ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসামে ভয়াবহ বন্যায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ এই বন্যায় ইতোমধ্যে ৬ লাখের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। পানিতে তলিয়ে গেছে বিস্তীর্ণ এলাকা, ভেসে গেছে ঘরবাড়ি ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী। বহু মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন ত্রাণশিবিরে।
গত কয়েক সপ্তাহে বন্যা ও সংশ্লিষ্ট দুর্ঘটনায় অন্তত ৬৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে গত এক সপ্তাহেই মারা গেছেন ৫৮ জন। এখনো প্রায় ৪০ জন নিখোঁজ রয়েছেন। বন্যার পানিতে ডুবে, স্রোতে ভেসে, ভূমিধস ও ঘরবাড়ি ধসে এসব প্রাণহানি হয়েছে।
কয়েক মিনিটেই ভেসে গেল ঘর
জোড়হাট জেলার ১৮ বছর বয়সী শালিনী পাত্রার জীবনে ১৯ জুলাই নেমে আসে ভয়াবহ বিপর্যয়। হঠাৎ পানি বাড়তে শুরু করলে কয়েক মিনিটের মধ্যেই হাঁটুসমান পানি ঢুকে পড়ে তাদের ঘরে।
বৃদ্ধ বাবা-মা ও ছোট ভাইকে নিরাপদ জায়গায় পাঠানোর পর নিজের বাড়ির কিছু জিনিসপত্র বাঁচাতে ফিরে গিয়েছিলেন শালিনী। কিন্তু ফিরে এসে দেখেন, পানির স্রোতে তাদের পুরো বাড়িই ভেসে গেছে।

টেলিভিশন, আলমারি, সোফাসহ ঘরের প্রায় সবকিছুই হারিয়েছেন তারা। এমনকি পান করার জন্য একটি গ্লাসও রক্ষা করা সম্ভব হয়নি।
শালিনীর পরিবার যে এলাকায় বসবাস করত, সেখানে প্রতি বছরই বন্যা হয়। তবে এবারের পরিস্থিতি আগের সব অভিজ্ঞতাকে ছাড়িয়ে গেছে।
কেন বারবার ভয়াবহ হচ্ছে বন্যা
ব্রহ্মপুত্র নদের বিস্তীর্ণ বন্যাপ্রবণ সমভূমিতে অবস্থিত আসাম। রাজ্যের প্রায় ৪০ শতাংশ এলাকা বন্যার ঝুঁকিতে রয়েছে। হিমালয় থেকে নেমে আসা ব্রহ্মপুত্রের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ৫০টিরও বেশি উপনদী।
বর্ষাকালে অতিবৃষ্টির কারণে এসব নদীতে পানির প্রবাহ দ্রুত বেড়ে যায়। সমতল ভূমির ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার সময় ব্রহ্মপুত্র বিপুল পরিমাণ বালি ও পলি বহন করে। এতে নদীর পানি ধারণক্ষমতা কমে গিয়ে বন্যার ঝুঁকি আরও বাড়ে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উজানে বন উজাড়, পুরোনো ও দুর্বল বাঁধ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অতিবৃষ্টির প্রবণতা বাড়ায় পরিস্থিতি দিন দিন আরও ভয়াবহ হয়ে উঠছে।
এক দিনে ২১ জনের মৃত্যু

জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ে আসাম ও পার্শ্ববর্তী নাগাল্যান্ডের বিভিন্ন এলাকায় অস্বাভাবিক ভারী বৃষ্টিপাত শুরু হয়। কয়েকটি এলাকায় স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় চার থেকে পাঁচ গুণ বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে বলে রাজ্য সরকার জানিয়েছে।
এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে আসামের উচ্চাঞ্চলীয় জেলাগুলোতে। শিবসাগর, চরাইদেও ও জোড়হাটসহ বিভিন্ন এলাকায় দ্রুত পানি বাড়তে থাকায় বহু গ্রাম যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
২১ জুলাই মাত্র ২৪ ঘণ্টায় ২১ জনের মৃত্যু হয়। তাদের অনেকেই পানির প্রবল স্রোতে ভেসে গিয়ে কিংবা ডুবে মারা যান। কয়েকজনের মৃত্যু হয় ভূমিধস ও ঘরবাড়ি ধসে।
আমগাছে রাত কাটালেন মা-ছেলে
বন্যার ভয়াবহতার আরেকটি চিত্র দেখা গেছে শিবসাগরের হোলাং কাটোনি গ্রামে। সেখানে রেকামনি গগৈ ও তার সাত বছর বয়সী ছেলে বন্যার পানিতে আটকে পড়ে প্রায় ১২ ঘণ্টা একটি আমগাছে আশ্রয় নেন।
১৯ জুলাই ভারী বৃষ্টির পর মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যে পানি বুকসমান হয়ে যায়। প্রথমে প্রতিবেশীর বাড়িতে আশ্রয় নিলেও পানি আরও বাড়তে থাকায় সেখান থেকেও বেরিয়ে যেতে হয় তাদের।

রাতের অন্ধকারে মা ও ছেলে শেষ পর্যন্ত বাড়ির উঠানের একটি বড় আমগাছে উঠে পড়েন। খাবার বা পানি ছাড়াই পুরো রাত গাছের ডালে কাটে তাদের।
পরদিন সকালে উদ্ধারকারীরা তাদের নিরাপদে সরিয়ে নেয়। বর্তমানে তারা একটি ত্রাণকেন্দ্রে অবস্থান করছেন এবং পানি কমার অপেক্ষা করছেন।
ত্রাণের পাশাপাশি শুরু পুনর্বাসনের প্রস্তুতি
বন্যায় প্রায় ২৫ হাজার মানুষ বিভিন্ন ত্রাণকেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছেন। অনেকে আবার আত্মীয়স্বজন ও পরিচিতদের বাড়িতে গিয়ে উঠেছেন।
রাজ্য প্রশাসন জানিয়েছে, সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া, যোগাযোগব্যবস্থা পুনরুদ্ধার এবং প্রয়োজনীয় সেবা সচল করাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসার পর এখন পুনর্বাসনের প্রস্তুতিও শুরু হয়েছে।
তবে যাদের ঘরবাড়ি ভেসে গেছে, তাদের সামনে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। শালিনী পাত্রার পরিবারের মতো বহু দরিদ্র পরিবারের জন্য নতুন করে ঘর তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়েছে। বছরের পর বছর পরিশ্রম করে গড়ে তোলা ঘর হারিয়ে অনেক পরিবার এখন শুধু নিরাপদ আশ্রয় আর নতুন করে জীবন শুরু করার অপেক্ষায়।
আসামের এবারের বন্যা আবারও দেখিয়ে দিল, প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামোগত দুর্বলতা ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব যুক্ত হলে মানুষের ক্ষতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















