আয়ারল্যান্ডের পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলে প্রতিবছর এমন এক সামুদ্রিক প্রাণীর দেখা মেলে, যার বিশাল আকৃতি দেখলে যে কারও চোখ কপালে উঠতে পারে। তবে আকারে দানবের মতো হলেও বাস্কিং হাঙর স্বভাবের দিক থেকে শান্ত। সমুদ্রের অগভীর পানিতে তীরের একেবারে কাছাকাছি এসে সাঁতার কাটায় বলে পর্যটকেরা নৌকা কিংবা উপকূল থেকেই তাদের কাছ থেকে দেখার বিরল সুযোগ পান।
প্রতিবছর এপ্রিল থেকে জুলাইয়ের শুরু পর্যন্ত এবং আবার আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে আয়ারল্যান্ডের উপকূলে শত শত বাস্কিং হাঙরের আনাগোনা দেখা যায়। খাবারের সন্ধানে তারা সমুদ্রের পানিতে থাকা অতি ক্ষুদ্র প্রাণী ও উদ্ভিদকণা খেতে এসব এলাকায় আসে। কখনো কখনো সমুদ্রের পানিতে তাদের খাবারের বিশাল সমাবেশ এতটাই বড় হয় যে তা ওপর থেকেও দেখা যায়।
বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মাছ
বাস্কিং হাঙর পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম মাছ। পূর্ণবয়স্ক একটি হাঙর প্রায় ১০ মিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। বিশাল শরীর ও ভয়ংকর চেহারা সত্ত্বেও এই প্রাণী মানুষের জন্য সাধারণত আক্রমণাত্মক নয়। তারা ধীরগতিতে সাঁতার কাটে এবং মূলত পানিতে থাকা ক্ষুদ্র জীব ও কণিকা ছেঁকে খায়।

সমুদ্রের পানির ওপরের দিকে ভেসে খাবার গ্রহণ করার অভ্যাস থেকেই তাদের এমন নামের উৎপত্তি। আয়ারল্যান্ডের স্থানীয় ভাষাতেও তাদের নামের অর্থ দাঁড়ায় সূর্যের মাছ।
আয়ারল্যান্ডের উপকূলের অগভীর সমুদ্রাঞ্চলে তাদের খাবারের পরিমাণ বেশি থাকায় দেশটির পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূল বাস্কিং হাঙর দেখার জন্য বিশ্বের অন্যতম আকর্ষণীয় স্থান হয়ে উঠেছে।
শিকার থেকে বিলুপ্তির ঝুঁকিতে
এই বিশাল মাছের ইতিহাস অবশ্য এতটা সুন্দর নয়। গত শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে আয়ারল্যান্ডের অ্যাকিল দ্বীপ বাস্কিং হাঙর শিকার ও প্রক্রিয়াজাতকরণের অন্যতম বড় কেন্দ্র ছিল। তাদের বিশাল যকৃত থেকে তেল সংগ্রহ করা হতো। সেই তেল প্রসাধনী, শিল্পকারখানার বিভিন্ন কাজে এবং কিছু চিকিৎসায় ব্যবহার করা হতো। একই সঙ্গে হাঙরের পাখনারও ব্যাপক চাহিদা ছিল।
শুধু আয়ারল্যান্ড নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জেলেরা দীর্ঘদিন ধরে এই প্রাণী শিকার করেছেন। অতিরিক্ত শিকারের কারণে বিংশ শতাব্দীর শেষদিকে বাস্কিং হাঙর প্রায় বিলুপ্তির মুখে চলে যায়।

আয়ারল্যান্ডের সমুদ্রে সর্বশেষ বাস্কিং হাঙর ধরা পড়েছিল ১৯৮৪ সালে। এরপর চার দশকের বেশি সময় ধরে দেশটির উপকূলে এই প্রাণীর সংখ্যা ও দেখা পাওয়ার ঘটনা বাড়তে শুরু করেছে। তবে বিশ্বজুড়ে তাদের পরিস্থিতি এখনো উদ্বেগজনক। বিলুপ্তির ঝুঁকি বিবেচনায় আন্তর্জাতিক সংরক্ষণ তালিকাতেও বাস্কিং হাঙরকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
পর্যটনের নতুন আকর্ষণ
সমুদ্র ও বন্যপ্রাণীর বৈচিত্র্যের কারণে আয়ারল্যান্ড বহু বছর ধরেই পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয়। বাস্কিং হাঙরের সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকায় তাদের দেখার সুযোগও পর্যটনের একটি বিশেষ আকর্ষণে পরিণত হয়েছে।
পশ্চিম উপকূলের বিভিন্ন এলাকায় নৌভ্রমণের মাধ্যমে পর্যটকেরা এই বিশাল প্রাণী দেখার সুযোগ পাচ্ছেন। কখনো তারা নৌকার মাত্র কয়েক দশ মিটার দূর দিয়ে চলে যায়। আবার কখনো নৌকার নিচ দিয়েও সাঁতার কাটতে দেখা যায়।
তবে বাস্কিং হাঙর দেখা পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই। কারণ তারা বন্য প্রাণী এবং নিজেদের ইচ্ছামতো চলাফেরা করে। তবুও নৌভ্রমণের সময় সিল, ডলফিন, সামুদ্রিক পাখি এবং কখনো কখনো ছোট আকারের তিমিও দেখা যায়।
প্রাণী রক্ষায় কঠোর নিয়ম

বাস্কিং হাঙরকে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ থাকলেও তাদের বিরক্ত না করার বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ২০২২ সাল থেকে আয়ারল্যান্ডের বন্যপ্রাণী আইনের আওতায় এই প্রাণী সুরক্ষিত। দেশটির জলসীমায় বাস্কিং হাঙর শিকার, আহত করা কিংবা তাদের খাবার ও প্রজননস্থলে বিরক্ত করা বেআইনি।
নৌযান পরিচালনার ক্ষেত্রেও নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখার নিয়ম রয়েছে। হাঙরের কাছাকাছি গেলে নৌকার ইঞ্জিন বন্ধ বা নিরপেক্ষ অবস্থায় রাখতে বলা হয়, যাতে শব্দ ও গতির কারণে প্রাণীগুলোর স্বাভাবিক চলাফেরায় ব্যাঘাত না ঘটে।
মানুষের নয়, হাঙরের কাছেই আসার অপেক্ষা
পর্যটকদের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো—অনেক সময় মানুষকে হাঙরের কাছে যেতে হয় না, বরং হাঙরই নিজের পথ ধরে নৌকার দিকে চলে আসে। নিরাপদ দূরত্বে অপেক্ষা করলে কখনো কখনো বিশাল প্রাণীটি নৌকার পাশে এসে কিছুক্ষণ ঘোরাফেরা করে আবার চলে যায়।
এই অভিজ্ঞতা পর্যটকদের কাছে যেমন রোমাঞ্চকর, তেমনি প্রকৃতির সঙ্গে এক অসাধারণ সাক্ষাৎ। কয়েক মিটার লম্বা একটি হাঙর যখন শান্তভাবে নৌকার পাশ দিয়ে চলে যায়, তখন তার বিশাল শরীরের প্রকৃত আকার অনুভব করা যায়।
আয়ারল্যান্ডের উপকূলে বাস্কিং হাঙরের এই ফিরে আসা তাই শুধু পর্যটনের আনন্দ নয়, প্রকৃতি সংরক্ষণেরও একটি আশাব্যঞ্জক দৃষ্টান্ত। একসময় যে প্রাণী মানুষের অতিরিক্ত শিকারে বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছিল, এখন তারাই আবার সমুদ্রের অগভীর পানিতে ফিরে এসে মানুষকে মুগ্ধ করছে।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















