বিশ্ব রাজনীতির বর্তমান সংকটকে সাধারণত ব্যাখ্যা করা হয় “লিবারেল আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা”-র পতন হিসেবে। অনেকের মতে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী যে বৈশ্বিক কাঠামো যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে গড়ে উঠেছিল, সেটিই এখন দুর্বল হয়ে পড়ছে। কিন্তু এই ব্যাখ্যা আংশিক। কারণ গত আট দশকের তুলনামূলক বৈশ্বিক শান্তির ভিত্তি কেবল আমেরিকান প্রভাব বা পশ্চিমা জোটব্যবস্থা ছিল না। বরং এর পেছনে কাজ করেছিল দুটি গভীর নৈতিক বিশ্বাস—আগ্রাসী যুদ্ধ অগ্রহণযোগ্য এবং সাম্রাজ্যবাদ অচল। আজকের সংকটের আসল উৎস এই দুই বিশ্বাসের অবক্ষয়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে আসা বিশ্ব জানত যুদ্ধের মূল্য কত ভয়াবহ হতে পারে। কোটি কোটি মানুষের মৃত্যু শুধু রাষ্ট্রগুলোকেই নয়, রাজনৈতিক কল্পনাকেও বদলে দিয়েছিল। একই সময়ে এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকাজুড়ে উপনিবেশবিরোধী আন্দোলন বিশ্বকে শিখিয়েছিল যে রাজনৈতিক স্বাধীনতা কেবল ইউরোপীয় শক্তিগুলোর অধিকার নয়। ১৯৪৫ সালে জাতিসংঘ সনদে এই দুই ধারণা—যুদ্ধবিরোধিতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার—প্রথমবারের মতো বৈশ্বিক রাজনৈতিক রূপ পায়।
আজ আমরা এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছি, যখন সেই ঐকমত্য দ্রুত ক্ষয়ে যাচ্ছে। ইউক্রেন, গাজা, সুদান কিংবা ইরান—প্রতিটি সংকট দেখাচ্ছে, যুদ্ধ এখন আর ব্যতিক্রম নয়; বরং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের স্বাভাবিক ভাষায় পরিণত হচ্ছে। পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো নতুন অস্ত্রভান্ডার তৈরি করছে, অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তিগুলো ভেঙে পড়ছে, আর কূটনীতি ক্রমশ প্রতীকী হয়ে যাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অনুপস্থিতি হলো জাতিসংঘের।
কিন্তু জাতিসংঘের এই দুর্বলতা কেবল প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার ফল নয়। মূল সমস্যা হলো, বিশ্ব নিজেই সেই নৈতিক ভিত্তি ভুলে গেছে, যার ওপর এই প্রতিষ্ঠান দাঁড়িয়েছিল। আজ জাতিসংঘকে অনেকেই অকার্যকর আমলাতান্ত্রিক কাঠামো হিসেবে দেখে। অথচ একসময় এই প্রতিষ্ঠানই ছিল বৈশ্বিক সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক মঞ্চ।
শীতল যুদ্ধের যুগে জাতিসংঘের ভূমিকা ছিল অনেক বেশি সক্রিয় ও সৃজনশীল। ১৯৫৬ সালের সুয়েজ সংকটে মহাসচিব ডাগ হামারশোল্ড জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনী গঠন করে ব্রিটেন, ফ্রান্স ও ইসরায়েলকে মিশর আক্রমণ থেকে সম্মানজনকভাবে সরে আসার পথ করে দেন। কিউবা ক্ষেপণাস্ত্র সংকটে উ থান্টের মধ্যস্থতা ওয়াশিংটন ও মস্কোকে সরাসরি যুদ্ধ থেকে ফিরিয়ে আনে। ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ থেকে শুরু করে কঙ্গো সংকট পর্যন্ত বহু ক্ষেত্রে জাতিসংঘ কেবল বিবৃতি দেয়নি; বরং বাস্তব রাজনৈতিক “অফ-র্যাম্প” তৈরি করেছে, যাতে পরাশক্তিগুলো যুদ্ধের ফাঁদ থেকে বেরিয়ে আসতে পারে।
এই ইতিহাস আজ প্রায় বিস্মৃত। কারণ শীতল যুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বে জাতিসংঘকে ধীরে ধীরে ভিন্ন ভূমিকায় ঠেলে দেওয়া হয়। মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান থেকে এটি ক্রমে মানবাধিকার, উন্নয়ন সহায়তা ও সামরিক হস্তক্ষেপের পরিপূরক যন্ত্রে পরিণত হয়। সার্বভৌমত্বের প্রশ্নটি নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত হতে থাকে। সোমালিয়া, লিবিয়া বা যুগোস্লাভিয়ায় হস্তক্ষেপের অভিজ্ঞতা অনেক উন্নয়নশীল দেশের কাছে এমন ধারণা তৈরি করে যে জাতিসংঘ কখনও কখনও বৃহৎ শক্তির কৌশলগত স্বার্থের সম্প্রসারণে ব্যবহৃত হচ্ছে।

ফলে যে নৈতিক অবস্থান একসময় উপনিবেশবিরোধী বিশ্বের কাছে জাতিসংঘকে বৈধতা দিয়েছিল, তা দুর্বল হতে থাকে। ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণ এই সংকটকে আরও গভীর করে। যখন রাশিয়া ইউক্রেনে হামলা চালায়, তখন যুদ্ধবিরোধী বৈশ্বিক ঐকমত্য আগেই ভেঙে পড়েছিল। একইভাবে, নতুন ধরনের ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা আবারও প্রভাবক্ষেত্রের রাজনীতিকে ফিরিয়ে আনছে, যা কার্যত সাম্রাজ্যবাদী মানসিকতার পুনরুত্থান।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই পরিবর্তন শুধু রাষ্ট্রগুলোর নীতিতে নয়; বৈশ্বিক জনমতেও প্রতিফলিত হচ্ছে। যুদ্ধ এখন ক্রমশ নৈতিক ব্যতিক্রমের বদলে রাজনৈতিক বাস্তবতা হিসেবে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠছে। জনপ্রিয় সংস্কৃতি, মিডিয়া এবং রাজনৈতিক বয়ানে আপস, মধ্যস্থতা ও কূটনীতির গল্পগুলো আকর্ষণ হারিয়েছে। নায়ক-খলনায়কের সরল সংঘাতের গল্প বেশি জনপ্রিয়। ফলে শান্তি প্রতিষ্ঠার কঠিন ও ধীর প্রক্রিয়া জনস্মৃতি থেকে মুছে যাচ্ছে।
এখানেই জাতিসংঘের পুরোনো ইতিহাস নতুন গুরুত্ব পায়। কারণ বিশ্ব এখন আবার এমন এক বহুমেরু বাস্তবতায় প্রবেশ করছে, যেখানে কোনো একক শক্তি বৈশ্বিক নিয়ম নির্ধারণ করতে পারবে না। এই বাস্তবতা শীতল যুদ্ধ-পরবর্তী আমেরিকান আধিপত্যের চেয়ে বরং ১৯৫০ থেকে ১৯৮০-এর দশকের আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার সঙ্গে বেশি সাদৃশ্যপূর্ণ। আর সেই সময়ে জাতিসংঘের কার্যকর ভূমিকা সম্ভব হয়েছিল মূলত রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও নৈতিক ঐকমত্যের কারণে।
অতএব সমাধান কেবল নিরাপত্তা পরিষদ সংস্কার বা বাজেট বাড়ানো নয়। আরও মৌলিক কিছু পুনর্গঠন প্রয়োজন—যুদ্ধ ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে বৈশ্বিক রাজনৈতিক কল্পনাকে পুনরুজ্জীবিত করা। রাষ্ট্রগুলোকে আবারও বুঝতে হবে যে দীর্ঘমেয়াদি শান্তির জন্য সার্বভৌম সমতার ধারণা অপরিহার্য। একইভাবে, জাতিসংঘের পরবর্তী নেতৃত্বকে শুধু প্রশাসনিক দক্ষ নয়, সাহসী রাজনৈতিক মধ্যস্থতাকারী হিসেবেও আবির্ভূত হতে হবে।
সবচেয়ে বড় কাজ অবশ্য স্মৃতির পুনর্গঠন। যে প্রজন্ম বিশ্বযুদ্ধ ও উপনিবেশের অপমান সরাসরি দেখেছিল, তারা জানত এই দুই বিপর্যয়ের মূল্য কত ভয়াবহ। আজকের বিশ্ব সেই স্মৃতি হারাচ্ছে। কিন্তু স্মৃতি ছাড়া নৈতিক ঐকমত্য তৈরি হয় না, আর ঐকমত্য ছাড়া কোনো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান টিকে থাকতে পারে না।
বিশ্ব হয়তো আবারও নতুন ধরনের সংঘাতপূর্ণ যুগে প্রবেশ করছে। কিন্তু এই বাস্তবতা অনিবার্য নয়। যুদ্ধ ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে যে বৈশ্বিক নৈতিক কাঠামো একসময় মানবসভ্যতাকে রক্ষা করেছিল, সেটিকে পুনর্গঠন করা এখনও সম্ভব। প্রশ্ন হলো, বিশ্বের রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং জনগণ সেই কল্পনাশক্তি পুনরুদ্ধার করতে পারবে কি না। উ থান্টের সেই বিস্মৃত কূটনীতি কিংবা উপনিবেশমুক্ত বিশ্বের সেই নৈতিক দৃঢ়তা আজ আর ইতিহাসের নস্টালজিয়া নয়; বরং ভবিষ্যৎ টিকিয়ে রাখার প্রয়োজনীয় শর্ত।
থ্যান্ট মিন্ট-ইউ 


















