মোনালিসা থেকে শুরু করে রুবেন্সের আঁকা নারীচিত্র—শিল্পকলার ইতিহাসে এমন অসংখ্য বিখ্যাত সৃষ্টি রয়েছে যেখানে ভরাট শরীরের নারীদের সৌন্দর্যের প্রতীক হিসেবে দেখানো হয়েছে।
একটি নতুন গবেষণায় বলা হয়েছে, স্থূলতা নিয়ে চিকিৎসকদের বর্তমান দৃষ্টিভঙ্গি আরও মানবিক ও সহানুভূতিশীল হতে পারে যদি তারা শিল্পকলায় স্থূলতার ইতিবাচক উপস্থাপনাগুলো থেকে শিক্ষা নেন। গবেষণাটি আরও বলছে, ভবিষ্যতের প্রতিকৃতিগুলো হয়তো ওজন কমানোর ইনজেকশনের প্রভাবে বদলে যাবে, যেখানে দ্রুত ওজন ঝরার ফলে তৈরি হওয়া কৃশ চেহারা শিল্পে বেশি দেখা যেতে পারে।
টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসক ড. মাইকেল ইয়াফি শত শত বছরের শিল্প ইতিহাস বিশ্লেষণ করে সৌন্দর্যের ধারণা ও স্থূলতার প্রবণতার পরিবর্তন খুঁজে দেখেছেন। তার মতে, লিওনার্দো দা ভিঞ্চির ষোড়শ শতকের বিখ্যাত চিত্রকর্মের হাস্যোজ্জ্বল নারী মোনালিসা সম্ভবত অতিরিক্ত ওজনের ছিলেন এবং তার উচ্চ কোলেস্টেরল ও থাইরয়েডজনিত সমস্যা থাকতে পারে।
ইয়াফি বলেন, অতীতে শিল্পকলায় স্থূলতা ছিল সমৃদ্ধি, সম্পদ, সৌন্দর্য, ক্ষমতা ও সামাজিক মর্যাদার প্রতীক। গত শতকের দ্বিতীয়ার্ধে চিকিৎসাবিজ্ঞানে অতিরিক্ত চর্বির সঙ্গে হৃদরোগ ও ডায়াবেটিসের সম্পর্ক আবিষ্কারের পরই এই ধারণা বদলাতে শুরু করে।

তার ভাষায়, “এরপর থেকেই অস্বাভাবিক রকমের রোগা নারী-পুরুষকে সৌন্দর্যের প্রতীক বানানো হয় এবং স্থূলতাকে নেতিবাচকভাবে দেখা শুরু হয়। যেসব নারী শতাব্দীর পর শতাব্দী শিল্পীদের অনুপ্রেরণা ছিলেন, তারা হঠাৎ করেই আর আকর্ষণীয় বলে বিবেচিত হলেন না।”
ইস্তাম্বুলে ইউরোপিয়ান কংগ্রেস অন ওবেসিটিতে বক্তব্য দিতে গিয়ে ইয়াফি বলেন, “স্থূলতার ইতিহাস খুবই আকর্ষণীয়। আজ যেটিকে অনেকে নেতিবাচকভাবে দেখেন, অতীতে সেটিই ছিল মর্যাদার প্রতীক। শক্তিশালী পুরুষ, শাসক, রাজপরিবার, ধর্মীয় নেতা—সমাজের প্রভাবশালী মানুষদের উচ্চ দেহভর সূচকসহ উপস্থাপন করা হতো। সুন্দরী নারী ও মডেলদেরও ভরাট গড়নে আঁকা হতো। এখনকার মডেলরা প্রায় অপুষ্টির পর্যায়ে চলে গেছে, যা মোটেও স্বাস্থ্যকর নয়।”
ইয়াফি শিল্পকলার ইতিহাসে ভরাট শরীরের নারীদের উপস্থাপনার কয়েকটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ তুলে ধরেন। এর মধ্যে সবচেয়ে পুরোনো উদাহরণগুলোর একটি হলো ‘ভেনাস অব উইলেনডর্ফ’—প্রায় ২৪ হাজার থেকে ৩২ হাজার বছর আগের একটি পাথরের মূর্তি, যেখানে এক নারীর বড় নিতম্ব ও স্তন ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
মধ্যযুগের ধর্মীয় শিল্পে শিশু ও ফেরেশতাদেরও বাড়তি মেদসহ দেখানো হতো। পরে সপ্তদশ শতকের বারোক যুগে ফ্লেমিশ চিত্রশিল্পী পিটার পল রুবেন্স তার ভরাট নারীমূর্তির জন্য বিখ্যাত হয়ে ওঠেন। তার ‘ভেনাস ইন ফ্রন্ট অব দ্য মিরর’ চিত্রটি তখন সৌন্দর্যের চূড়ান্ত প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হতো। উনিশ শতকে ফরাসি শিল্পী পিয়ের-অগুস্ত রেনোয়া তার নগ্ন নারীচিত্রে এই ‘রুবেন্সীয়’ ধারা অনুসরণ করেন।
ইয়াফির মতে, পৃথিবীর সবচেয়ে বিখ্যাত চিত্রকর্ম মোনালিসাতেও “অতিরিক্ত শরীরের মেদ” স্পষ্ট। ধারণা করা হয়, ছবির নারীটি ছিলেন ইতালীয় নারী লিসা দেল জিওকোন্দো, যিনি লিসা গেরারদিনি নামেও পরিচিত।

তিনি বলেন, “তাকে নিয়ে নানা তত্ত্ব রয়েছে। সাম্প্রতিক একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, তার দেহভর সূচক বেশি ছিল এবং তিনি তীব্র হাইপোথাইরয়েডিজমে ভুগছিলেন।”
ইয়াফির ব্যাখ্যায়, মোনালিসার ত্বকের হলদেটে আভা শরীরে কেরাটিনের মাত্রা বৃদ্ধির লক্ষণ হতে পারে, যা থাইরয়েডের সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত এবং স্থূলতার কারণ হতে পারে।
তবে তিনি এটাও স্বীকার করেন, “আমরা নিশ্চিতভাবে কিছু বলতে পারি না, কারণ তাকে পরীক্ষা করার সুযোগ নেই। আমরা শুধু তার চেহারার বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করছি। আরও সহজ ব্যাখ্যা হতে পারে, তিনি গর্ভধারণের কারণে ওজন বাড়িয়েছিলেন। তখন পর্যন্ত তার চার সন্তান ছিল। শিল্প ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত এই চিত্র নিয়ে চিকিৎসাবিষয়ক নানা গবেষণা হয়েছে। বিষয়টি আমার কাছে মজার মনে হয়।”
ইয়াফি মনে করেন, চিকিৎসকদের উচিত শিল্পকলায় স্থূলতার ইতিবাচক উপস্থাপনাগুলো থেকে শিক্ষা নেওয়া। তার ভাষায়, “যদি চিকিৎসকেরা বোঝেন যে শতাব্দীর পর শতাব্দী স্থূলতাকে ইতিবাচকভাবে দেখা হতো, তাহলে তারা রোগীদের প্রতি কম বিচারমূলক এবং বেশি সহানুভূতিশীল হতে পারবেন। এতে রোগীদের সামগ্রিক চিকিৎসাও ভালো হবে।”
তিনি আরও বলেন, ওজন কমানোর ইনজেকশন যেমন ওজেম্পিক, ওয়েগোভি ও মুনজারোর জনপ্রিয়তা ভবিষ্যতের শিল্পকলাকেও প্রভাবিত করতে পারে। তার ধারণা, দ্রুত ওজন কমার ফলে মুখের যে কৃশ ও ক্লান্ত চেহারা তৈরি হয়, সেটিও ভবিষ্যতের শিল্পে জায়গা পাবে।
এই পরিবর্তিত মুখাবয়বে গালের মেদ কমে যায়, চোখের নিচ ও কপালের অংশ বসে যায়, বলিরেখা স্পষ্ট হয় এবং ত্বক ঢিলে দেখায়। নাটকীয়ভাবে ওজন কমানোর পর শ্যারন ও কেলি অসবোর্নকে অনেকে এই পরিবর্তনের উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
ইয়াফি বলেন, “মানুষ এখন এই পরিবর্তন নিয়ে কথা বলছে, প্লাস্টিক সার্জনেরা এটি নথিভুক্ত করছেন। আরও বেশি মানুষ এই ওষুধ ব্যবহার করলে শিল্পকলাতেও এই মুখাবয়ব দেখা যাবে। পিকাসো যদি আজ বেঁচে থাকতেন, আমি নিশ্চিত তিনি এটি এঁকে ফেলতেন।”

এলিনর হেওয়ার্ড 

















