গণমাধ্যমে কর্মরতদের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বাড়লেও অধিকাংশ ঘটনাই প্রকাশ পায় না। নতুন এক আন্তর্জাতিক গবেষণায় উঠে এসেছে, গণমাধ্যমে যৌন হয়রানির শিকার হওয়া ৬৯ শতাংশ মানুষই কোনো অভিযোগ করেন না। একই সঙ্গে প্রায় প্রতি তিনজনের একজন কর্মক্ষেত্রে কোনো না কোনো ধরনের যৌন হয়রানির অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন।
২১টি দেশের ২ হাজার ৮০০-এর বেশি গণমাধ্যমকর্মীর ওপর পরিচালিত এই গবেষণায় দেখা গেছে, নারী সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মীরা পুরুষদের তুলনায় অনেক বেশি হয়রানির শিকার হন। বিশেষ করে মৌখিক ও অনলাইন হয়রানির ক্ষেত্রে নারীদের ঝুঁকি কয়েকগুণ বেশি।
নারীদের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি

গবেষণায় বলা হয়েছে, নারীরা পুরুষদের তুলনায় গড়ে ২ দশমিক ৪ গুণ বেশি মৌখিক যৌন হয়রানির শিকার হন। অনলাইন হয়রানির ক্ষেত্রেও নারীদের ঝুঁকি প্রায় দ্বিগুণ। শারীরিক হয়রানির ঘটনাও কম নয়। অংশগ্রহণকারীদের এক-চতুর্থাংশ জানিয়েছেন, তারা কোনো না কোনো সময় শারীরিক যৌন হয়রানির মুখোমুখি হয়েছেন।
এ ছাড়া নারী অংশগ্রহণকারীদের ৫ শতাংশ এবং পুরুষদের ৪ শতাংশ নিজেদের ধর্ষণের শিকার হিসেবে উল্লেখ করেছেন। গবেষকরা বলছেন, এসব অভিজ্ঞতা শুধু ব্যক্তিগত মানসিক ক্ষতিই তৈরি করে না, বরং কর্মক্ষেত্রের পরিবেশকেও নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে।
অভিযোগ না করার বড় কারণ ভয়
গবেষণায় উঠে এসেছে, হয়রানির শিকার হলেও অধিকাংশ মানুষ অভিযোগ করতে ভয় পান। বিশেষ করে চাকরি হারানোর আশঙ্কা, পদোন্নতিতে বাধা কিংবা কর্মক্ষেত্রে নেতিবাচক আচরণের ভয়ে অনেকে নীরব থাকেন।
যেসব ঘটনা আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে, তার মধ্যেও মাত্র ৬৫ শতাংশ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগুলো কোনো ব্যবস্থা নিয়েছে। তবে বেশিরভাগ পদক্ষেপই ছিল সীমিত বা অনানুষ্ঠানিক।
গবেষকরা বলছেন, এটি শুধু ব্যক্তিগত নিরাপত্তার বিষয় নয়, বরং সংবাদকক্ষের জবাবদিহি, নেতৃত্ব ও কর্মপরিবেশের বড় সংকটের ইঙ্গিত দেয়।
বাংলাদেশেও উদ্বেগজনক চিত্র
বাংলাদেশে ৩৩৯ জন গণমাধ্যমকর্মীর ওপর করা জরিপে দেখা গেছে, ১৭ শতাংশ কর্মী কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন। যদিও এটি এশিয়ার গড় ১৯ শতাংশের কিছুটা নিচে, তবুও নারী সাংবাদিকদের পরিস্থিতি ছিল অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।
জরিপ অনুযায়ী, নারী সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মীরা পুরুষ সহকর্মীদের তুলনায় প্রায় ছয় গুণ বেশি যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন। প্রায় ৬০ শতাংশ নারী অংশগ্রহণকারী মৌখিক যৌন হয়রানির অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন, যেখানে পুরুষদের ক্ষেত্রে এই হার মাত্র ৯ শতাংশ।

অনলাইন হয়রানির ক্ষেত্রেও পার্থক্য স্পষ্ট। কর্মসংক্রান্ত অনলাইন যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন ৪৮ শতাংশ নারী, বিপরীতে পুরুষদের ক্ষেত্রে তা ১৫ শতাংশ। শারীরিক যৌন হয়রানির অভিজ্ঞতা জানিয়েছেন ২৪ শতাংশ নারী এবং ৪ শতাংশ পুরুষ।
প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, বাংলাদেশে অনেক নারী সাংবাদিক হয়রানির ঘটনা প্রকাশ করেন না। মৌখিক হয়রানির শিকার নারীদের ৫২ শতাংশ জানিয়েছেন, তারা কোনো অভিযোগ করেননি। আবার অভিযোগ করার পরও ৪৩ শতাংশ ক্ষেত্রে নিয়োগদাতারা কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।
গবেষকরা বলছেন, এই পরিস্থিতি গণমাধ্যমে নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে এটি সাংবাদিকতায় নারীদের অংশগ্রহণ ও নেতৃত্বের পথেও প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে।
যৌন হয়রানি প্রতিরোধে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হলেও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধু নীতিমালা নয়, বাস্তব প্রয়োগ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















