সিম কর হিসেবে সরকারকে দিতে হয়। এছাড়া সিম কিট বাবদ প্রায় ৫০ টাকা এবং বাকি অর্থ পরিচালনা, বিপণন, বিতরণ ও অন্যান্য খাতে ব্যয় হয়।
সংস্থাটি বলছে, নতুন গ্রাহক যুক্ত করতে অপারেটরদের বড় অঙ্কের ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। মোট ব্যয়ের প্রায় ৪৩ শতাংশই অনাদায়ী কর হিসেবে সরকারের কাছে চলে যাচ্ছে। ফলে নতুন গ্রাহক সংগ্রহ ব্যবসায়িকভাবে কম লাভজনক হয়ে উঠছে।
গ্রাহকপ্রতি আয় কম, বাড়ছে চাপ
বর্তমানে দেশে মোবাইল অপারেটরদের গড় মাসিক গ্রাহক আয় ১৩০ থেকে ১৫০ টাকার মধ্যে। এই আয় থেকে নতুন গ্রাহক সংগ্রহে হওয়া খরচ তুলতে প্রায় পাঁচ মাস সময় লাগে। তবে ব্যবহার কম হওয়া ও গ্রাহকের স্থায়িত্ব কম থাকায় বাস্তবে এই সময় আরও বেড়ে ছয় থেকে নয় মাস পর্যন্ত হতে পারে।
এ অবস্থায় নিয়ন্ত্রক সংস্থার মতে, বর্তমান করব্যবস্থা টেলিযোগাযোগ বাজারের স্বাভাবিক সম্প্রসারণে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বদলি সিমে করকে ‘দ্বৈত চাপ’
বদলি সিমের ওপর কর আরোপ নিয়েও আপত্তি তুলেছে সংস্থাটি। তাদের মতে, বদলি সিম নতুন গ্রাহক তৈরি করে না কিংবা অপারেটরদের অতিরিক্ত আয়ও আনে না। এটি কেবল বিদ্যমান নম্বর পুনরায় চালুর সুযোগ দেয়।
এ কারণে বদলি সিমে কর আরোপকে এক ধরনের দ্বৈত কর হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে মোবাইল বা সিম হারানো গ্রাহকদের জন্য এটি অপ্রয়োজনীয় আর্থিক চাপ তৈরি করছে বলে মনে করা হচ্ছে।

আইওটি সিমে কর প্রত্যাহারের সুপারিশ
শিল্প, কৃষি, পরিবহন ও স্মার্ট সিটি ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তিনির্ভর সেবা বাড়াতে আইওটি ও মেশিন-টু-মেশিন সিমের ওপর কর পুরোপুরি তুলে দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সাধারণ মোবাইল গ্রাহকের তুলনায় আইওটি সিম থেকে আয় অনেক কম। যেখানে সাধারণ গ্রাহক থেকে মাসে ১৩০ থেকে ১৫০ টাকা আয় হয়, সেখানে আইওটি সিম থেকে আয় হয় মাত্র ২০ থেকে ২৫ টাকা।
এ কারণে উচ্চ করহার অব্যাহত থাকলে এই খাতে বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হতে পারে এবং বড় পরিসরে প্রযুক্তিনির্ভর সেবা চালু করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ডিজিটাল অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা
বিশেষজ্ঞদের মতে, আইওটি সিমে কর কমানো বা তুলে দেওয়া হলে শিল্প স্বয়ংক্রিয়করণ, কৃষি ব্যবস্থাপনা, জ্বালানি খাত, লজিস্টিকস ও স্মার্ট সিটি ব্যবস্থায় প্রযুক্তির ব্যবহার দ্রুত বাড়বে। এতে উৎপাদনশীলতা বাড়ার পাশাপাশি অপচয় কমবে এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এছাড়া আইওটি সেবার বিস্তৃতি বাড়লে ডেটা ব্যবহারের পরিমাণও বৃদ্ধি পাবে, যা পরবর্তীতে ভ্যাট ও সেবাভিত্তিক করের মাধ্যমে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়াতে সহায়ক হতে পারে।
বাংলাদেশে বর্তমানে মোবাইল সেবায় মোট করের চাপ প্রায় ৩৯ শতাংশ, যা বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় বেশি বলে মনে করা হচ্ছে। এই বাস্তবতায় সরকার কর কাঠামো সহজ করলে টেলিযোগাযোগ খাতে নতুন গতি আসতে পারে বলে ধারণা সংশ্লিষ্টদের।
সিম কর কমানোর চিন্তা, বদলি ও আইওটি সিমে কর প্রত্যাহারের আলোচনা টেলিযোগাযোগ খাতে নতুন গতি আনতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















