জাপানের সমুদ্রতীরবর্তী শহর ফুজিসাওয়ায় প্রথম মসজিদ নির্মাণের পরিকল্পনা ঘিরে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। একদিকে স্থানীয় বাসিন্দাদের একটি অংশের মধ্যে ভয় ও উদ্বেগ, অন্যদিকে মুসলিম সম্প্রদায় ও মানবাধিকারকর্মীদের মধ্যে সহাবস্থান, বোঝাপড়া ও সম্প্রীতির আহ্বান। মসজিদ নির্মাণকে ঘিরে এই বিরোধ জাপানে অভিবাসন, ধর্মীয় বৈচিত্র্য ও জাতীয় পরিচয় নিয়ে পুরোনো প্রশ্নগুলোকে আবারও সামনে এনেছে।
মসজিদ নির্মাণ ঘিরে উত্তেজনা
টোকিও থেকে প্রায় এক ঘণ্টার দূরত্বে অবস্থিত ফুজিসাওয়া এতদিন ছিল শান্ত ও নিরিবিলি একটি শহর। কিন্তু সেখানে নতুন মসজিদ নির্মাণের উদ্যোগ স্থানীয় সমাজে নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে।
দীর্ঘদিনের বাসিন্দা নোরিকো ইজুমিজাওয়া মনে করেন, নতুন ধর্মীয় স্থাপনা তৈরি হলে এলাকার সামাজিক পরিবেশ বদলে যেতে পারে। তার মতো আরও কয়েকজন বাসিন্দা মুসলিম সম্প্রদায়ের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন।
চলতি বছরের শুরুতে স্থানীয় রেলস্টেশনের কাছে মসজিদ নির্মাণের প্রতিবাদে বড় সমাবেশও হয়। প্রতিবাদকারীদের কেউ কেউ দাবি করেন, প্রস্তাবিত মসজিদটি কাছের একটি শিন্তো উপাসনালয়ের তুলনায় অনেক বড় হওয়ায় তা স্থানীয় সংস্কৃতির প্রতি অসম্মান দেখাতে পারে।

এর পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুসলিমদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ও ভুল তথ্য ছড়িয়ে পড়ার ঘটনাও সামনে এসেছে। কিছু মসজিদে আপত্তিকর ফোন ও বার্তা পাঠানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে। এর প্রতিবাদে বিদ্বেষবিরোধী সংগঠনগুলোও পাল্টা কর্মসূচি পালন করেছে।
বোঝাপড়ার আহ্বান স্থানীয়দের
মসজিদের প্রস্তাবিত স্থানের বিপরীতে একটি কফির দোকান পরিচালনা করেন হিরোকি সুজুকা। তিনি মসজিদ নির্মাণের সরাসরি বিরোধিতা না করলেও বিষয়টি নিয়ে নিজের অবস্থানকে নিরপেক্ষ বলে মনে করেন।
তার মতে, মুসলিম সম্প্রদায় সম্পর্কে মানুষের আগে জানা দরকার। ইসলাম কী, মুসলিমরা কী ধরনের জীবনযাপন করেন এবং তাদের মূল্যবোধ কী—এসব বোঝার মাধ্যমে পারস্পরিক দূরত্ব কমানো সম্ভব। তার মতে, পরস্পরের প্রতি খোলা মন ও বোঝার আগ্রহই হতে পারে আলোচনার প্রথম ধাপ।
জাপানে মুসলিমদের অভিজ্ঞতা
জাপানে মুসলিম হিসেবে বসবাসের অভিজ্ঞতাও একরকম নয়। ব্যবসায়ী মোহাম্মদ মহিদিন ১৯৮৭ সালে শ্রীলঙ্কা থেকে কাজের সন্ধানে জাপানে যান। প্রায় চার দশক ধরে দেশটিতে বসবাস করা এই ব্যবসায়ী মনে করেন, আগের তুলনায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মুসলিমদের প্রতি মানুষের মনোভাবের পরিবর্তন ঘটেছে।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুসলিমদের জাপান ছেড়ে চলে যেতে বলা থেকে শুরু করে নানা অপমানজনক মন্তব্য করা হচ্ছে। কখনও কখনও মসজিদের কাছেও মুসলিমদের উদ্দেশে কটূক্তি করা হয়।
তবে এসব পরিস্থিতিতে সংঘাতে না গিয়ে ধৈর্য, নম্রতা ও ভালো আচরণের ওপর জোর দেন তিনি। তার মতে, জাপানের অনেক মানুষ ইসলাম সম্পর্কে যথেষ্ট জানেন না। তাই ভুল ধারণা দূর করতে মুসলিম সম্প্রদায়কেও সমাজের সঙ্গে আরও বেশি যোগাযোগ বাড়াতে হবে।
নিয়ম মানা ও সামাজিক সম্পৃক্ততার গুরুত্ব
সাইতামা এলাকার একটি মসজিদের সঙ্গে যুক্ত শাকিল মোহাম্মদের মতে, জাপানে বসবাসরত বিদেশিদের স্থানীয় আইন ও সামাজিক নিয়মকানুন মেনে চলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আবর্জনা আলাদা করে ফেলা, গাড়ি রাখার নিয়ম মানা, সাইকেল চালানোর সময় নিরাপত্তা বিধি মেনে চলা এবং প্রতিবেশীদের সঙ্গে সৌজন্য বজায় রাখার মতো সাধারণ বিষয়গুলোও সামাজিক আস্থা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তার মতে, কোনো একটি সম্প্রদায়ের কয়েকজনের আচরণের জন্য পুরো সম্প্রদায়কে বিচার করা উচিত নয়। জাপানি সমাজের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।
বাড়ছে মুসলিম ও বিদেশি জনসংখ্যা
জাপানে মুসলিম জনসংখ্যা গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২৪ সালের শেষ দিকে দেশটিতে মুসলিমের সংখ্যা প্রায় ৪ লাখ ২০ হাজারে পৌঁছায় বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। ২০১৯ সালে এই সংখ্যা ছিল প্রায় ২ লাখ ৩০ হাজার।
শুধু মুসলিম জনসংখ্যাই নয়, সামগ্রিকভাবে জাপানে বিদেশি বাসিন্দার সংখ্যাও দ্রুত বাড়ছে। একই সময়ে দেশটির নিজস্ব জনসংখ্যা ধারাবাহিকভাবে কমছে। বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা কমে যাওয়ায় শ্রমবাজারে তৈরি হওয়া ঘাটতি পূরণে জাপানকে বিদেশি কর্মীদের ওপর ক্রমশ বেশি নির্ভর করতে হচ্ছে।
ফলে চীন, ভিয়েতনাম, দক্ষিণ কোরিয়া, ফিলিপাইনসহ বিভিন্ন দেশের মানুষের উপস্থিতি জাপানের সমাজে আগের চেয়ে অনেক বেশি দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে।
অভিবাসন নিয়ে কঠিন সিদ্ধান্তের সামনে জাপান
শ্রমিক সংকট মোকাবিলায় বিদেশি কর্মীদের প্রয়োজন হলেও অভিবাসন নিয়ে জাপানের রাজনৈতিক অবস্থান এখনও বেশ সতর্ক। দেশটি দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে অভিবাসননির্ভর রাষ্ট্র হিসেবে তুলে ধরতে অনিচ্ছুক থেকেছে।
বিদেশিদের জন্য বিভিন্ন ধরনের ভিসা ব্যবস্থা চালু থাকলেও সেগুলোর অনেকটাই অস্থায়ী চরিত্রের। একই সঙ্গে বিদেশিদের অবস্থান ও অভিবাসন ব্যবস্থাপনা আরও কঠোর করার উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।
২০২৬ সালের জুনে বিদেশিদের ভিসা ফি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পাশাপাশি অবৈধভাবে অবস্থানরত বিদেশিদের বিরুদ্ধে নজরদারি ও ব্যবস্থা জোরদার করতে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থায় জনবল বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।

পরিচয় ও বৈচিত্র্যের ভারসাম্য কতটা সম্ভব
ফুজিসাওয়ার মসজিদ বিতর্ক আসলে শুধু একটি ধর্মীয় স্থাপনা নির্মাণের প্রশ্ন নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে জাপানের ভবিষ্যৎ সমাজব্যবস্থা, অভিবাসননীতি এবং জাতীয় পরিচয়ের প্রশ্ন।
একদিকে দেশের অর্থনীতি সচল রাখতে বিদেশি শ্রমিকের প্রয়োজন বাড়ছে। অন্যদিকে নতুন সংস্কৃতি, ভাষা ও ধর্মের মানুষের উপস্থিতি নিয়ে সমাজের একটি অংশে তৈরি হচ্ছে অস্বস্তি।
ফুজিসাওয়ার বাসিন্দা ইজুমিজাওয়া স্বীকার করেছেন, মুসলিম প্রতিবেশীর সঙ্গে তার ব্যক্তিগত কোনো খারাপ অভিজ্ঞতা হয়নি। তার উদ্বেগের বড় কারণ হয়তো অজানাকে ঘিরে তৈরি হওয়া ভয়।
জাপানের সামনে এখন তাই বড় প্রশ্ন—দেশটি কীভাবে নিজের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয় ধরে রেখে আরও বৈচিত্র্যময় সমাজে পরিণত হবে। ফুজিসাওয়ার মসজিদকে ঘিরে বিতর্ক সেই প্রশ্নেরই একটি ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ প্রতিচ্ছবি।
জাপানে অভিবাসন ও ধর্মীয় বৈচিত্র্য নিয়ে পরিবর্তিত বাস্তবতা সামনে আসায় পারস্পরিক বোঝাপড়া, সামাজিক সম্পৃক্ততা এবং বিদ্বেষের বদলে সংলাপই পরিস্থিতি সামলানোর গুরুত্বপূর্ণ পথ হয়ে উঠতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















