স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসক্ত এক প্রজন্ম ধীরে ধীরে কর্মবিমুখ হয়ে পড়ছে—এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেছে যুক্তরাজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি পর্যালোচনা। দেশটির সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী অ্যালান মিলবার্নের নেতৃত্বে তৈরি হওয়া অন্তর্বর্তী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তরুণদের মধ্যে বাড়তে থাকা মানসিক চাপ, উদ্বেগ, বিষণ্নতা ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ব্রিটেনের অর্থনীতির জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে ব্রিটেনে প্রায় ৯ লাখ ৪৬ হাজার তরুণ-তরুণী শিক্ষা, চাকরি কিংবা প্রশিক্ষণের বাইরে রয়েছে। এদের বড় একটি অংশ কখনও কর্মজীবনে প্রবেশই করেনি। বিশেষ করে ১৬ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতা বা অক্ষমতার কারণ দেখিয়ে কর্মক্ষেত্র থেকে দূরে থাকার প্রবণতা বাড়ছে।
মানসিক স্বাস্থ্য এখন বড় কারণ

পর্যালোচনায় উঠে এসেছে, কর্মবিমুখ তরুণদের মধ্যে ৪৩ শতাংশ এখন মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যাকে প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করছে। ২০১১ সালে এই হার ছিল ২৪ শতাংশ। অন্যদিকে শারীরিক অসুস্থতার অজুহাত উল্লেখ করার হার কমে গেছে উল্লেখযোগ্যভাবে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমান প্রজন্ম এক ভিন্ন বাস্তবতায় বড় হয়েছে, যেখানে ডিজিটাল জগৎ তাদের আচরণ, যোগাযোগের ধরন এবং মানসিক স্থিতি বদলে দিয়েছে।
অ্যালান মিলবার্ন বলেছেন, এই তরুণদের ‘অলস’ বা ‘অতিরিক্ত সংবেদনশীল’ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তার ভাষায়, এটি একটি উদ্বিগ্ন প্রজন্ম, যারা সবসময় অনলাইনে থাকছে এবং বাস্তব সামাজিক পরিবেশ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। তিনি বলেন, অনেক তরুণ দিনের বড় অংশ নিজেদের ঘরে কাটাচ্ছে এবং রাতভর ফোনে স্ক্রল করতে করতে তাদের ঘুম, মনোযোগ ও কাজের সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
লকডাউনের প্রভাবও গভীর
প্রতিবেদন অনুযায়ী, করোনাকালের দীর্ঘ লকডাউনও পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করেছে। বর্তমান ১৬ থেকে ২৪ বছর বয়সীরা যখন কৈশোরে ছিল, তখন তাদের স্কুল-কলেজ বন্ধ হয়ে যায় এবং সামাজিক যোগাযোগ কমে যায়। এর ফলে বাস্তব কর্মপরিবেশ সম্পর্কে তাদের অভিজ্ঞতা সীমিত হয়েছে এবং উদ্বেগ ও হতাশা বেড়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, উদ্বেগ, বিষণ্নতা, অটিজম বা মনোযোগ ঘাটতির মতো সমস্যার শনাক্ত হওয়া মানেই কাউকে কর্মজীবনের বাইরে চলে যেতে হবে—এমন ধারণা ভুল। বরং সঠিক সহায়তা ও উপযোগী কর্মপরিবেশ তৈরি করা গেলে এই তরুণদের একটি বড় অংশ কর্মক্ষেত্রে ফিরতে পারে।
কল্যাণব্যবস্থা সংস্কারের দাবি
মিলবার্নের ভাষায়, বর্তমান কল্যাণব্যবস্থা তরুণদের কাজে উৎসাহিত করার বদলে অনেক ক্ষেত্রে কর্মহীনতার মধ্যে আটকে রাখছে। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, দ্রুত সংস্কার না আনলে পুরো একটি প্রজন্ম দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রীয় সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারে। এতে শুধু অর্থনীতিই ক্ষতিগ্রস্ত হবে না, তরুণদের জীবন-সম্ভাবনাও নষ্ট হবে।
একই সঙ্গে তিনি মনে করেন, ব্রিটেনে অভিবাসন কমে যাওয়ার পর শ্রমবাজারে যে দক্ষ কর্মীর সংকট তৈরি হয়েছে, সেই শূন্যতা পূরণে এই তরুণ জনগোষ্ঠী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এজন্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও সহানুভূতিশীল হতে হবে এবং মানসিক চাপ মোকাবিলায় সহায়ক পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 

















