বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা শুধু ডিগ্রি দেওয়ার প্রক্রিয়া নয়; এটি মেধা, পরিশ্রম ও চিন্তার পার্থক্যকে চিহ্নিত করার একটি সামাজিক কাঠামো। কিন্তু যখন প্রায় সবাই অসাধারণ ফলাফল পেতে শুরু করে, তখন “অসাধারণ” শব্দটির অর্থই ভেঙে পড়ে। যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রভাবশালী বিশ্ববিদ্যালয় হার্ভার্ড সম্প্রতি যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে—কোর্সভিত্তিক পূর্ণ ‘এ’ গ্রেডের সংখ্যা সীমিত করা—তা শুধু একটি প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয়, বরং উচ্চশিক্ষার গভীর এক সংকটের স্বীকারোক্তি।
বহু বছর ধরে পশ্চিমা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গ্রেড ইনফ্লেশন বা নম্বরের অস্বাভাবিক স্ফীতি নিয়ে আলোচনা চলছিল। শিক্ষকেরা জানতেন যে নম্বর বাস্তব দক্ষতার প্রতিফলন হারাচ্ছে, কিন্তু কেউ এককভাবে কঠোর মূল্যায়নে যেতে সাহস পাননি। কারণ, যে শিক্ষক তুলনামূলক কম নম্বর দেবেন, তাঁর কোর্স শিক্ষার্থীদের কাছে কম জনপ্রিয় হতে পারে। ছাত্রদের অভিযোগ, কোর্স মূল্যায়নের খারাপ স্কোর কিংবা প্রশাসনিক চাপ—সব মিলিয়ে নম্বরের উদারতা একসময় অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে।
এই পরিস্থিতি প্রথম দেখায় শিক্ষার্থীবান্ধব মনে হতে পারে। উচ্চ জিপিএ মানে আত্মবিশ্বাস, ভালো চাকরির সম্ভাবনা, উন্নত উচ্চশিক্ষার সুযোগ। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব উল্টো। যখন অধিকাংশ শিক্ষার্থী একই ধরনের উঁচু নম্বর পায়, তখন প্রকৃত মেধাবীদের আলাদা করে চেনা কঠিন হয়ে পড়ে। আরও বড় সমস্যা হলো, শেখার প্রক্রিয়াটিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যদি শিক্ষার্থীরা জানে যে তুলনামূলক কম পরিশ্রম করেও সর্বোচ্চ গ্রেড পাওয়া সম্ভব, তাহলে গভীরভাবে শেখার প্রণোদনা স্বাভাবিকভাবেই কমে যায়।
শিক্ষাব্যবস্থার উদ্দেশ্য কখনোই কেবল আত্মতুষ্টি তৈরি করা ছিল না। বরং কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করানো, সীমাবদ্ধতা চিনতে শেখানো এবং উৎকর্ষ অর্জনের জন্য প্রতিযোগিতায় উৎসাহিত করাই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত ভূমিকা। অথচ সহজ নম্বরের সংস্কৃতি ধীরে ধীরে সেই কাঠামোকেই দুর্বল করেছে। একসময় যে ‘এ’ গ্রেড বিরল সাফল্যের প্রতীক ছিল, এখন তা অনেক প্রতিষ্ঠানে প্রায় সাধারণ মানদণ্ডে নেমে এসেছে।
হার্ভার্ডের নতুন নীতি এই কারণেই গুরুত্বপূর্ণ। এটি নিখুঁত সমাধান নয়। একটি শ্রেণিতে হয়তো সত্যিই অনেক মেধাবী ও পরিশ্রমী শিক্ষার্থী থাকতে পারে, যাদের সবাই উচ্চ নম্বর পাওয়ার যোগ্য। আবার নির্দিষ্ট অনুপাতে গ্রেড বেঁধে দেওয়ার ফলে কিছু ক্ষেত্রে অন্যায্যতাও তৈরি হতে পারে। কিন্তু নীতিনির্ধারকদের যুক্তি হলো, বর্তমান পরিস্থিতি এতটাই ভারসাম্যহীন হয়ে উঠেছে যে কোনো না কোনো সীমারেখা টানা জরুরি হয়ে পড়েছে।

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে এক ধরনের প্রতিযোগিতা কাজ করে—কে শিক্ষার্থীদের কাছে বেশি আকর্ষণীয় হতে পারে। সহজ গ্রেডিং অনেক সময় সেই প্রতিযোগিতার হাতিয়ার হয়ে ওঠে। একটি প্রতিষ্ঠান যদি কঠোর মূল্যায়ন করে আর অন্যরা নমনীয় থাকে, তাহলে প্রথম প্রতিষ্ঠানটি শিক্ষার্থীদের কাছে কম আকর্ষণীয় হয়ে পড়তে পারে। ফলে সমস্যা শুধু একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নয়; পুরো উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার।
এই বাস্তবতায় নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠান ও উচ্চশিক্ষা ভর্তি কর্তৃপক্ষের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। যখন ট্রান্সক্রিপ্ট প্রকৃত পার্থক্য দেখাতে ব্যর্থ হয়, তখন তারা বিকল্প সূচকের দিকে ঝুঁকে পড়ে—পারিবারিক যোগাযোগ, ব্যয়বহুল ইন্টার্নশিপ, ব্যক্তিগত প্রবন্ধের ভাষাগত চাকচিক্য কিংবা সামাজিক পুঁজি। এতে শিক্ষার প্রকৃত মূল্যায়নের বদলে সুবিধাপ্রাপ্ত শ্রেণির প্রভাব আরও বেড়ে যায়। অর্থাৎ গ্রেড ইনফ্লেশন শুধু নম্বরের মান কমায় না; এটি সমান সুযোগের ধারণাকেও দুর্বল করে।
বর্তমান সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রসার এই সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে। যখন ব্যক্তিগত প্রবন্ধ পর্যন্ত প্রযুক্তির সহায়তায় তৈরি করা সম্ভব, তখন শিক্ষার্থীর প্রকৃত দক্ষতা মূল্যায়নের নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি আরও সীমিত হয়ে যাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে গ্রেডের বিশ্বাসযোগ্যতা হারানো শিক্ষাব্যবস্থার জন্য বিপজ্জনক সংকেত।
অবশ্যই নম্বরই শিক্ষার একমাত্র মাপকাঠি নয়। সৃজনশীলতা, গবেষণার ক্ষমতা, নেতৃত্ব কিংবা সমালোচনামূলক চিন্তা—এসবও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু গ্রেড যদি সম্পূর্ণ অর্থহীন হয়ে পড়ে, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার মৌলিক মূল্যায়ন কাঠামো দুর্বল হয়ে যায়। একটি সমাজ তখন এমন এক অবস্থায় পৌঁছায়, যেখানে সনদ থাকে, কিন্তু দক্ষতার নিশ্চয়তা থাকে না।
হার্ভার্ডের সিদ্ধান্ত হয়তো বিতর্ক তৈরি করবে। শিক্ষার্থীদের একাংশ এটি অযৌক্তিক চাপ হিসেবে দেখবে, কিছু শিক্ষকও আপত্তি তুলবেন। কিন্তু অন্তত একটি বিষয় স্পষ্ট: উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো আর আগের মতো সমস্যাটি অস্বীকার করতে পারছে না। নম্বরের সহজ উদারতা হয়তো স্বল্পমেয়াদে জনপ্রিয়তা এনে দেয়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তা শিক্ষা, মেধা ও ন্যায়সঙ্গত প্রতিযোগিতার ভিত্তিকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে।
যে সমাজ জ্ঞানের মান ধরে রাখতে চায়, তাকে কখনো না কখনো কঠিন মূল্যায়নের পথেই ফিরতে হয়। হার্ভার্ড সেই বাস্তবতাকে স্বীকার করেছে। এখন দেখার বিষয়, অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও কি একই সাহস দেখাতে পারে।
জেসন ফারম্যান ও ডেভিড লাইবসন 


















