বেইজিংয়ের কূটনৈতিক মঞ্চে মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে হাজির হয়েছেন বিশ্বের দুই প্রভাবশালী নেতা—ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ভ্লাদিমির পুতিন। বাইরে থেকে দেখলে দুই সফরের আনুষ্ঠানিকতায় মিল ছিল চোখে পড়ার মতো। একই অভ্যর্থনা, একই রাষ্ট্রীয় আড়ম্বর, একই গ্রেট হল অব দ্য পিপল। কিন্তু এই বাহ্যিক মিলের ভেতরেই লুকিয়ে ছিল এক গভীর পার্থক্য: চীন যুক্তরাষ্ট্রকে সামলাচ্ছে প্রয়োজনের কূটনীতিতে, আর রাশিয়াকে দেখছে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অংশীদার হিসেবে।
চীনের বর্তমান বৈদেশিক নীতির চরিত্র বুঝতে চাইলে এই দুই সফরকে পাশাপাশি রাখা জরুরি। কারণ এখানে কেবল কে কাকে কী খাবার খাওয়াল, বা কার সঙ্গে কতক্ষণ করমর্দন হলো—সেটাই গুরুত্বপূর্ণ নয়। বরং গুরুত্বপূর্ণ হলো, কোন সম্পর্কের ভিত্তি লেনদেনের ওপর দাঁড়িয়ে, আর কোন সম্পর্ক গড়ে উঠেছে দীর্ঘ রাজনৈতিক আস্থার ওপর।
ট্রাম্পের সফরে চীনের মূল মনোযোগ ছিল অর্থনীতি ও বাণিজ্য। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি দলে শীর্ষ পর্যায়ের রাজনৈতিক কর্মকর্তার তুলনায় ব্যবসায়ী উপস্থিতিই ছিল বেশি। প্রযুক্তি, আর্থিক খাত, বিমান নির্মাণ ও উৎপাদনশিল্পের প্রতিনিধিরা যেন সফরের আসল কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছিলেন। আলোচনার পর কিছু বাণিজ্যিক সমঝোতার কথা সামনে এলেও বড় কোনো যৌথ ঘোষণা হয়নি। দুই পক্ষ নিজেদের মতো করে আলাদা বিবৃতি দিয়েছে। অর্থাৎ সম্পর্কের ভিত এখনও অবিশ্বাসে পূর্ণ, যেখানে প্রতিটি সমঝোতা সাময়িক এবং প্রতিটি সহযোগিতা শর্তসাপেক্ষ।

অন্যদিকে পুতিনের সফর ছিল একেবারেই ভিন্ন ধরনের। সেখানে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল রাষ্ট্রীয় কৌশল, নিরাপত্তা, জ্বালানি, ভূরাজনীতি এবং দীর্ঘমেয়াদি সমন্বয়। রুশ প্রতিনিধি দলে ছিলেন উপপ্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী এবং জ্বালানি খাতের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা। দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষর হয়েছে বিস্তৃত যৌথ বিবৃতি ও বহু সহযোগিতা নথি। যদিও সেগুলোর অনেকগুলোর তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক মূল্য স্পষ্ট নয়, তবু রাজনৈতিক বার্তাটি পরিষ্কার: মস্কো ও বেইজিং নিজেদের সম্পর্ককে কেবল স্বার্থের অস্থায়ী জোট হিসেবে দেখছে না।
এই পার্থক্যের পেছনে ইতিহাসও গুরুত্বপূর্ণ। শি জিনপিং ও পুতিন এক দশকের বেশি সময় ধরে নিয়মিত সাক্ষাৎ করেছেন। তারা বহু আন্তর্জাতিক সম্মেলনে একসঙ্গে উপস্থিত থেকেছেন, ফোনালাপ করেছেন, ভিডিও বৈঠক করেছেন। এই ধারাবাহিক যোগাযোগ ব্যক্তিগত সম্পর্ককেও রাজনৈতিক আস্থায় রূপ দিয়েছে। বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সম্পর্ক বহু বছর ধরেই সন্দেহ, প্রতিযোগিতা ও কৌশলগত দ্বন্দ্বে আটকে আছে। ওয়াশিংটন ও বেইজিং পরস্পরকে প্রয়োজনীয় অংশীদার হিসেবে মেনে নিলেও একে অপরকে সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবেও দেখে।
চীন এই বাস্তবতা খুব সতর্কভাবে পরিচালনা করছে। তারা জানে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক পুরোপুরি ভেঙে ফেলার সুযোগ নেই। বিশ্বের বৃহত্তম দুটি অর্থনীতি হিসেবে তারা একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত। কিন্তু একইসঙ্গে বেইজিং এটাও বুঝে গেছে যে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক কখনও পুরোপুরি স্থিতিশীল হবে না। ফলে চীন এখন এমন এক ভারসাম্য তৈরির চেষ্টা করছে, যেখানে অর্থনৈতিক দরজা খোলা থাকবে, কিন্তু কৌশলগত নির্ভরতা কমবে।

রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা সেই কৌশলেরই অংশ। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখে মস্কো যত বেশি চীনের দিকে ঝুঁকছে, বেইজিং তত বেশি প্রভাব অর্জন করছে। জ্বালানি, প্রযুক্তি ও ভূরাজনৈতিক সহযোগিতায় রাশিয়া এখন অনেকটাই চীনের ওপর নির্ভরশীল। এই নির্ভরতা চীনের জন্য সুবিধাজনক, কারণ এতে তারা যুক্তরাষ্ট্র-নেতৃত্বাধীন বৈশ্বিক ব্যবস্থার বিকল্প শক্তিকেন্দ্র তৈরির সুযোগ পাচ্ছে।
তবে এর মানে এই নয় যে চীন পুরোপুরি রাশিয়ার পাশে দাঁড়িয়ে পশ্চিমবিরোধী ব্লক গড়ে ফেলেছে। বেইজিং এখনও হিসাবি। তারা চায় না ইউরোপ বা যুক্তরাষ্ট্রের বাজার পুরোপুরি হারিয়ে ফেলতে। তাই চীনের কূটনীতিতে একই সঙ্গে দেখা যায় প্রতিযোগিতা ও সহযোগিতা, বিরোধ ও বাণিজ্য, দূরত্ব ও ঘনিষ্ঠতার মিশ্র বাস্তবতা।
এই দুই সফর আসলে সেই বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। ট্রাম্পের সফরে ছিল দরকষাকষির কূটনীতি; পুতিনের সফরে ছিল কৌশলগত নৈকট্যের প্রদর্শন। একদিকে ছিল লেনদেনভিত্তিক সম্পর্কের সীমাবদ্ধতা, অন্যদিকে দীর্ঘ রাজনৈতিক বোঝাপড়ার বার্তা।
বিশ্বরাজনীতির বর্তমান সময়ে চীন নিজেকে শুধু একটি অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে নয়, বরং বিকল্প বৈশ্বিক কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। আর সেই পথে তারা একদিকে যুক্তরাষ্ট্রকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে না, আবার অন্যদিকে রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ককে ব্যবহার করছে নিজেদের কৌশলগত পরিসর বাড়ানোর জন্য।
বেইজিংয়ের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক মঞ্চ তাই কেবল দুই নেতার সফরের গল্প নয়। এটি ভবিষ্যৎ বিশ্বব্যবস্থার দিকনির্দেশনারও একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত।





আদলফো অ্যারাঞ্জ, আরাথি জে আলুক্কাল, হান হুয়াং ও ভিজদান মোহাম্মদ কাওসার 


















