ইন্টারনেট একসময় মানুষকে কণ্ঠ দিয়েছিল। এখন সেই কণ্ঠের ভিড়ে বোঝা কঠিন হয়ে উঠছে, আদৌ কে কথা বলছে। একজন শিল্পী, একজন লেখক, একজন গবেষক কিংবা সাধারণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী—সবাই যেন একই সঙ্গে বাস্তবও, আবার অবাস্তবও। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্ফোরণ, ভুয়া অ্যাকাউন্টের বাণিজ্য, ছদ্মবেশী বিজ্ঞাপন আর অ্যালগরিদমনির্ভর জনপ্রিয়তার যুগে এসে ডিজিটাল দুনিয়া ধীরে ধীরে বিশ্বাসের সংকটে ডুবে যাচ্ছে।
আজকের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ শুধু প্রযুক্তির উন্নতি নয়; বরং সেই উন্নতির সঙ্গে মানবিক সত্যের সম্পর্ক কীভাবে বদলে যাচ্ছে, সেটাই। যখন একটি সফটওয়্যার কয়েক সেকেন্ডে গান লিখে দিতে পারে, ছবি আঁকতে পারে, উপন্যাস তৈরি করতে পারে কিংবা গবেষণাপত্রের ভাষা নকল করতে পারে, তখন সৃজনশীলতার মূল্য কোথায় দাঁড়ায়? আরও বড় প্রশ্ন হলো, মানুষ কি এখন আর সত্যিকারের শ্রম, অভিজ্ঞতা বা প্রতিভা খুঁজছে—নাকি শুধু দ্রুত উত্তেজনা আর তাৎক্ষণিক আবেগ?
সম্প্রতি বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, সংগীত স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মগুলোতে প্রতিদিন হাজার হাজার এআই-নির্ভর গান আপলোড হচ্ছে। এদের অনেকগুলোর পেছনে কোনো শিল্পীর বাস্তব অভিজ্ঞতা নেই, নেই কষ্ট, সংগ্রাম বা জীবনবোধ। তবু সেগুলো শুনছে মানুষ, শেয়ার করছে, জনপ্রিয় করে তুলছে। এর মানে দাঁড়ায়, ডিজিটাল বাজারে এখন আবেগও তৈরি করা যায় কারখানার পণ্যের মতো।
এখানেই সবচেয়ে অস্বস্তিকর বাস্তবতা লুকিয়ে আছে। প্রযুক্তি শুধু মানুষের কাজ সহজ করছে না; বরং মানুষের অনুভূতিকে লক্ষ্য করে নতুন এক অর্থনীতি গড়ে তুলছে। যে কনটেন্ট বেশি উত্তেজনা তৈরি করবে, সেটাই বেশি ছড়াবে। সত্য, গভীরতা বা মানবিক সততা সেখানে দ্বিতীয় বিষয়।
একসময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে গণতান্ত্রিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে দেখা হতো। ধারণা ছিল, মূলধারার বাইরে থাকা মানুষও এখানে নিজেদের কথা বলতে পারবে। কিন্তু বাস্তবে সেই জায়গা এখন ক্রমেই করপোরেট প্রভাব, বাণিজ্যিক প্ররোচনা ও পরিকল্পিত বিভ্রান্তির কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে। বিপুলসংখ্যক ভুয়া অ্যাকাউন্ট প্রতিদিন এমন সব পোস্ট ছড়িয়ে দিচ্ছে, যেগুলো দেখতে সাধারণ মানুষের মতামতের মতো হলেও প্রকৃতপক্ষে সেগুলো বাজারজাত কৌশলের অংশ।

ফলে ব্যবহারকারীরা এমন এক পরিবেশে বাস করছে, যেখানে বাস্তব ও অভিনয়ের সীমারেখা মুছে যাচ্ছে। কোনো ভিডিও ভাইরাল হলেই সেটি সত্য হয়ে উঠছে, কোনো আবেগঘন গল্প লাখো মানুষের মন ছুঁলেই সেটিকে বাস্তব ধরে নেওয়া হচ্ছে। মানুষ ধীরে ধীরে তথ্য যাচাইয়ের অভ্যাস হারাচ্ছে। কারণ দ্রুত আবেগের যুগে ধীর বিশ্লেষণের মূল্য কমে গেছে।
সমস্যা শুধু বিনোদন বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সীমাবদ্ধ নয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন আদালতের নথি তৈরি করছে, গবেষণাপত্র লিখছে, এমনকি জনমতও প্রভাবিত করছে। যদি ভুয়া বা দুর্বল তথ্য নীতিনির্ধারণের ভিত্তি হয়ে ওঠে, তাহলে তার প্রভাব স্বাস্থ্যনীতি থেকে পরিবেশনীতি—সবখানেই পড়বে। একটি সমাজ তখন শুধু তথ্যের সংকটে পড়ে না; পড়ে সিদ্ধান্তের সংকটে।
আরও উদ্বেগজনক হলো, এই পুরো ব্যবস্থায় দায়বদ্ধতার অভাব। ডিজিটাল দুনিয়ায় জনপ্রিয়তা এখন প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ শক্তি। কেউ যদি বেশি ক্লিক পায়, বেশি শেয়ার পায় বা বেশি আলোচিত হয়, তাহলে তার বক্তব্যের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে আগ্রহ কমে যায়। ফলে যারা ইচ্ছাকৃতভাবে বিভ্রান্তি ছড়ায়, তারাও অনেক সময় প্রভাবশালী হয়ে ওঠে। গণমাধ্যমও কখনো কখনো সেই প্রবণতাকে আরও বাড়িয়ে তোলে, কারণ বিতর্ক আর ভাইরালতা এখন মনোযোগের সবচেয়ে কার্যকর মুদ্রা।
তবে পুরো চিত্রটি একেবারে অন্ধকারও নয়। কিছু প্ল্যাটফর্ম ইতিমধ্যে এআই-নির্ভর কনটেন্ট আলাদা করে চিহ্নিত করার উদ্যোগ নিচ্ছে। কিছু গবেষণা প্রতিষ্ঠান কৃত্রিমভাবে তৈরি লেখা শনাক্তে কঠোর নীতিমালা চালু করেছে। অর্থাৎ প্রযুক্তির ভেতর থেকেই নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা শুরু হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেটি কি যথেষ্ট দ্রুত ঘটছে?
গণতান্ত্রিক সমাজের ভিত্তি দাঁড়িয়ে থাকে সচেতন নাগরিকের ওপর। মানুষ যদি সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য করার ক্ষমতা হারায়, তাহলে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, সামাজিক সম্পর্ক এবং সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ—সবকিছুই ঝুঁকির মুখে পড়ে। প্রযুক্তি তখন আর শুধু একটি যন্ত্র থাকে না; হয়ে ওঠে বাস্তবতা নির্মাণের ক্ষমতাবান মাধ্যম।
সবচেয়ে বড় বিপদ সম্ভবত এখানেই—আমরা ধীরে ধীরে এমন এক পৃথিবীতে প্রবেশ করছি, যেখানে মানুষ জ্ঞানের চেয়ে বিনোদনকে বেশি মূল্য দিচ্ছে, আর সত্যের চেয়ে আবেগকে। হয়তো এই পরিবর্তন হঠাৎ ধ্বংস ডেকে আনবে না। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটি এমন এক সমাজ তৈরি করতে পারে, যেখানে মানুষ সবকিছু দেখবে, শুনবে, প্রতিক্রিয়া জানাবে—কিন্তু খুব কমই সত্যিকার অর্থে বুঝবে।
ক্যাথলিন পার্কার 



















