দেশের অর্থনীতিতে সবচেয়ে বড় অথচ নীরব চাপের নাম এখন মধ্যবিত্ত। একদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, অন্যদিকে স্থবির আয়— এই দুইয়ের চাপে শহর ও গ্রামের অসংখ্য মধ্যবিত্ত পরিবার এখন টিকে থাকার লড়াইয়ে ব্যস্ত। চাকরিজীবী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি, শিক্ষক, ব্যাংক কর্মকর্তা কিংবা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা প্রতিদিনের ব্যয় সামাল দিতে গিয়ে ক্রমেই সঞ্চয় হারাচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মধ্যবিত্ত এখন এমন এক অবস্থায় পৌঁছেছে যেখানে মাসিক আয় দিয়ে মৌলিক ব্যয় মেটানোই কঠিন হয়ে উঠছে। খাদ্যপণ্যের দাম, চিকিৎসা, শিক্ষা, বাড়িভাড়া, পরিবহন, বিদ্যুৎ-গ্যাস-পানির বিল— সবকিছুর খরচ বেড়ে যাওয়ায় এই শ্রেণির মানুষ সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছেন।
মূল্যস্ফীতির দীর্ঘ ছায়া
গত দুই বছরের বেশি সময় ধরে দেশের বাজারে উচ্চ মূল্যস্ফীতি অব্যাহত রয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল মাসে মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ০৪ শতাংশে। বিশেষ করে খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের দাম আরও বেশি বেড়েছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, পরিবহন ব্যয়, ডলারের বিনিময় হার, আমদানি খরচ এবং সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা একসঙ্গে মূল্যস্ফীতিকে আরও তীব্র করেছে। ফলে আগে যে পরিবার ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকায় মাস চালাতে পারতো, এখন একই ব্যয় মেটাতে প্রয়োজন হচ্ছে ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা। অথচ সেই অনুপাতে আয় বাড়েনি।
বাড়িভাড়া ও নগরজীবনের বাড়তি চাপ
ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতে বাড়িভাড়া এখন মধ্যবিত্তের অন্যতম বড় সংকট। বাড়িভাড়ার পাশাপাশি বেড়েছে বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি, ইন্টারনেট ও সার্ভিস চার্জ। অনেক পরিবারের মোট আয়ের ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত চলে যাচ্ছে শুধু বাসাভাড়ার পেছনে।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৫ বছরে রাজধানীতে বাড়িভাড়া বেড়েছে প্রায় ৪০০ শতাংশ। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে ছোট বাসায় উঠছে, আবার কেউ কেউ খরচ কমাতে পরিবারকে গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে দিচ্ছেন।

চিকিৎসা ব্যয় এখন আতঙ্ক
স্বাস্থ্য খাতের ব্যয় মধ্যবিত্তের জন্য সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার জায়গাগুলোর একটি হয়ে উঠেছে। বেসরকারি হাসপাতাল, ওষুধ, ডায়াগনস্টিক টেস্ট ও চিকিৎসা ব্যয় কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একটি বড় রোগ পুরো পরিবারকে আর্থিক সংকটে ফেলে দিচ্ছে।
গবেষণা বলছে, দেশে চিকিৎসা ব্যয়ের বড় অংশ মানুষকে নিজের পকেট থেকেই বহন করতে হয়। ক্যানসার, হৃদরোগ ও কিডনি রোগের চিকিৎসা করতে গিয়ে অনেক পরিবার সঞ্চয় ভাঙছে, ঋণ নিচ্ছে, এমনকি সম্পদ বিক্রিও করছে।
শিক্ষা ব্যয়েও বাড়ছে চাপ
মধ্যবিত্ত পরিবারের বড় স্বপ্ন সন্তানদের ভালো শিক্ষা নিশ্চিত করা। কিন্তু স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ফি, কোচিং, বই, পরিবহন ও ডিজিটাল ডিভাইসের খরচ কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ায় শিক্ষা ব্যয়ও এখন বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইউনেস্কোর তথ্য অনুযায়ী, দেশের শিক্ষা খাতের মোট ব্যয়ের বড় অংশই পরিবারগুলোকে নিজেদের বহন করতে হয়। ফলে অনেক পরিবার অন্য প্রয়োজনীয় খরচ কমিয়ে সন্তানদের পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছে।
চাকরির অনিশ্চয়তা ও সঞ্চয় সংকট
বেসরকারি খাতে কর্মরত অনেকের অভিযোগ, মূল্যস্ফীতির তুলনায় বেতন বাড়ছে না। ব্যাংক, তথ্যপ্রযুক্তি, মিডিয়া ও সেবা খাতের কর্মীদের মধ্যে চাকরি হারানোর শঙ্কাও বাড়ছে। একই সঙ্গে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের মধ্যে বেকারত্বও উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে।
অন্যদিকে আমানতের প্রকৃত মুনাফা কমে যাওয়ায় সঞ্চয়ের আগ্রহ কমছে। অনেক পরিবার ক্রেডিট কার্ড, ব্যক্তিগত ঋণ বা ধারদেনার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, মধ্যবিত্তের সঞ্চয় কমে যাওয়া দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্যও অশনিসংকেত।
সামনে আরও কঠিন সময়?
বিশ্লেষকদের মতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ব্যয় কমানো এবং মধ্যবিত্তবান্ধব নীতি গ্রহণ না করা হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। কারণ মধ্যবিত্তই দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। এই শ্রেণি দুর্বল হয়ে পড়লে ভোগব্যয় কমবে, সঞ্চয় কমবে এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
মধ্যবিত্তের নীরব এই সংকট এখন শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, বরং সামাজিক ও মানসিক অস্থিরতারও বড় কারণ হয়ে উঠছে।
মেটা বর্ণনা: মূল্যস্ফীতি, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও শিক্ষা ব্যয়ের চাপে দেশের মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো এখন সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক সংকটে।
Sarakhon Report 



















