যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে মার্কিন কূটনৈতিক কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত কূটনৈতিক পদ্ধতি ভেঙে গিয়ে এখন সিদ্ধান্ত, বার্তা ও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে হোয়াইট হাউসের ঘনিষ্ঠ একটি ছোট গোষ্ঠী। এতে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোও আগের মতো ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভর করতে পারছে না।
সম্প্রতি ইরানকে ঘিরে ট্রাম্পের কঠোর হুঁশিয়ারির পর ইউরোপের বিভিন্ন দেশ মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের কাছে ব্যাখ্যা চাইলে তারা স্পষ্ট কোনো উত্তর দিতে পারেনি। এতে মিত্র দেশগুলোর মধ্যে উদ্বেগ আরও বেড়ে যায়। কারণ তারা বুঝতে পারছিল না ট্রাম্পের বক্তব্য বাস্তব পদক্ষেপের ইঙ্গিত, নাকি কেবল রাজনৈতিক চাপ তৈরির কৌশল।
কূটনৈতিক শূন্যতা বাড়ছে

বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যুক্তরাষ্ট্রের অর্ধেকেরও বেশি রাষ্ট্রদূত পদ খালি রয়েছে। অনেক দূতাবাসে স্থায়ী রাষ্ট্রদূতের বদলে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা দায়িত্ব পালন করছেন। এতে আন্তর্জাতিক সংকট মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি দুর্বল হয়ে পড়েছে বলে মনে করছেন সাবেক কূটনীতিকরা।
বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির সময় মার্কিন দূতাবাসগুলো পর্যাপ্ত নেতৃত্ব ও সমন্বয় ছাড়া কাজ করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়েও ওয়াশিংটনের নীতিগত অবস্থান নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। অনেক কূটনীতিক দাবি করেছেন, গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট দূতাবাস বা কর্মকর্তাদের সঙ্গে সমন্বয় করা হয়নি।
ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠদের উত্থান
প্রচলিত কূটনৈতিক ব্যবস্থার বাইরে গিয়ে ট্রাম্প এখন বিশেষ দূত ও ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠদের ওপর বেশি নির্ভর করছেন। তার জামাতা জ্যারেড কুশনার ও ব্যবসায়ী স্টিভ উইটকফ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ইস্যুতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। অথচ তাদের অনেকেরই আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক অভিজ্ঞতা নেই।

এ কারণে বিদেশি সরকারগুলোও এখন সরাসরি ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর চেষ্টা করছে। দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের মতো দেশগুলোও আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক চ্যানেলের বাইরে বিকল্প যোগাযোগপথ তৈরি করেছে বলে জানা গেছে।
পররাষ্ট্র দপ্তরে বড় ছাঁটাই
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই পররাষ্ট্র দপ্তরে বড় ধরনের পুনর্গঠন শুরু হয়। হাজার হাজার কর্মকর্তা চাকরি হারিয়েছেন বা স্বেচ্ছায় বিদায় নিয়েছেন। একই সঙ্গে বহু অভিজ্ঞ কূটনীতিককে হঠাৎ ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক অভিজ্ঞতা ও ধারাবাহিকতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আগে যেখানে অভিজ্ঞ ক্যারিয়ার কূটনীতিকরা গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকতেন, এখন সেখানে রাজনৈতিকভাবে অনুগত ব্যক্তিদের নিয়োগ বাড়ছে।

মিত্রদের নতুন কৌশল
ট্রাম্প প্রশাসনের অনিশ্চিত অবস্থানের কারণে ইউরোপ ও এশিয়ার দেশগুলোও নিজেদের কৌশল বদলাচ্ছে। অনেক দেশ এখন ট্রাম্পের বক্তব্যকে সরাসরি প্রতিক্রিয়া না দিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করার নীতি অনুসরণ করছে।
কিছু ইউরোপীয় কূটনীতিক এটিকে “মেরকেল পদ্ধতি” হিসেবে বর্ণনা করছেন। অর্থাৎ প্রকাশ্যে বিরোধিতা না করে ধৈর্য ধরে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া। কারণ প্রকাশ্য প্রতিক্রিয়া দিলে ট্রাম্প আরও কঠোর অবস্থান নিতে পারেন বলে তাদের আশঙ্কা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিবর্তনের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক নেতৃত্বের ধরন বদলে যাচ্ছে। দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক কাঠামোর বদলে এখন ব্যক্তিনির্ভর ও অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগই আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বড় নিয়ামক হয়ে উঠছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















