০৫:০২ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৩ মে ২০২৬
মধ্যবিত্তের নীরব সংকট: আয় থেমে, ব্যয় ছুটছে লাগামহীন যশোরে কাভার্ডভ্যানের চাপায় প্রাণ গেল ৪ জনের, হাসপাতালে আশঙ্কাজনক ২ সমুদ্রের অজানা জগতের সন্ধান, এক বছরে মিলল ১,১২১ নতুন সামুদ্রিক প্রাণীর খোঁজ মানবাধিকার বনাম সীমান্তরাজনীতি: ইউরোপ কি নতুন এক কঠোর যুগে প্রবেশ করছে হামে শিশুমৃত্যু ৫০০ পেরোল, দুই মাসে আক্রান্তের উপসর্গ ৬২ হাজারের বেশি ভাঙা হৃদয়ের আগুনে গড়া শাকিরা: প্রেম, বেদনা আর বিশ্বমঞ্চের উন্মাতাল রাণীর প্রত্যাবর্তন সিলেটে হামের উপসর্গে আরও ৪ শিশুর মৃত্যু, বিভাগজুড়ে আতঙ্ক ঈদের পর- আইনমন্ত্রী ফোনে ডুবে থাকা তরুণদের নিয়ে ব্রিটেনের উদ্বেগ, ‘কর্মহীন প্রজন্ম’ অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি মোনালিসা কীভাবে ‘ভরাট গড়ন’-এর প্রতি সম্মান শেখাতে পারে

পশ্চিমকে বাঁচাতে পারে নতুন বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থা

বিশ্ব রাজনীতির মানচিত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছে। একসময় যে আন্তর্জাতিক কাঠামোকে অপরিবর্তনীয় মনে করা হতো, এখন তার ভিতেই দেখা দিচ্ছে ক্লান্তি, বিভাজন ও অনিশ্চয়তা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাশিয়া ও চীনের ঘনিষ্ঠতা পশ্চিমা বিশ্বে উদ্বেগের নতুন ঢেউ তুলেছে। ইউরোপ ও আমেরিকার বহু নীতিনির্ধারক এটিকে একটি কর্তৃত্ববাদী জোট হিসেবে দেখাতে চাইছেন, যেন এই দুই শক্তির লক্ষ্যই পশ্চিমা সভ্যতাকে ধ্বংস করা। কিন্তু বাস্তবতা এত সরল নয়। বরং এই পরিবর্তন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার এক গভীর রূপান্তরের ইঙ্গিত বহন করছে।

রাশিয়া ও চীনের বর্তমান অবস্থান মূলত একমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার বিরুদ্ধে। তারা এমন একটি পৃথিবীর ধারণা সামনে আনছে, যেখানে একটি মাত্র শক্তি বা আদর্শ সবার ওপর আধিপত্য বিস্তার করবে না। বহুদিন ধরে ওয়াশিংটন ও তার মিত্ররা বিশ্ব রাজনীতিকে এমনভাবে পরিচালনা করেছে যেন উদারপন্থী পশ্চিমা মডেলই মানবসভ্যতার একমাত্র গ্রহণযোগ্য ভবিষ্যৎ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই ধারণার সীমাবদ্ধতা আরও স্পষ্ট হয়েছে।

সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর পশ্চিমা বিশ্ব নিজেদের বিজয়কে ইতিহাসের চূড়ান্ত গন্তব্য হিসেবে তুলে ধরেছিল। তখন মনে করা হয়েছিল, জাতীয় সীমান্ত, সাংস্কৃতিক পার্থক্য বা সভ্যতার নিজস্ব চরিত্র ধীরে ধীরে গুরুত্ব হারাবে। বিশ্বায়নই হবে ভবিষ্যতের একমাত্র ভাষা। কিন্তু এই অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস থেকেই জন্ম নেয় দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ, শাসন পরিবর্তনের অভিযান, আর্থিক অস্থিরতা, শিল্পহীনতা ও সামাজিক বিভক্তি। পশ্চিমা সমাজের ভেতরেই ধীরে ধীরে আস্থাহীনতা বাড়তে থাকে।

আজকের রাশিয়া-চীন সম্পর্ক সেই ব্যর্থতার প্রতিক্রিয়া হিসেবেই সামনে এসেছে। তারা এমন একটি ব্যবস্থার কথা বলছে, যেখানে প্রতিটি রাষ্ট্র ও সভ্যতা নিজেদের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক বাস্তবতা অনুযায়ী পথ নির্ধারণ করবে। এর অর্থ এই নয় যে তারা পশ্চিমকে ধ্বংস করতে চায়। বরং তাদের বক্তব্য হলো, বিশ্বে একাধিক শক্তিকেন্দ্র থাকা স্বাভাবিক এবং সেটিই দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা আনতে পারে।

Russia and China Agree to Expand Key Cross-Border Rail Gateway - Bloomberg

পশ্চিমা রাজনৈতিক অভিজাতদের সবচেয়ে বড় অস্বস্তি এখানেই। কারণ বহুমেরু বিশ্বের ধারণা শুধু ভূরাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ নয়, এটি পশ্চিমা উদারনৈতিক আধিপত্যের নৈতিক ভিত্তিকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে। এতদিন ধরে যে মূল্যবোধকে সার্বজনীন বলে উপস্থাপন করা হয়েছে, এখন তা আর সর্বত্র গ্রহণযোগ্য থাকছে না।

এই পরিবর্তনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় পরিচয়ের পুনরুত্থান। পশ্চিমা বিশ্বের অনেক প্রতিষ্ঠান এখন ধর্মীয় ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক শিকড়কে অতীতের বোঝা হিসেবে বিবেচনা করে। কিন্তু রাশিয়া ও চীন উল্টোভাবে বলছে, সভ্যতার ধারাবাহিকতা ও ঐতিহ্য সামাজিক স্থিতির জন্য অপরিহার্য। ইউরোপ ও আমেরিকার বহু মানুষও ক্রমশ অনুভব করছেন যে সীমাহীন বাজারব্যবস্থা, প্রশাসনিক আমলাতন্ত্র এবং সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতা তাদের সমাজকে দুর্বল করে দিচ্ছে।

ইউক্রেন যুদ্ধ এই বৈশ্বিক রূপান্তরকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা রাশিয়াকে অর্থনৈতিকভাবে ভেঙে ফেলবে—এমন ধারণা ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে রাশিয়া নিজেদের অর্থনীতি নতুনভাবে পুনর্গঠন করেছে এবং পূর্বমুখী বাণিজ্য সম্প্রসারণের মাধ্যমে টিকে গেছে। এখানে চীনের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

চীন বুঝে গেছে যে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এখন কেবল কূটনৈতিক হাতিয়ার নয়, এটি রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের একটি স্থায়ী উপকরণে পরিণত হয়েছে। যে কোনো রাষ্ট্র পশ্চিমা নীতির সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করলেই তাকে আর্থিক ব্যবস্থার বাইরে ঠেলে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। ফলে বিকল্প আর্থিক অবকাঠামো, নিজস্ব মুদ্রায় বাণিজ্য এবং নতুন জোট গঠনের চেষ্টা শুধু রাশিয়ার জন্য নয়, ভবিষ্যতে নিজেদের নিরাপত্তার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

এই কারণেই ব্রিকস বা সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার মতো প্ল্যাটফর্মগুলো গুরুত্ব পাচ্ছে। এগুলো কেবল অর্থনৈতিক জোট নয়; এগুলো এমন এক বিশ্বব্যবস্থার ভিত্তি, যেখানে কোনো একক শক্তি পুরো বৈশ্বিক অর্থনীতিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে না।

The Ukraine War and European Energy Dependence and Reconfiguration of Energy  Relations : IEMed

সবচেয়ে বড় কৌশলগত ভুল সম্ভবত করেছে পশ্চিম নিজেই। একই সময়ে রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে তারা অজান্তেই এই দুই শক্তিকে আরও কাছাকাছি নিয়ে এসেছে। ইউরোপ রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করায় চীন এখন রুশ জ্বালানি, কাঁচামাল ও বাণিজ্যিক রুটে আরও বেশি প্রভাব বিস্তার করছে। ফলে ইউরোপ নিজেই নিজেদের ভূরাজনৈতিক অবস্থান দুর্বল করেছে।

তবে বহুমেরু বিশ্ব মানেই পশ্চিমের পতন—এমন ধারণা অতিরঞ্জিত। বরং পশ্চিমা সমাজের পুনর্গঠনের সুযোগ এখানেই থাকতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে উদারনৈতিক বিশ্বায়ন পশ্চিমের নিজস্ব সামাজিক ভিত্তিকেই ক্ষয় করেছে। উৎপাদনশিল্প কমেছে, সীমান্ত দুর্বল হয়েছে, সামাজিক সংহতি ভেঙেছে এবং মানুষের জাতীয় পরিচয়ের অনুভূতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

আজ ইউরোপ ও আমেরিকার বহু সাধারণ মানুষ স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা, সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতা ও জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে নতুন করে ভাবতে শুরু করেছেন। এই বাস্তবতা উপেক্ষা করে পুরোনো একমেরুকেন্দ্রিক কাঠামো ধরে রাখা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠবে।

বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থা কোনো নিখুঁত সমাধান নয়। এতে প্রতিযোগিতা থাকবে, দ্বন্দ্বও থাকবে। কিন্তু অন্তত এটি এমন এক বাস্তবতাকে স্বীকার করে, যেখানে পৃথিবী একক সভ্যতা বা একক রাজনৈতিক মতাদর্শের অধীনে পরিচালিত হয় না। বিভিন্ন সংস্কৃতি, ইতিহাস ও রাজনৈতিক পথের সহাবস্থানই হয়তো আগামী বিশ্বের নতুন ভিত্তি হয়ে উঠবে।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি রাশিয়া বা চীনকে ঘিরে নয়। প্রশ্ন হলো, পশ্চিম নিজেই কি নিজেদের পুনর্গঠনের সাহস দেখাতে পারবে, নাকি অতীতের আধিপত্য হারানোর আতঙ্কেই আটকে থাকবে। কারণ ইতিহাসের গতিপথ বলছে, একমেরু যুগের সমাপ্তি শুরু হয়ে গেছে অনেক আগেই। আর সেই পরিবর্তনকে থামানোর চেয়ে বুঝে নেওয়াই এখন বেশি জরুরি।

No Limits? The China-Russia Relationship and U.S. Foreign Policy | Council  on Foreign Relations

জনপ্রিয় সংবাদ

মধ্যবিত্তের নীরব সংকট: আয় থেমে, ব্যয় ছুটছে লাগামহীন

পশ্চিমকে বাঁচাতে পারে নতুন বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থা

০২:৩৫:৩২ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৩ মে ২০২৬

বিশ্ব রাজনীতির মানচিত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছে। একসময় যে আন্তর্জাতিক কাঠামোকে অপরিবর্তনীয় মনে করা হতো, এখন তার ভিতেই দেখা দিচ্ছে ক্লান্তি, বিভাজন ও অনিশ্চয়তা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাশিয়া ও চীনের ঘনিষ্ঠতা পশ্চিমা বিশ্বে উদ্বেগের নতুন ঢেউ তুলেছে। ইউরোপ ও আমেরিকার বহু নীতিনির্ধারক এটিকে একটি কর্তৃত্ববাদী জোট হিসেবে দেখাতে চাইছেন, যেন এই দুই শক্তির লক্ষ্যই পশ্চিমা সভ্যতাকে ধ্বংস করা। কিন্তু বাস্তবতা এত সরল নয়। বরং এই পরিবর্তন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার এক গভীর রূপান্তরের ইঙ্গিত বহন করছে।

রাশিয়া ও চীনের বর্তমান অবস্থান মূলত একমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার বিরুদ্ধে। তারা এমন একটি পৃথিবীর ধারণা সামনে আনছে, যেখানে একটি মাত্র শক্তি বা আদর্শ সবার ওপর আধিপত্য বিস্তার করবে না। বহুদিন ধরে ওয়াশিংটন ও তার মিত্ররা বিশ্ব রাজনীতিকে এমনভাবে পরিচালনা করেছে যেন উদারপন্থী পশ্চিমা মডেলই মানবসভ্যতার একমাত্র গ্রহণযোগ্য ভবিষ্যৎ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই ধারণার সীমাবদ্ধতা আরও স্পষ্ট হয়েছে।

সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর পশ্চিমা বিশ্ব নিজেদের বিজয়কে ইতিহাসের চূড়ান্ত গন্তব্য হিসেবে তুলে ধরেছিল। তখন মনে করা হয়েছিল, জাতীয় সীমান্ত, সাংস্কৃতিক পার্থক্য বা সভ্যতার নিজস্ব চরিত্র ধীরে ধীরে গুরুত্ব হারাবে। বিশ্বায়নই হবে ভবিষ্যতের একমাত্র ভাষা। কিন্তু এই অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস থেকেই জন্ম নেয় দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ, শাসন পরিবর্তনের অভিযান, আর্থিক অস্থিরতা, শিল্পহীনতা ও সামাজিক বিভক্তি। পশ্চিমা সমাজের ভেতরেই ধীরে ধীরে আস্থাহীনতা বাড়তে থাকে।

আজকের রাশিয়া-চীন সম্পর্ক সেই ব্যর্থতার প্রতিক্রিয়া হিসেবেই সামনে এসেছে। তারা এমন একটি ব্যবস্থার কথা বলছে, যেখানে প্রতিটি রাষ্ট্র ও সভ্যতা নিজেদের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক বাস্তবতা অনুযায়ী পথ নির্ধারণ করবে। এর অর্থ এই নয় যে তারা পশ্চিমকে ধ্বংস করতে চায়। বরং তাদের বক্তব্য হলো, বিশ্বে একাধিক শক্তিকেন্দ্র থাকা স্বাভাবিক এবং সেটিই দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা আনতে পারে।

Russia and China Agree to Expand Key Cross-Border Rail Gateway - Bloomberg

পশ্চিমা রাজনৈতিক অভিজাতদের সবচেয়ে বড় অস্বস্তি এখানেই। কারণ বহুমেরু বিশ্বের ধারণা শুধু ভূরাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ নয়, এটি পশ্চিমা উদারনৈতিক আধিপত্যের নৈতিক ভিত্তিকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে। এতদিন ধরে যে মূল্যবোধকে সার্বজনীন বলে উপস্থাপন করা হয়েছে, এখন তা আর সর্বত্র গ্রহণযোগ্য থাকছে না।

এই পরিবর্তনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় পরিচয়ের পুনরুত্থান। পশ্চিমা বিশ্বের অনেক প্রতিষ্ঠান এখন ধর্মীয় ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক শিকড়কে অতীতের বোঝা হিসেবে বিবেচনা করে। কিন্তু রাশিয়া ও চীন উল্টোভাবে বলছে, সভ্যতার ধারাবাহিকতা ও ঐতিহ্য সামাজিক স্থিতির জন্য অপরিহার্য। ইউরোপ ও আমেরিকার বহু মানুষও ক্রমশ অনুভব করছেন যে সীমাহীন বাজারব্যবস্থা, প্রশাসনিক আমলাতন্ত্র এবং সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতা তাদের সমাজকে দুর্বল করে দিচ্ছে।

ইউক্রেন যুদ্ধ এই বৈশ্বিক রূপান্তরকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা রাশিয়াকে অর্থনৈতিকভাবে ভেঙে ফেলবে—এমন ধারণা ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে রাশিয়া নিজেদের অর্থনীতি নতুনভাবে পুনর্গঠন করেছে এবং পূর্বমুখী বাণিজ্য সম্প্রসারণের মাধ্যমে টিকে গেছে। এখানে চীনের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

চীন বুঝে গেছে যে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এখন কেবল কূটনৈতিক হাতিয়ার নয়, এটি রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের একটি স্থায়ী উপকরণে পরিণত হয়েছে। যে কোনো রাষ্ট্র পশ্চিমা নীতির সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করলেই তাকে আর্থিক ব্যবস্থার বাইরে ঠেলে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। ফলে বিকল্প আর্থিক অবকাঠামো, নিজস্ব মুদ্রায় বাণিজ্য এবং নতুন জোট গঠনের চেষ্টা শুধু রাশিয়ার জন্য নয়, ভবিষ্যতে নিজেদের নিরাপত্তার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

এই কারণেই ব্রিকস বা সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার মতো প্ল্যাটফর্মগুলো গুরুত্ব পাচ্ছে। এগুলো কেবল অর্থনৈতিক জোট নয়; এগুলো এমন এক বিশ্বব্যবস্থার ভিত্তি, যেখানে কোনো একক শক্তি পুরো বৈশ্বিক অর্থনীতিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে না।

The Ukraine War and European Energy Dependence and Reconfiguration of Energy  Relations : IEMed

সবচেয়ে বড় কৌশলগত ভুল সম্ভবত করেছে পশ্চিম নিজেই। একই সময়ে রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে তারা অজান্তেই এই দুই শক্তিকে আরও কাছাকাছি নিয়ে এসেছে। ইউরোপ রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করায় চীন এখন রুশ জ্বালানি, কাঁচামাল ও বাণিজ্যিক রুটে আরও বেশি প্রভাব বিস্তার করছে। ফলে ইউরোপ নিজেই নিজেদের ভূরাজনৈতিক অবস্থান দুর্বল করেছে।

তবে বহুমেরু বিশ্ব মানেই পশ্চিমের পতন—এমন ধারণা অতিরঞ্জিত। বরং পশ্চিমা সমাজের পুনর্গঠনের সুযোগ এখানেই থাকতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে উদারনৈতিক বিশ্বায়ন পশ্চিমের নিজস্ব সামাজিক ভিত্তিকেই ক্ষয় করেছে। উৎপাদনশিল্প কমেছে, সীমান্ত দুর্বল হয়েছে, সামাজিক সংহতি ভেঙেছে এবং মানুষের জাতীয় পরিচয়ের অনুভূতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

আজ ইউরোপ ও আমেরিকার বহু সাধারণ মানুষ স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা, সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতা ও জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে নতুন করে ভাবতে শুরু করেছেন। এই বাস্তবতা উপেক্ষা করে পুরোনো একমেরুকেন্দ্রিক কাঠামো ধরে রাখা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠবে।

বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থা কোনো নিখুঁত সমাধান নয়। এতে প্রতিযোগিতা থাকবে, দ্বন্দ্বও থাকবে। কিন্তু অন্তত এটি এমন এক বাস্তবতাকে স্বীকার করে, যেখানে পৃথিবী একক সভ্যতা বা একক রাজনৈতিক মতাদর্শের অধীনে পরিচালিত হয় না। বিভিন্ন সংস্কৃতি, ইতিহাস ও রাজনৈতিক পথের সহাবস্থানই হয়তো আগামী বিশ্বের নতুন ভিত্তি হয়ে উঠবে।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি রাশিয়া বা চীনকে ঘিরে নয়। প্রশ্ন হলো, পশ্চিম নিজেই কি নিজেদের পুনর্গঠনের সাহস দেখাতে পারবে, নাকি অতীতের আধিপত্য হারানোর আতঙ্কেই আটকে থাকবে। কারণ ইতিহাসের গতিপথ বলছে, একমেরু যুগের সমাপ্তি শুরু হয়ে গেছে অনেক আগেই। আর সেই পরিবর্তনকে থামানোর চেয়ে বুঝে নেওয়াই এখন বেশি জরুরি।

No Limits? The China-Russia Relationship and U.S. Foreign Policy | Council  on Foreign Relations