পৃথিবীর সমুদ্র এখনও মানুষের কাছে এক বিশাল অজানা রহস্য। সেই রহস্যের আরও একটি পর্দা সরালেন বিজ্ঞানীরা। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে বিশ্বের বিভিন্ন সমুদ্র অঞ্চল থেকে ১ হাজার ১২১টি নতুন সামুদ্রিক প্রাণীর সন্ধান পেয়েছেন গবেষকরা। বিজ্ঞানীদের ভাষায়, সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য বোঝা এবং তা সংরক্ষণের লড়াইয়ে এটি একটি বড় অগ্রগতি।
এই আবিষ্কার সম্ভব হয়েছে ‘ওশান সেনসাস নোভা’ নামে নতুন একটি উন্মুক্ত তথ্যভান্ডারের মাধ্যমে। এটি নতুন সামুদ্রিক প্রাণী শনাক্ত ও নথিভুক্ত করার কাজকে দ্রুততর করেছে। দ্য নিপ্পন ফাউন্ডেশন–নেকটন ওশান সেনসাসের নেতৃত্বে পরিচালিত এই বৈশ্বিক উদ্যোগে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানীরা অংশ নেন। এর আওতায় ১৩টি সমুদ্র অভিযান এবং ৯টি বিশেষ প্রজাতি অনুসন্ধান কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়।
গভীর সমুদ্রের বিস্ময়
বিজ্ঞানীরা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৬ হাজার ৫৭৫ মিটার গভীর পর্যন্ত অনুসন্ধান চালিয়ে নতুন প্রাণীগুলোর সন্ধান পান। আবিষ্কৃত প্রাণীদের মধ্যে রয়েছে গভীর সমুদ্রের রহস্যময় ‘ঘোস্ট শার্ক’, আগ্নেয়গিরির নিচের সিমাউন্ট এলাকায় বসবাসকারী বিশেষ ধরনের কৃমি, নতুন প্রজাতির প্রবাল, কাঁকড়া, চিংড়ি, সামুদ্রিক অ্যানিমোন ও সি আরচিন।

গবেষকদের মতে, পৃথিবীর সমুদ্রের প্রায় ৯০ শতাংশ প্রাণী এখনও অজানা। ফলে এই নতুন আবিষ্কার শুধু জীববৈচিত্র্যের ব্যাপকতাই তুলে ধরছে না, একই সঙ্গে সমুদ্র সংরক্ষণে বৈজ্ঞানিক তথ্যভান্ডার তৈরির প্রয়োজনীয়তাও সামনে আনছে।
সময়ের বিরুদ্ধে দৌড়
ওশান সেনসাসের বিজ্ঞানবিষয়ক প্রধান ড. মিশেল টেইলর বলেন, বহু প্রাণী বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার আগেই সেগুলোকে শনাক্ত ও নথিভুক্ত করা এখন সময়ের বিরুদ্ধে দৌড়ের মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে হাজার হাজার প্রাণী বৈজ্ঞানিকভাবে ‘অচিহ্নিত’ অবস্থায় ছিল, কারণ আবিষ্কারের গতি প্রয়োজনের তুলনায় অনেক ধীর ছিল। নতুন এই পদ্ধতি সেই জট ভাঙতে সাহায্য করছে।
তিনি আরও বলেন, নতুন প্রাণীর সন্ধান শুধু বৈজ্ঞানিক কৌতূহল মেটানোর বিষয় নয়, বরং এটি ভবিষ্যৎ বৈশ্বিক নীতি ও সমুদ্র ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

রহস্যময় ‘ঘোস্ট শার্ক’
নতুন আবিষ্কৃত প্রাণীদের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত একটি হলো ‘ঘোস্ট শার্ক’ নামে পরিচিত কাইমেরা প্রজাতির মাছ। অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ড উপকূলের কোরাল সি মেরিন পার্ক এলাকায় সিএসআইআরও অভিযানের সময় এটি শনাক্ত করেন ট্যাক্সোনমিস্ট ড. উইলিয়াম হোয়াইট।
এই প্রাণীগুলো হাঙর ও রে মাছের দূর সম্পর্কের আত্মীয়। প্রায় ৪০ কোটি বছর আগে এদের বিবর্তনীয় ধারা আলাদা হয়ে যায়, অর্থাৎ ডাইনোসরেরও বহু আগে এদের অস্তিত্ব ছিল।
কাচের দুর্গে বসবাসকারী কৃমি
জাপানের ওশান সেনসাস অভিযানে আগ্নেয়গিরির নিচের সিমাউন্ট এলাকায় একটি বিশেষ ধরনের পলিকিট কৃমির সন্ধান পাওয়া যায়। এটি ‘গ্লাস স্পঞ্জ’-এর ভেতরে বাস করে, যাকে বিজ্ঞানীরা ‘গ্লাস ক্যাসেল’ বা কাচের দুর্গ বলে অভিহিত করেছেন। গ্লাস স্পঞ্জের কঙ্কাল তৈরি হয় স্ফটিকধর্মী সিলিকা দিয়ে।

চিকিৎসাবিজ্ঞানে সম্ভাবনা
নতুন আবিষ্কৃত রিবন ওয়ার্ম বা ফিতা কৃমিও বিজ্ঞানীদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে। এর উজ্জ্বল রঙ শিকারিদের সতর্ক করার সংকেত হিসেবে কাজ করে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গবেষকদের মতে, এই প্রাণীর দেহে থাকা কিছু রাসায়নিক বিষ ভবিষ্যতে আলঝেইমার ও সিজোফ্রেনিয়ার মতো রোগের চিকিৎসায় সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।
ভূমধ্যসাগরেও নতুন আবিষ্কার
ফ্রান্সের মার্সেই উপকূলের একটি সমুদ্রগুহায় নতুন প্রজাতির চিংড়ির সন্ধানও গবেষকদের বিস্মিত করেছে। উজ্জ্বল কমলা রঙের দাগ ও জটিল অঙ্গপ্রত্যঙ্গবিশিষ্ট এই প্রাণীটি দেখিয়েছে, ইউরোপের বহুল পরিচিত সমুদ্র অঞ্চলগুলোতেও এখনও নতুন প্রাণীর সন্ধান পাওয়া সম্ভব।
সমুদ্রের অজানা প্রাণী আবিষ্কার
সমুদ্রের গভীরে এক বছরে ১ হাজার ১২১ নতুন প্রাণীর সন্ধান পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। নতুন এই আবিষ্কার সমুদ্র সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















