কোরবানির ঈদ সামনে রেখে চাঁদপুরের গরুর হাটগুলোতে এখন জমে উঠেছে কেনাবেচা। জেলার বিভিন্ন খামারে প্রস্তুত করা হয়েছে ৬৬ হাজারের বেশি কোরবানির পশু। স্থানীয় খামারিরা এবার ভালো দামের প্রত্যাশা করলেও বাজারে বাইরের পশু প্রবেশ ও দামের ওঠানামা নিয়ে তাদের মধ্যে রয়েছে উদ্বেগ।
জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চাঁদপুরে এবার কোরবানির জন্য প্রস্তুত রয়েছে ৬৬ হাজার ৯৮টি পশু। এর বিপরীতে জেলার সম্ভাব্য চাহিদা প্রায় ৭৫ হাজার। অর্থাৎ প্রায় ৯ হাজার পশুর ঘাটতি রয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, মৌসুমি ব্যবসায়ী, চরাঞ্চলের খামারি এবং আশপাশের জেলার পশু দিয়ে এই ঘাটতি পূরণ হয়ে যাবে।
স্থানীয় উৎপাদনে ভরসা
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. জ্যোতির্ময় ভৌমিক জানিয়েছেন, এবার কোরবানির পশুর কোনো সংকট হবে না। স্থানীয় খামারিরা পর্যাপ্ত পশু প্রস্তুত করেছেন। পাশাপাশি ছোট খামারি ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরাও বাজারে পশু আনবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রস্তুত পশুর মধ্যে রয়েছে ২৭ হাজার ৩৪৬টি ষাঁড়, ৮ হাজার ৩৬৬টি বলদ, ১০ হাজার ৫৭১টি গাভী, ২৩টি মহিষ, ১৯ হাজার ৩৪৬টি ছাগল এবং ৪৪৬টি ভেড়া।

জমে উঠছে হাটের বেচাকেনা
চাঁদপুরের সফরমালী, বাগাদী চৌরাস্তা, পুরানবাজার ও হাজীগঞ্জের বাকিলা হাট ঘুরে দেখা গেছে, ঈদ সামনে রেখে ইতোমধ্যে জমে উঠেছে পশুর বাজার। বিভিন্ন জেলা থেকে ট্রাকে করে পশু আনা হচ্ছে। তবে অনেক ক্রেতাই স্থানীয়ভাবে লালন-পালন করা গরুর প্রতি বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছেন।
ক্রেতাদের দাবি, গত বছরের তুলনায় এবার গরুর দাম কিছুটা বেশি। বিশেষ করে স্বাস্থ্যবান দেশি ষাঁড়ের দাম বেড়েছে।
তরুণ খামারিদের আগ্রহ
জেলার আটটি উপজেলায় প্রায় ৪ হাজার ১৫৫ জন উদ্যোক্তা এবার কোরবানির পশু পালনে যুক্ত হয়েছেন। এদের বড় অংশই তরুণ খামারি। ঈদ উপলক্ষে জেলায় প্রায় ৩০০টি অস্থায়ী ও স্থায়ী পশুর হাট বসেছে।
অনেক খামারি জানিয়েছেন, কয়েক মাস আগে বাছুর কিনে স্থানীয় খাবার যেমন ঘাস, খড়, ভুসি ও খৈল খাইয়ে তারা পশু মোটাতাজা করেছেন। ছোট ও মাঝারি আকারের গরু স্থানীয় হাটে বিক্রি হলেও বড় আকারের গরু এখন অনলাইনেও বিক্রি হচ্ছে।
ন্যায্য দাম নিয়ে শঙ্কা
খামারিদের বড় উদ্বেগ এখন বাজারদর। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, বাইরের দেশ থেকে বেশি পশু এলে স্থানীয় গরুর দাম কমে যেতে পারে।

সদর উপজেলার নানুপুর গ্রামের খামারি খালেদ খান জানান, তিনি প্রায় ২০ বছর ধরে গরু পালন করছেন। এবারও কয়েকটি ষাঁড় প্রস্তুত করেছেন, যেগুলোর দাম ৯০ হাজার থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকার মধ্যে নির্ধারণ করেছেন। তিনি আশা করছেন, বাজারে অতিরিক্ত বাইরের গরু না এলে ভালো দাম পাওয়া যাবে।
ঘাষিপুর গ্রামের খামারি আহমেদ আলী জানান, তার খামারে ৩২টি গরু রয়েছে। এর মধ্যে সাতটি ষাঁড় সম্পূর্ণ স্থানীয় খাবার খাইয়ে বড় করা হয়েছে।
দামি গরুতেও নজর
কিছু খামারি এবার উচ্চমূল্যের ক্রেতাদের লক্ষ্য করে বড় আকারের গরুও প্রস্তুত করেছেন। মৈশাদী ইউনিয়নের হামানকার্দি গ্রামের নার্গিস বেগম তিনটি বড় ষাঁড় প্রস্তুত করেছেন। এর মধ্যে “রাজা বাবু” নামের একটি গরুর দাম চাওয়া হচ্ছে ১২ লাখ টাকা। আরেকটি “হামানকার্দি কিং”-এর দাম ধরা হয়েছে ১০ লাখ টাকা। ছোটটির সম্ভাব্য দাম প্রায় ৫ লাখ টাকা।
খামারের কর্মীরা জানিয়েছেন, কোনো ধরনের কৃত্রিম উপায়ে মোটাতাজা না করে প্রাকৃতিকভাবে পশুগুলো পালন করা হয়েছে। প্রতিদিন বিশেষ যত্ন নিয়ে গরুগুলো বড় করা হচ্ছে।

স্থানীয় গরুর চাহিদা বেশি
অনেক ক্রেতা এখন স্থানীয় খামারের গরুর প্রতি বেশি আস্থা রাখছেন। তাদের মতে, বাইরের কিছু ব্যবসায়ী রাসায়নিক ব্যবহার করে পশু মোটাতাজা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এজন্য স্থানীয়ভাবে পালন করা গরুর চাহিদা বাড়ছে।
ঈদের হাটে সুষ্ঠু বেচাকেনা নিশ্চিত করতে প্রাণিসম্পদ বিভাগের পক্ষ থেকে ভ্রাম্যমাণ টিম কাজ করবে বলেও জানানো হয়েছে। এসব টিমে ভেটেরিনারি চিকিৎসক থাকবেন এবং জাল টাকা শনাক্তসহ বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে কাজ করবেন।
চাঁদপুরের কোরবানির হাটে ৬৬ হাজারের বেশি পশু প্রস্তুত। ন্যায্য দাম ও স্থানীয় গরুর চাহিদা নিয়ে আশাবাদী খামারিরা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















