গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে আবারও ইবোলা সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ায় আতঙ্ক বাড়ছে। দেশটির পূর্বাঞ্চলে নতুন এই প্রাদুর্ভাবে ইতোমধ্যে শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী এবং আন্তর্জাতিক সহায়তা সংস্থাগুলো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করলেও স্থানীয় মানুষের উদ্বেগ ও আতঙ্ক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এক দশক আগে পশ্চিম আফ্রিকায় ভয়াবহ ইবোলা মহামারি থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতা এখন সবচেয়ে বড় শিক্ষা হতে পারে। দ্রুত রোগ শনাক্ত করা, আক্রান্তদের আলাদা রাখা এবং স্থানীয় জনগণের আস্থা অর্জনই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।
বেঁচে ফেরা মানুষের ভয়াবহ স্মৃতি
লাইবেরিয়ার ইবোলা থেকে বেঁচে ফেরা প্যাট্রিক ফ্যালে জানান, মহামারির সময় তিনি স্বাস্থ্য সচেতনতা কর্মী হিসেবে কাজ করতেন। গ্রামের মানুষকে হাত মেলানো, মৃতদেহ ধোয়া কিংবা কাছাকাছি সংস্পর্শ এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিতেন। কিন্তু এক সহকর্মীর জানাজায় গিয়ে নিজেই সতর্কতা ভুলে যান।

কয়েকদিনের মধ্যেই তিনি আক্রান্ত হন। হাসপাতালে নেওয়ার পর চারপাশে শুধু মৃত্যু দেখেছেন। অনেক বন্ধু ও সহকর্মীকে হারিয়েছেন। পরে তার স্ত্রী ও সন্তানও আক্রান্ত হন। স্ত্রী সুস্থ হলেও ছোট ছেলে মারা যায়।
তার মতে, আক্রান্ত জনগোষ্ঠীর সঙ্গে মানবিক আচরণ না করলে ভয় ও অবিশ্বাস আরও বাড়বে। মানুষ যদি মনে করে রোগের কোনো চিকিৎসা নেই, তাহলে তারা চিকিৎসা নিতে এগোবে না।
কঙ্গোতে উত্তেজনা ও আতঙ্ক
বর্তমান প্রাদুর্ভাবে কঙ্গোর কিছু এলাকায় ইবোলা আক্রান্ত সন্দেহে মৃতদের দাফনে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। এতে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। এক পর্যায়ে একটি হাসপাতালে হামলা ও আগুন দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা বলছেন, রোগ নিয়ন্ত্রণে নিরাপদ দাফন প্রক্রিয়া জরুরি হলেও জনগণের সঙ্গে যোগাযোগ আরও শক্তিশালী করতে হবে। স্থানীয় নেতাদের সম্পৃক্ত না করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়বে।
নতুন ধরনের ভাইরাস, নেই কার্যকর টিকা

বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগের বড় কারণ হলো, এবার যে ধরনের ইবোলা ছড়িয়েছে সেটি তুলনামূলক বিরল প্রজাতি। এর বিরুদ্ধে এখনো কার্যকর কোনো অনুমোদিত টিকা বা নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই।
গবেষকরা বলছেন, আগের টিকা এই ধরনের ভাইরাসে পুরোপুরি কাজ করে না। নতুন টিকা তৈরির চেষ্টা চলছে, তবে তা মানুষের ওপর পরীক্ষার পর্যায়ে পৌঁছাতে আরও সময় লাগবে।
বিজ্ঞানীদের মতে, একটি নতুন টিকা তৈরি, পরীক্ষা এবং উৎপাদনে বিপুল অর্থ প্রয়োজন হয়। সেই কারণে ওষুধ কোম্পানিগুলো অনেক সময় এমন রোগে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখায় না।
দ্রুত পদক্ষেপই বড় ভরসা
বিশ্ব স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া ছাড়া পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। আক্রান্তদের শনাক্ত করতে দেরি হলে সংক্রমণ অনেক দূর ছড়িয়ে যেতে পারে।

কঙ্গোর পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে নিরাপত্তাহীনতা, বাস্তুচ্যুতি এবং দুর্বল অবকাঠামো। দেশটির পূর্বাঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা রয়েছে, যা স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করছে।
তবে ইতিবাচক দিকও আছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান ভাইরাসটির মৃত্যুহার আগের কিছু ইবোলা প্রজাতির তুলনায় কম। এছাড়া পরীক্ষামূলক ওষুধ ব্যবহার করে সংক্রমণ ঠেকানোর চেষ্টাও চলছে।
মানুষের আস্থা ফেরানোই বড় চ্যালেঞ্জ
ইবোলা মোকাবিলায় শুধু হাসপাতাল বা ওষুধই যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। মানুষের ভয় দূর করা, গুজব থামানো এবং আক্রান্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানো এখন সবচেয়ে জরুরি।
প্যাট্রিক ফ্যালে বলেন, ইবোলা ভয়ংকর হলেও বেঁচে ফেরা সম্ভব। তাই আতঙ্ক নয়, সচেতনতা এবং সহযোগিতাই পারে নতুন এই সংকট মোকাবিলা করতে।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















