আগামী অর্থবছরের জন্য খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের বিতরণ খরচ বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে দেশের বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলো। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের গণশুনানিতে তারা ইউনিটপ্রতি ৮৫ পয়সা থেকে ২ টাকা ৫ পয়সা পর্যন্ত বিতরণ খরচ নির্ধারণের প্রস্তাব তোলে। এতে নতুন করে বিদ্যুতের দাম বাড়ার আশঙ্কা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে ভোক্তাদের মধ্যে।
ঢাকায় কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে দুই দিনের গণশুনানির শেষ দিনে এসব প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়। শুনানিতে সভাপতিত্ব করেন বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ।
বিভিন্ন কোম্পানির আলাদা প্রস্তাব

গণশুনানিতে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড, পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড, ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি, ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি, ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি এবং নর্দার্ন ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি আলাদা আলাদা প্রস্তাব জমা দেয়।
প্রস্তাব অনুযায়ী, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড ইউনিটপ্রতি ৮৫ পয়সা, পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড ১ টাকা ৭৭ পয়সা, ডিপিডিসি ১ টাকা ৫৪ পয়সা, ডেসকো ১ টাকা ৯৮ পয়সা, ওয়েস্ট জোন কোম্পানি ১ টাকা ৩৯ পয়সা এবং নেসকো ২ টাকা ৫ পয়সা বিতরণ খরচ নির্ধারণের দাবি জানায়।
তবে বিইআরসির কারিগরি মূল্যায়ন কমিটি এসব প্রস্তাবের তুলনায় কম খরচের সুপারিশ করেছে। তাদের হিসাবে ছয়টি প্রতিষ্ঠানের গড় নিট বিতরণ খরচ ইউনিটপ্রতি ১ টাকা ২৫ পয়সা হওয়া উচিত।
কারিগরি কমিটির পর্যবেক্ষণ

কারিগরি কমিটির তথ্য অনুযায়ী, আগামী অর্থবছরে মোট বিদ্যুৎ বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৯৫ হাজার ৬১৩ মিলিয়ন ইউনিট। এর বিপরীতে বিতরণ ব্যয় দাঁড়াতে পারে প্রায় ১১ হাজার ৯২৭ কোটি টাকা।
কমিটি আরও জানায়, চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত ছয়টি প্রতিষ্ঠানের মোট গ্রাহক সংখ্যা প্রায় ৪ কোটি ৯৮ লাখ। এর মধ্যে আবাসিক গ্রাহক ৪ কোটি ২৫ লাখের বেশি এবং লাইফলাইন গ্রাহক প্রায় ২ কোটি ৮০ লাখ। এককভাবে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের গ্রাহকই ৩ কোটি ৯১ লাখের বেশি।
এ সময় কারিগরি কমিটি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশও করে। তারা নিম্ন ভোল্টেজ গ্রাহকদের অনুমোদিত লোড ৮০ কিলোওয়াট থেকে ৫০ কিলোওয়াটে নামানোর আগে স্বাধীন প্রভাব মূল্যায়নের কথা বলে। পাশাপাশি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজকে বাণিজ্যিক গ্রাহক হিসেবে বিবেচনা না করার সুপারিশ করা হয়।
এ ছাড়া বস্তি এলাকার গ্রাহকদের জন্য ফ্ল্যাট রেট চালুর বিষয়েও আলোচনা উঠে আসে। আবাসিক সংযোগ ব্যবহার করে বাণিজ্যিকভাবে অটোরিকশা চার্জিং বন্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হয়।

দাম বাড়ানোর বিপক্ষে ক্ষোভ
গণশুনানিতে অংশ নেওয়া ভোক্তা অধিকারকর্মী, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি ও শিক্ষাবিদরা বিদ্যুতের নতুন দাম বৃদ্ধির বিরোধিতা করেন। তাদের অভিযোগ, সিস্টেম লস, প্রকল্প ব্যয়ের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি, অদক্ষতা এবং উচ্চ ক্ষমতা ভাড়া খাতের চাপের কারণেই বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক সংকট তৈরি হয়েছে।
একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক বলেন, জনসেবামূলক খাতে লাভের উদ্দেশ্যে মূল্য নির্ধারণ গ্রহণযোগ্য নয়। বিদ্যুতের দাম ব্যয়ভিত্তিক হওয়া উচিত। অন্যদিকে কয়েকজন বক্তা দরিদ্র গ্রাহকদের জন্য নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত বিনা মূল্যে বিদ্যুৎ দেওয়ার প্রস্তাবও তোলেন।
স্বাধীন বিদ্যুৎকেন্দ্র ও রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে করা চুক্তিগুলো পুনর্বিবেচনার দাবিও উঠে আসে শুনানিতে। বক্তাদের মতে, অতিরিক্ত ক্যাপাসিটি চার্জ দেশের জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পরে
শুনানির শেষে বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, সব মতামত ও নথি পর্যালোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। আগামী ২৩ মে পর্যন্ত লিখিত মতামত জমা দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যতে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানি খাতের যেসব প্রকল্পে বড় আর্থিক দায় তৈরি হতে পারে, সেগুলো পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানোর আগে বিইআরসির মতামত নিতে হবে। বাড়তে থাকা ক্যাপাসিটি পেমেন্টকে তিনি দেশের জন্য ক্ষতিকর বলেও মন্তব্য করেন।
বিদ্যুতের বিতরণ খরচ বাড়ানোর প্রস্তাব ঘিরে নতুন করে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির শঙ্কা তৈরি হয়েছে। গণশুনানির পর এখন সবার নজর বিইআরসির চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দিকে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















