পাকিস্তান-আফগানিস্তান সীমান্ত অঞ্চলে সন্ত্রাসী আস্তানায় বিমান হামলা চালিয়েছে পাকিস্তান। দেশটির তথ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এসব হামলায় অন্তত ২৮ জন সন্ত্রাসী নিহত হয়েছে। হামলায় আত্মঘাতী বোমা হামলাকারীদের প্রশিক্ষণকেন্দ্রসহ তিনটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করা হয়েছে।
সোমবার দেওয়া এক বিবৃতিতে পাকিস্তানের তথ্য মন্ত্রণালয় জানায়, খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশে সাম্প্রতিক একাধিক সন্ত্রাসী হামলার সঙ্গে জড়িত সংগঠনগুলোর গোপন আস্তানা ও নিরাপদ আশ্রয়স্থল লক্ষ্য করে এসব ‘পরিমিত ও সুনির্দিষ্ট’ হামলা চালানো হয়।
মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে আফগান সীমান্ত অঞ্চলে নিষিদ্ধ তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান বা টিটিপির জন্য পাকিস্তান সরকারের ব্যবহৃত ‘ফিতনা আল খাওয়ারিজ’ নামের পরিচিতি এবং তাদের সহযোগী গোষ্ঠীগুলোর প্রশিক্ষণকেন্দ্র ও আস্তানা চিহ্নিত করা হয়। এরপর নির্ভুলভাবে হামলা চালানো হয়।
পাকিস্তানের তথ্য মন্ত্রণালয় বলেছে, হামলায় তিনটি লক্ষ্যবস্তু পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছে। এর মধ্যে একটি ছিল আত্মঘাতী বোমা হামলাকারীদের প্রশিক্ষণকেন্দ্র। এসব হামলায় ২৮ জন সন্ত্রাসী এবং বেশ কয়েকজন আত্মঘাতী হামলাকারী নিহত হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। একই সঙ্গে ওই কেন্দ্র ও আস্তানাগুলোতে মজুত বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদও ধ্বংস করা হয়েছে।
স্থল অভিযানেও নিহত ৯
বিমান হামলার আগে রোববার খাইবার পাখতুনখোয়ার কোহাট ও হাঙ্গু জেলায় গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে একটি পরিকল্পিত স্থল অভিযান চালায় পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনী।
পাকিস্তানের তথ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ওই অভিযানে সুনির্দিষ্ট ও দক্ষতার সঙ্গে সন্ত্রাসীদের মোকাবিলা করা হয়। এতে ‘ফিতনা আল খাওয়ারিজ’-এর নয় সদস্য নিহত এবং আরও কয়েকজন আহত হয়েছে।
পাকিস্তান সরকার দাবি করেছে, সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক এসব অভিযান দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ।
আফগানিস্তানকে নিয়ে পাকিস্তানের অভিযোগ
বিবৃতিতে পাকিস্তানের তথ্য মন্ত্রণালয় বলেছে, আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে ইসলামাবাদ সবসময় চেষ্টা করেছে। তবে পাকিস্তানি নাগরিকদের নিরাপত্তা সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।
মন্ত্রণালয়ের দাবি, আফগানিস্তান এখনো সন্ত্রাসবাদের একটি কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং পাকিস্তানের জন্য সন্ত্রাসী হুমকির উৎস আফগান ভূখণ্ড।
পাকিস্তান আরও বলেছে, এ কারণেই সন্ত্রাসীদের ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। বেসামরিক মানুষের ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে সর্বোচ্চ সতর্কতা নেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করেছে ইসলামাবাদ।
কোহাটে ভয়াবহ হামলার কয়েক দিনের মধ্যেই বিমান হামলা
সাম্প্রতিক এই বিমান হামলার কয়েক দিন আগে খাইবার পাখতুনখোয়ার কোহাটের পুরোনো পুলিশ লাইন্স এলাকায় ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলায় ২৩ জন নিহত এবং প্রায় ১০০ জন আহত হন। পরে রাতভর চালানো অভিযানে আটজন সন্ত্রাসী নিহত হয়।
সোমবার কোহাট সফর করেন পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার। তিনি হামলায় নিহত এক পুলিশ কর্মকর্তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করেন এবং সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালেও আহত নিরাপত্তাকর্মীদের দেখতে যান।
পরে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, শহীদ ও আহতদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাতের পর তিনি আশাবাদী যে পাকিস্তান থেকে সন্ত্রাসবাদ নির্মূল করা সম্ভব হবে। সন্ত্রাসবাদের শিকড় উপড়ে না ফেলা পর্যন্ত সরকার ও নিরাপত্তা বাহিনী থামবে না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
আফগান তালেবানের সঙ্গে টানাপোড়েন
২০২১ সালে আফগানিস্তানে তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর পাকিস্তানে সন্ত্রাসী হামলার মাত্রা আবারও বেড়েছে বলে ইসলামাবাদ দাবি করে আসছে।
পাকিস্তানের অভিযোগ, আফগান ভূখণ্ডে টিটিপিসহ বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর নিরাপদ আশ্রয় রয়েছে এবং সেখান থেকেই পাকিস্তানের ভেতরে হামলার পরিকল্পনা ও পরিচালনা করা হয়। এ কারণে আফগান তালেবান সরকারকে এসব গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বারবার আহ্বান জানিয়েছে ইসলামাবাদ।
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অধীন একটি পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, আফগান তালেবানের টিটিপির প্রতি অব্যাহত সমর্থন পাকিস্তানে সন্ত্রাসী হামলার সংখ্যা ও প্রাণঘাতী মাত্রা বাড়াতে ভূমিকা রেখেছে। একই প্রতিবেদনে টিটিপি, আল-কায়েদা, ইসলামিক স্টেট-খোরাসান এবং বালুচ লিবারেশন আর্মির মধ্যে কার্যক্রম ও সহযোগিতার সম্পর্ক বাড়ার বিষয়েও সতর্ক করা হয়েছে।
‘গাজাব লিল হক’ অভিযান অব্যাহত রাখার ঘোষণা
পাকিস্তানের তথ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নিরাপত্তা বাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলো ‘আজম-ই-ইস্তেহকাম’ পরিকল্পনার অধীনে ‘গাজাব লিল হক’ নামে যে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান চালিয়ে আসছে, তা অব্যাহত থাকবে।
গত ২৬ ফেব্রুয়ারি আফগান তালেবান সীমান্তের ওপার থেকে গুলি চালানোর পর পাকিস্তান ‘গাজাব লিল হক’ অভিযান শুরু করে বলে ইসলামাবাদ জানিয়েছে। এর আওতায় আফগানিস্তানের সীমান্তবর্তী এলাকায় সন্ত্রাসীদের ঘাঁটিতে আগেও হামলা চালানো হয়েছে।
সর্বশেষ জুনের শেষ দিকে আফগান সীমান্তবর্তী পাক্তিয়া, পাক্তিকা ও কুনার এলাকায় পাকিস্তানের বিমান ও স্থল অভিযান চালানো হয়েছিল। পাকিস্তানের দাবি, ওই অভিযানে ২৫ জন সন্ত্রাসী নিহত হয়। এর আগে জুনের শুরুতেও সীমান্তবর্তী সন্ত্রাসী আস্তানায় হামলা চালিয়ে ২৬ জনকে হত্যার দাবি করেছিল ইসলামাবাদ।
আলোচনার পাশাপাশি সামরিক চাপ
আফগানিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের বিষয়ে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় চলতি মাসের শুরুতে বলেছিল, টিটিপি ও অন্যান্য সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কাবুলকে দৃশ্যমান, কার্যকর ও যাচাইযোগ্য ব্যবস্থা নিতে হবে।
চীনের মধ্যস্থতামূলক যোগাযোগকে স্বাগত জানালেও পাকিস্তান জানিয়েছে, বাইরের কোনো উদ্যোগ আফগান ভূখণ্ডে থাকা সন্ত্রাসী অবকাঠামোর বিরুদ্ধে কাবুলের নিজস্ব পদক্ষেপের বিকল্প হতে পারে না।
অন্যদিকে, আফগান তালেবানের মুখপাত্র জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ গত সপ্তাহে পাকিস্তানের সঙ্গে সংলাপের আগ্রহের কথা জানালেও আফগান ভূখণ্ডে পাকিস্তান সামরিক অভিযান চালালে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন। পাকিস্তান সেই বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, সংলাপের নামে এমন কোনো পরিস্থিতি মেনে নেওয়া হবে না, যা পাকিস্তানি নাগরিকদের জন্য হুমকি তৈরি করে।
সীমান্তে নতুন বিমান হামলার ফলে পাকিস্তান ও আফগান তালেবান সরকারের মধ্যে চলমান উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইসলামাবাদ একদিকে আলোচনার কথা বলছে, অন্যদিকে আফগান ভূখণ্ডে সন্ত্রাসী ঘাঁটি ধ্বংসে সামরিক পদক্ষেপ অব্যাহত রাখার অবস্থানও স্পষ্ট করেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















