বিশ্বের পুঁজিবাজারে এখন নতুন উত্তেজনার কেন্দ্র হয়ে উঠেছে ইলন মাস্কের মহাকাশ প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্স। সম্ভাব্য শেয়ারবাজারে আসাকে ঘিরে যে আলোড়ন তৈরি হয়েছে, তা শুধু প্রযুক্তি খাতেই সীমাবদ্ধ নেই; বরং পুরো বিনিয়োগ বিশ্বকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। বিনিয়োগকারীরা এখন এমন প্রতিষ্ঠান খুঁজছেন, যারা দ্রুত বাড়ছে, অর্থনৈতিক মন্দায়ও টিকে থাকতে পারে এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ধাক্কায় সহজে অচল হয়ে পড়বে না। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এমন বৈশিষ্ট্যের প্রতিষ্ঠান খুব কম।
এই কারণেই আগামী সময়ে অনেক সম্ভাব্য শেয়ারবাজারে আসার পরিকল্পনা হয় পিছিয়ে যাবে, নয়তো প্রত্যাশা পূরণ করতে ব্যর্থ হবে।
এই মুহূর্তে ইউরোপের বাজারে যেসব প্রতিষ্ঠানকে শক্ত অবস্থানে দেখা হচ্ছে, তাদের মধ্যে অন্যতম গাড়ির কাচ মেরামত ও প্রতিস্থাপনকারী প্রতিষ্ঠান বেলরন। বাইরে থেকে ব্যবসাটি সাধারণ মনে হলেও এর ভেতরে রয়েছে স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধির এক ব্যতিক্রমী কাঠামো।
অর্থনীতি দুর্বল হলে মানুষ নতুন গাড়ি কেনার বদলে পুরোনো গাড়ি মেরামত করে ব্যবহার করতে চায়। তখন গাড়ির কাচ বদল বা মেরামতের প্রয়োজন বাড়ে। আবার অর্থনীতি ভালো থাকলে মানুষ উন্নত প্রযুক্তিযুক্ত নতুন গাড়ি কেনে, যেখানে নিরাপত্তা সেন্সর ও ডিজিটাল ব্যবস্থার সঙ্গে সামনের কাচ গভীরভাবে যুক্ত থাকে। ফলে দুই ধরনের পরিস্থিতিতেই এই ধরনের প্রতিষ্ঠানের চাহিদা বজায় থাকে।

এটাই বেলরনের মতো প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে বড় শক্তি। তারা এমন একটি খাতে আছে, যার প্রয়োজন অর্থনৈতিক চক্রের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল নয়।
গত দুই দশকে প্রতিষ্ঠানটির আয় ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। খুব অল্প সময়েই বিক্রি কমেছে। এর মানে হলো, ব্যবসাটি সাময়িক কোনো প্রবণতার ওপর দাঁড়িয়ে নেই; বরং এটি মানুষের দীর্ঘমেয়াদি বাস্তব প্রয়োজনের অংশ হয়ে গেছে। বর্তমান বাজারে বিনিয়োগকারীরা ঠিক এই ধরনের স্থিতিশীলতাই খুঁজছেন।
এদিকে প্রাইভেট ইকুইটি খাতও এখন বড় চাপে আছে। বহু বছর ধরে তারা বিপুল অর্থ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করেছে। এখন সেই বিনিয়োগ থেকে লাভ তুলে আনার সময় এসেছে। কিন্তু বাজারের বাস্তবতা বদলে গেছে। সুদের হার, ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা, মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাজনিত অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকারীদের আরও সতর্ক করে তুলেছে।
এই পরিস্থিতিতে স্পেসএক্স এক ধরনের মানদণ্ড তৈরি করেছে। যদি কোনো প্রতিষ্ঠান দ্রুত প্রবৃদ্ধি, ভবিষ্যতের প্রযুক্তিগত সম্ভাবনা এবং বড় আকারের ব্যবসায়িক প্রভাব একসঙ্গে দেখাতে পারে, তাহলে বাজার তাকে স্বাগত জানাতে পারে। কিন্তু বেশিরভাগ ঐতিহ্যগত প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সেই জায়গায় পৌঁছানো কঠিন। কারণ তাদের ব্যবসা হয় অর্থনৈতিক চক্রের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত, নয়তো প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের ঝুঁকিতে রয়েছে।

বেলরনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো এখানেই আলাদা। তারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সরাসরি প্রতিযোগিতায় নেই। আবার এমনও নয় যে নতুন কোনো সফটওয়্যার এসে পুরো ব্যবসাকে অচল করে দেবে। বরং তারা এমন বাস্তব সেবার সঙ্গে যুক্ত, যার প্রয়োজন দীর্ঘদিন থাকবে।
এখনকার বিনিয়োগকারীরা শুধু স্বপ্ন নয়, বাস্তব ফলাফলও দেখতে চান। একসময় প্রযুক্তি নিয়ে বড় গল্প বললেই বাজারে উত্তেজনা তৈরি হতো। এখন সেই সময় বদলেছে। বিনিয়োগকারীরা জানতে চাইছেন আয় কোথা থেকে আসছে, ব্যবসা কতটা টেকসই এবং কঠিন অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে প্রতিষ্ঠানটি কতটা টিকে থাকতে পারবে।
ফলে ভবিষ্যতের শেয়ারবাজারে আসার পরিবেশ আরও কঠিন ও বাছাই করা হয়ে উঠবে। যারা শুধু “পরবর্তী বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান” হওয়ার প্রতিশ্রুতি দেবে, তাদের অনেকেই হয়তো বাজারকে সন্তুষ্ট করতে পারবে না। বরং যেসব প্রতিষ্ঠান দীর্ঘমেয়াদি প্রয়োজন, স্থিতিশীল আয় এবং বাস্তবভিত্তিক ব্যবসায়িক শক্তি দেখাতে পারবে, তারাই এগিয়ে থাকবে।
সবশেষে, স্পেসএক্স হয়তো মানুষের কল্পনাকে দখল করে রেখেছে, কিন্তু বাস্তব অর্থনীতিতে টিকে থাকতে শুধু কল্পনা যথেষ্ট নয়। দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের জন্য প্রয়োজন এমন ব্যবসা, যা অনিশ্চিত সময়েও নিজের প্রয়োজনীয়তা প্রমাণ করতে পারে। আগামী দিনের শেয়ারবাজারে সফল হবে সম্ভবত সেই প্রতিষ্ঠানগুলোই, যারা উত্তেজনার বাইরে গিয়েও বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধরে রাখতে পারবে।

এমি ডনেলান 

















